রিমোট থেকে অ্যাপ

বিনোদন জগতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে টেলিভিশন?

দর্শক টেলিভিশন ছেড়ে স্ট্রিমিংয়ে ঝুঁকছেন। কারণ স্ট্রিমিংয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই, বিজ্ঞাপনের দীর্ঘ বিরতি নেই, পছন্দের অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না

যে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না সেখানে পাড়ার সবাই মিলে টাকা তুলে ব্যাটারি চার্জ করা ছিল উৎসবের মতো। দর্শকের সংখ্যা বেড়ে গেলে টিভি বের আনা হতো বারান্দা বা উঠানে। বিরতির সময় ছোটদের বিজ্ঞাপণ গণনা কিংবা ব্যাটারির চার্জ সাশ্রয় করতে টিভি বন্ধ করে রাখার স্মৃতিও কী কম নস্টালজিক!

একটা সময় সন্ধ্যা নামলেই পাড়ার নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘরের সামনে স্যান্ডেলের সারি পড়ে যেত। ঘরের সামনে-পেছনে বা ছাদ থেকে কেউ একজন চিৎকার করছে, ‘এইবার ঠিক আছে!’ ভেতর থেকে সমস্বরে উত্তর আসছে, ‘আরেকটু ডানে!’ ভিড় করা সবার চোখ একটা জাদুর বক্সে বন্দী। চিত্রটা আশি বা নব্বই দশকের; আর ওই জাদুর বাক্স হলো টেলিভিশন। অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ছবি পরিষ্কার করার দায়িত্ব পালন করছেন একজন দর্শক ও স্বেচ্ছাসেবক!

বৃহস্পতিবার রাতের বাংলা নাটক, শুক্রবার দুপুরের বাংলা সিনেমা কিংবা বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতে ছোট-বড় সবাই ভিড় করতেন সেই বাড়িতে। অনেকের ঝুলিতে আছে বহু পথ হেঁটে অন্য পাড়ায় টিভি দেখতে যাওয়ার স্মৃতিও। যে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না সেখানে পাড়ার সবাই মিলে টাকা তুলে ব্যাটারি চার্জ করা ছিল উৎসবের মতো। দর্শকের সংখ্যা বেড়ে গেলে টিভি বের আনা হতো বারান্দা বা উঠানে। বিরতির সময় ছোটদের বিজ্ঞাপন গণনা কিংবা ব্যাটারির চার্জ সাশ্রয় করতে টিভি বন্ধ করে রাখার স্মৃতিও কী কম নস্টালজিক!

গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসেনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো প্রচলিত সম্প্রচার ও কেবল টেলিভিশনের সম্মিলিত দর্শকসংখ্যা মোট টিভি দেখার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। জুলাই মাসে সম্প্রচার ও কেবল মিলিয়ে মোট দর্শক ছিল ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওসহ বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের দর্শক বেড়েছে

সেসময় বাংলাদেশে টেলিভিশন (বিটিভি) শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; ছিল পারিবারিক ও সামাজিক মিলনমেলা। নাটক শেষ হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া বর্ণনার পালা, গল্প চলত আরো অনেকক্ষণ। একটি নাটকের সংলাপ, চরিত্র বা গান সপ্তাহজুড়ে মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে থাকত। এখনো মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ‘‌কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাইয়ের ফাঁসির পর্ব।

অথচ চার দশক পর দৃশ্যপট পুরো বদলে গেছে। এখন আর নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা নেই। রিমোট হাতে বসে থাকারও প্রয়োজন নেই। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা স্মার্ট টিভির পর্দায় একটি অ্যাপ খুললেই হাজারো সিনেমা, সিরিজ, ভিডিও কিংবা লাইভ সম্প্রচার হাজির। টেলিভিশনের জায়গা দখল করে নিয়েছে স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম, আর দর্শকও ধীরে ধীরে বদলে ফেলছেন তাদের দেখার অভ্যাস।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসেনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো প্রচলিত সম্প্রচার ও কেবল টেলিভিশনের সম্মিলিত দর্শকসংখ্যা মোট টিভি দেখার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। জুলাই মাসে সম্প্রচার ও কেবল মিলিয়ে মোট দর্শক ছিল ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওসহ বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের দর্শক বেড়েছ। শুধু এক বছরের ব্যবধানে এসব ওভার দ্য টপ (ওটিটি) মাধ্যম দেখার হার বেড়েছে ২৫ শতাংশেরও বেশি।

পরিবর্তন শুধু মাধ্যমের নয়, দেখার অভ্যাসেরও। আগে পুরো পরিবার একই পর্দার সামনে বসত। এখন একই পরিবারের সদস্যরা আলাদা ঘরে, আলাদা ডিভাইসে, আলাদা কনটেন্ট দেখছেন

