সকালটা ছিল একেবারেই সাধারণ। গ্রামের ছোট্ট স্কুলের সামনে খোলা জায়গায় বসে ছিল কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা। হাসি আর চঞ্চলতায় ভরা সেই দৃশ্য মুহূর্তেই বদলে যায় আতঙ্কে। সবার অজান্তে একটি বিষধর সাপ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল তাদের দিকে। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় ‘কালী’, রাস্তার ধারে থাকা এক পথকুকুর। কেউ ভাবেনি, ছোট্ট এ প্রাণটিই হয়ে উঠবে ৩০ শিশুর রক্ষাকবচ।
ভারতের ওডিশা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ জেলার ধিরাকুলা গ্রামে ঘটনাটি ঘটে গত সপ্তাহের শুরুতে। স্থানীয় বিদ্যালয় ‘শ্রী জগন্নাথ শিশু বিদ্যা মন্দির’ এর সামনে শিশুরা বাইরে বসে ছিল। ঘড়ির কাটায় সময় তখন সকাল সাড়ে ৮টা। তবে সকালের সেই দৃশ্যটি ছিল শিউরে ওঠার মতো। হঠাৎ সাপটি যখন শিশুদের একদম কাছাকাছি, তখনই ঝাঁপিয়ে পড়ে কালী। আর শুরু হয় তাদের মধ্যে লড়াই। একদিকে বিষধর সাপ, অন্যদিকে একা একটি কুকুর।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কালী বারবার সাপটিকে আক্রমণ করছিল, যদিও সে নিজেও দংশিত হয়। আঘাত পেয়েও সে পিছু হটেনি। বরং আরো দৃঢ়ভাবে লড়াই চালিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে সাপটিকে মেরে ফেলতে সক্ষম হয় সে। কিন্তু মুখে দংশনের কারণে বিষে আক্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণ পরই কালী মারা যায়।
গ্রামের এক বাসিন্দা বলছিলেন, ‘কালি না থাকলে আজ আমাদের বড় কোনো শোক সইতে হতো। ও আমাদের সন্তানদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেল।’
ঘটনার পর পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। যে কুকুরটিকে রোজ অবহেলায় ঘুরে বেড়াতে দেখত সবাই, তার নামই আজ সবার মুখে মুখে। গ্রামবাসীরা কালীর এ বীরত্বকে সম্মান জানাতে এক আবেগঘন শেষকৃত্যের আয়োজন করে। মানুষের মতো করেই তাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে ফুলে ফুলে সাজানো হয়। এরপর বের করা হয় এক বিশাল শোকযাত্রা। গ্রামের নারী-পুরুষ আর শিশুরা অশ্রুসিক্ত চোখে কাঁধে তুলে নেয় তাদের এ অভিভাবককে। পূর্ণ মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয় গ্রামের মাটিতে।
বর্তমানে ভারতে পথকুকুর নিয়ে বিতর্ক ও আতঙ্ক তুঙ্গে। শুধুমাত্র ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই দেশটিতে ৪ লাখের বেশি কুকুর কামড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এমন সময়ে কালীর এই গল্প যেন এক নতুন বার্তা দেয়। কোনো প্রশিক্ষণ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়াই কেবল ভালোবাসা আর সুরক্ষার প্রবৃত্তি থেকে সে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। ধিরাকুলা গ্রামের মানুষের কাছে কালি এখন কেবল একটি নাম নয়, সে এক নিঃশব্দ অভিভাবক।
কালির গল্প এখন গ্রাম ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
—দ্য অনলাইন সিটিজেন থেকে তথ্য নেয়া