অভিমত

স্বাধীনতা, সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব

হানা আরেন্ট জার্মানির প্রখ্যাত দার্শনিক খানিকটা ক্ষোভ নিয়ে লিখেছিলেন, সংবিধান রচয়িতারা হলেন রাষ্ট্র নামক একটি বাড়ির ডিজাইনার, না চাইলেও যে বাড়িতে দেশের মানুষ থাকতে বাধ্য হয়। এমন বাড়ির বসবাসকারীদের ডিজাইন করার ক্ষেত্রে আর কতটুকু ভূমিকা থাকে? এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর ‘নামমাত্র’। সংবিধানের চয়ন ও বয়ানে দেশের মানুষের ভূমিকাও ঠিক

হানা আরেন্ট জার্মানির প্রখ্যাত দার্শনিক খানিকটা ক্ষোভ নিয়ে লিখেছিলেন, সংবিধান রচয়িতারা হলেন রাষ্ট্র নামক একটি বাড়ির ডিজাইনার, না চাইলেও যে বাড়িতে দেশের মানুষ থাকতে বাধ্য হয়। এমন বাড়ির বসবাসকারীদের ডিজাইন করার ক্ষেত্রে আর কতটুকু ভূমিকা থাকে? প্রশ্নের একমাত্র উত্তর নামমাত্র সংবিধানের চয়ন বয়ানে দেশের মানুষের ভূমিকাও ঠিক তেমনই। একেবারে নগণ্য। যদিও আরেন্টের মন্তব্য ষাটের দশকের, স্ট্যালিন-উত্তর সোভিয়েত রাশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, কিন্তু আমাদের সংবিধানের ৫০ বছর বয়সে এসে প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক। আমাদের সংবিধানের সঙ্গে দেশের মানুষের সম্পর্কটা ঠিক তেমন, বাড়ির রূপকার আর বসবাসকারীর।

কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা সব জাতিরই থাকে। সে আকাঙ্ক্ষা থেকে স্বাধীনতা নামক প্রত্যয়টি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায় কোনো জাতি। প্রতিটি স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্রের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পরের পদক্ষেপই সংবিধান বা শাসনতন্ত্র প্রণয়ন। কারণ সংবিধান স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের দ্যোতক।

একটি দেশের অধিকাংশ মানুষের আচরণ এক করে আমরা পাই সমাজের একমাত্রিক অবস্থান এবং অতিবাহিত চলমান সময়ের যেকোনো নির্ধারিত বিন্দুতে তার অস্তিত্বের প্রকাশও প্রায় একই। সুষম না হলেও ন্যূনতম সামঞ্জস্যে এমন ঘটে বলেই সবাই পারস্পরিক যোগাযোগে সমাজ রাষ্ট্রের কাঠামোগুলো ব্যবহারিক কাজকর্ম করে চলে। স্থিতিশীলতা ধারাবাহিকতা বজায় থাকে বা রাখার চেষ্টা করা হয় কোনো একক লেখ্য নিশানা সামনে রেখে। সংবিধান সেই দলিল।

গণপরিষদকে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা না দিয়ে কেন খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করে দায়িত্ব দেয়া হলো এর কার্যকর এক উল্লেখ পাওয়া যায় অধ্যাপক আবু সাইয়িদের মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে সিক্রেট ডকুমেন্ট বইতে তিনি লিখছেন...আমার স্পষ্ট মনে আছে, বাংলাদেশ গণপরিষদকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেন দেয়া হয়নি সে সম্পর্কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিশদভাবে পাকিস্তান গণপরিষদের রেফারেন্স টেনে বললেন, পাকিস্তান গণপরিষদকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়ার ফলে দীর্ঘ নয় বছর পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হতে পারেনি। বাংলাদেশ গণপরিষদের পরিবর্তে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটিকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে বিশেষায়িত কমিটিকে ক্ষমতা অর্পণ করে সংবিধান রচনার যে সিদ্ধান্ত শেখ মুজিব নিয়েছিলেন সেটি তার গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই
প্রমাণ দেয়।