এ পরিবর্তন শুধু পশ্চিমা বিশ্বের নয়। বাংলাদেশেও গত এক দশকে বিনোদনের মানচিত্র বদলে গেছে দ্রুত। এখন নাটক বা সিনেমা দেখার সময় দর্শক নিজেই ঠিক করেন। ইউটিউব তো আছেই— দেশের চরকি, বিদেশের হইচই, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও কিংবা ডিজনির মতো প্লাটফর্ম দর্শকের হাতে তুলে দিয়েছে কনটেন্ট বেছে নেয়ার স্বাধীনতা।

পরিবর্তন শুধু মাধ্যমের নয়, দেখার অভ্যাসেরও। আগে পুরো পরিবার একই পর্দার সামনে বসত। এখন একই পরিবারের সদস্যরা আলাদা ঘরে, আলাদা ডিভাইসে, আলাদা কনটেন্ট দেখছেন। বাবা খবর দেখছেন ইউটিউবে, মা নাটক দেখছেন মোবাইলে, ছেলে গেমিং ভিডিও, আর মেয়ে বিদেশী সিরিজ—এক ছাদের নিচে থেকেও বিনোদনের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।

তবে টেলিভিশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমলেও তার মৃত্যু এখনই ঘটছে না। বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিভাগের অধ্যাপক শার্লট হাওয়েলের মতে, সম্প্রচার টেলিভিশন এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে খেলাধুলার সরাসরি সম্প্রচার এখনও টেলিভিশনের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা অলিম্পিকের মতো আসর কোটি মানুষকে একই সময়ে একই পর্দার সামনে বসায়।

সম্মিলিতভাবে টেলিভিশন দেখার একটি সামাজিক মূল্যও রয়েছে। একসময় বিটিভির জনপ্রিয় নাটক—এইসব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই, অয়োময়, বহুব্রীহি কিংবা ঈদের বিশেষ নাটকগুলো পুরো দেশকে একসঙ্গে হাসাত, কাঁদাত, ভাবাত

তবে কেবল টেলিভিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ কেবলের অনেক সুবিধাই এখন বিনা মূল্যের বিজ্ঞাপনভিত্তিক স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য স্ট্রিমিংয়ের পথও পুরোপুরি মসৃণ নয়। কয়েক বছর আগেও গ্রাহক বাড়ানোই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। এখন লাভজনক হওয়াই অগ্রাধিকার। ফলে একের পর এক বাড়ছে সাবস্ক্রিপশনের দাম। ডিজনি প্লাস, হুলু, ম্যাক্স, প্যারামাউন্ট প্লাস—প্রায় সব বড় ওটিটি প্লাটফর্ম সাম্প্রতিক সময়ে মূল্য বৃদ্ধি করেছে। অর্থাৎ, সস্তা স্ট্রিমিংয়ের যুগও শেষ হতে শুরু করেছে।

তারপরও দর্শক টেলিভিশন ছেড়ে স্ট্রিমিংয়ে ঝুঁকছেন। কারণ স্ট্রিমিংয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই, বিজ্ঞাপনের দীর্ঘ বিরতি নেই, পছন্দের অনুষ্ঠান খুঁজে পেতে অপেক্ষা করতে হয় না। অ্যালগরিদম দর্শকের রুচি বুঝে নতুন কনটেন্ট সাজিয়ে দেয়। বিনোদন হয়ে উঠেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

তবে সম্মিলিতভাবে টেলিভিশন দেখার একটি সামাজিক মূল্যও রয়েছে। একসময় বিটিভির জনপ্রিয় নাটক—এইসব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই, অয়োময়, বহুব্রীহি কিংবা ঈদের বিশেষ নাটকগুলো পুরো দেশকে একসঙ্গে হাসাত, কাঁদাত, ভাবাত। শুক্রবারের বাংলা সিনেমা কিংবা ইত্যাদি ছিল পারিবারিক আয়োজন। সেই সম্মিলিত অভিজ্ঞতা আজ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। এখন একই সময়ে সবাই ভিন্ন ভিন্ন গল্পের ভুবনে ডুবে থাকেন। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের অভাবে মহামারী আকার নিচ্ছে নিঃসঙ্গতা।

মজার বিষয় হলো, আজকের তরুণদের অনেকেই আবার সেই হারানো অভিজ্ঞতার জন্য এক ধরনের নস্টালজিয়া অনুভব করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তারা মনে করেন, নির্দিষ্ট সময়ে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে অনুষ্ঠান দেখার সংস্কৃতিতে এক ধরনের সামাজিক বন্ধন ছিল, যা অন-ডিমান্ড স্ট্রিমিংয়ে অনেকটাই অনুপস্থিত। তাই তারা ফিরতে চাইছেন রেট্রো লাইফস্টাইলে।

আরও