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সংবিধানকে জনগণের এমবডিমেন্ট অব দ্য উইল বা অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি স্বরূপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আসলেই কি সংবিধানের সবরকম চর্চায় জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই? নাকি ব্যক্তি দলীয় স্বার্থের সিদ্ধান্তেরই ফসল? সংবিধান একটি জাতির সে লেখ্যপত্র যেখানে জাতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার নির্যাস পাওয়া যায়। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার প্রথম বিজয় দিবস উদযাপন করে নিজের জন্য নিজের প্রণীত সংবিধানে কার্যকর করার মধ্য দিয়ে। এক অতুল্য অর্জন। সমাপতন বোধ করি।

এত এত অনালোচিত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দিবস কেন্দ্রিক উদযাপন হতে দেখি আমরা অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দলিল যেদিন গৃহীত হলো তার দিনটিকে উপলক্ষ করে সরকারি পর্যায়ে যে নীরবতা তা সত্যই আমাদের বৌদ্ধিক সাবালকত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে বেসরকারিভাবে সাংগঠনিক পর্যায়ে নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান দিবস পালন করা হয়।

রাষ্ট্রাচার মেনে সংবিধান দিবস পালন করা হয় না বলেই কি আমাদের এত সাংবিধানিক বিচ্যুতি? স্মরণ রাখা উচিত, সংবিধানের পথ থেকে বিচ্যুত হলে তার মূল্য চুকাতে হয় বহু বিনিময়ে। লক্ষণীয়, সংবিধানের সর্বোচ্চতা স্বীকার করা এবং শাসন-ক্ষমতার মধ্যে একটি বিরোধ বর্তমান। নানা স্তরের নেতা, আরো অনেকের কথাতেই সেই বিরোধ প্রকট হয় প্রায়ই। যাদের হাতে সংবিধানের সম্মান রক্ষার ভার, তারাই সংবিধানের শর্তহীন মান্যতা স্বীকার করতে নারাজ, এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? সমাজের নৈতিকতা তাদের কাছে জরুরি, কারণ সংবিধান মানা যে ঐচ্ছিক নয়, আবশ্যিক, রাজনীতির ক্ষুদ্র স্বার্থে তারা যদি কথাটি ভুলে যান, তবে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার তাদের থাকে কি?

বছর দুই আগে ভারত সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মিছিলে দেখা যায় সংবিধানের প্রস্তাব আবৃত্তি হচ্ছে, রাজধানীতে ছাত্রনেত্রী জখম হয়েও বলছেন যে লাঠির জবাব তিনি সংবিধান দিয়েই দেবেন। আহ, সংবিধান নিয়ে এমন শুদ্ধ আবেগ মুগ্ধ না করে পারে না। কিন্তু সংবিধান দিবস নিয়ে নিবন্ধে যদি বলা যেত আমাদের সংবিধান চিন্তা মাত্রা ছুঁয়েছে তাহলে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। তবে সত্য এই; মিছিলে সংবিধানের প্রস্তাব আবৃত্তি আর দিল্লির ছাত্রনেত্রী লাঠি নয় জবাব তিনি সংবিধান দিয়েই দেবেন। আর বিপরীতে বাংলাদেশে প্রায় একই সময়ে ঘটে প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে প্রি কনস্টিটিউশনাল (সংবিধানপূর্ব আইন) অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩ ব্যবহার করে হেনস্থার ঘটনা, যেটি তথ্য প্রাপ্তির স্বাধীনতার জন্য হুমকি। আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট অস্তিত্বহীন। একই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত দেশ দুটির সংবিধান-চিন্তার (সংবিধান-বোধ) গভীরতার তারতম্য হতাশার। একই সীমানার দেশ দুটির সাংবিধানিক বাস্তবতা ব্যবহারিক বাস্তবতা দুই রকম।

সংবিধানের ভাব ভাষা জনমনোগ্রাহী হলে ভালো হতো? এতে সংবিধান-বোধ হয়তো জাতির ট্রান্সফর্মেশনের কাজ করত। পৃথিবীর কোনো দেশের সংবিধানই আসলে জনপ্রিয় সাহিত্যের মতো ব্যাপক পাঠ্য নয়। তবে সত্য হচ্ছে, গভীর ঘনত্বে ভরা একটি জাতির অস্তিত্বিক জিজ্ঞাসার মীমাংসা সহজ নয়। আপাত কাঠিন্যের বাধা অতিক্রম করে মৌল প্রত্যয়গুলো বোঝার জন্য সংবিধান পড়তে হয় বারবার।

 

এমএম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ

 

আরও