আলোকপাত

রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ

ছাত্র আন্দোলনের কোনো কোনো নেতার ঠিকুজি-কুষ্ঠি ঘেঁটে দেখা যায় যে তারা ছদ্মবেশে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের মধ্যে বহুদিন ধরে কাজ করেছেন।

আমরা সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচিত্র প্রবণতা, পরস্পরবিরোধিতা ও টানাপড়েন দেখছি। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে যেমন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের বিরুদ্ধে ‘এ’ টু ‘জেড’ এক ধরনের ঐক্য বা ‘জাতীয় সমঝোতা’ গড়ে উঠেছিল, তা সরকার পতনের পর পরই ভেঙে যেতে শুরু করে। সরকার গঠনের দিনই দেখা যায় সেনাপ্রধান জামায়াতসহ ইসলামপন্থী শক্তিগুলোকে কিছুটা বাড়তি প্রশ্রয় দিয়ে সামনে নিয়ে আসেন। ছাত্র আন্দোলনের কোনো কোনো নেতার ঠিকুজি-কুষ্ঠি ঘেঁটে দেখা যায় যে তারা ছদ্মবেশে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের মধ্যে বহুদিন ধরে কাজ করেছেন। অন্যদিকে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎপর হয়ে ওঠে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতায় পুনরায় আসীন হওয়া যায় কীভাবে সে বিষয়ে তারা প্রবলভাবে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপি বর্তমানে দাবি করছে ন্যূনতম সংস্কার করে দ্রুত সর্বাগ্রে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা কমবেশি সতর্ক ও সংযত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। যদিও প্রধান উপদেষ্টা বারবার বলেছেন, ‘এখনই সুযোগ, যা সংস্কার করার তা এখনই করতে হবে।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ এ সরকার ঘোষণা করেনি।

তবে এরই মধ্যে আগস্ট আন্দোলনের ছাত্রদের একটি অংশ জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে নতুনভাবে সংগঠিত হতে শুরু করেছে। তাদের কারো কারো বক্তব্য কখনো কখনো উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা বাহাত্তরের সংবিধানের কবর রচনার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। তারা এ সংবিধানকে ‘মুজিববাদী সংবিধান’ ও হাসিনার ‘স্বৈরাচারী সংবিধান’ হিসেবে অভিহিত করছেন। কেউ কেউ ইতিহাসও সম্পূর্ণ বদলে দিতে চাচ্ছেন, দাবি করছেন ৫ আগস্ট (তাদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’) থেকে বাংলাদেশে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বা ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ তৈরি হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো কোনো সদস্য অবশ্য বর্তমানে এসব উগ্র বক্তব্য দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকাকে রক্ষা ও বহন করতে চাইছেন। সেই হিসেবে চরম ইসলামপন্থী শক্তি ও ছাত্রদের উগ্রপন্থী বা ছদ্মবেশী অংশটির সঙ্গে বর্তমানে বিএনপিপন্থীদের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা ক্রমাগত বাড়ছে।

এদিকে জামায়াতও নতুন ইসলামপন্থী একটি বলয় গড়ে তুলতে চাইছে। ছাত্রদের মধ্যে যারা নতুন নামে ‘কিংস পার্টি’ তৈরি করতে ইচ্ছুক তারা চাইছে, আগামী নির্বাচন কোনো না কোনোভাবে দীর্ঘায়িত ও বিলম্বিত করতে। কিন্তু তাতে বিশেষভাবে ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত’ জামায়াত শুধু যে নতুন করে সিদ্ধ ও প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে তা-ই নয়, তারা ক্রমে সব ইসলামপন্থী শক্তিকে একত্র করে চেষ্টা করবে, আগামীতে তারাই যাতে অন্যতম বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় সেজন্য। এরই মধ্যে হেফাজত, চরমোনাই পীর ইত্যাদি দলের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াত নেতা ডা. শফিকুর রহমান পরস্পরের অতীত ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।

এ রকম চরম ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের বিপরীতে বাংলাদেশের বর্তমান বামপন্থী শক্তিগুলোও চেষ্টা করছে, আগের মতো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির লেজ না ধরে অর্থাৎ কাকের ঘরে কোকিলের ডিম আর না পেড়ে নিজেদের বাসায় নিজেরা ডিম পেড়ে নিজেদের শক্তি একত্র ও সংহত করে একটি বামগণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গঠন করে তৃতীয় একটি প্রধান বিকল্প শক্তিতে পরিণত হতে। অবশ্য মধ্যবিত্তসুলভ শর্টকাটে এমপি হওয়ার পথ ছেড়ে দিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত কতটুকু মেরুদণ্ড শক্ত করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন তার অনেকখানি নির্ভর করবে তরুণ ছাত্রদের গতি প্রবণতা ও আদর্শগত ঝোঁকের ওপর।

মনে হচ্ছে, বিএনপি ও বাম জোট উভয়ই বর্তমানে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় শক্তিগুলোকে আরো সংহত হওয়ার সুযোগ দিতে নারাজ। তাই তারাও হয়তো চাইবেন যেন ন্যূনতম সংস্কার করে দ্রুত একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে। তবে বামপন্থীরা চাইছেন একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থার এমন কিছু সংস্কার, যেন নির্বাচন-উত্তর পার্লামেন্টকে নব্য কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বৈরাচার বা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আখড়ায় পরিণত করা না যায়।

এ লক্ষ্যে তারা নির্বাচনকে যতদূর সম্ভব পেশিশক্তি, অর্থ ও পক্ষপাতিত্বপূর্ণ (দক্ষিণ ও দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর প্রতি) প্রশাসনের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের ধনী-গরিব-মধ্যবিত্ত শ্রেণী নির্বিশেষে সবাই ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ এবং ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সকলের’ এ দুই মূলনীতি বজায় রেখে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন-উত্তর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে বাম শক্তি। এ উদ্দেশ্যে আনুপাতিক নির্বাচনের কথা, ‘না ভোট’-এর ব্যবস্থা করা, Right to Recall সিস্টেম চালু করা এবং নির্বাচনী রাজনৈতিক প্রচারে সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদী ধর্মীয় অপপ্রচার বা লেবেলিংয়ের সুযোগ বাদ দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত করতেও তারা সচেষ্ট।

তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের নেতা এবং তাদের দোসরদের সুষ্ঠু পদ্ধতিতে বিচার করতে হবে। কিন্তু সেটা মব জাস্টিস হওয়া উচিত নয়। হাসিনা আমলের মতো শত্রুদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা বা বানোয়াট দুর্নীতির মামলা দিয়ে অকারণে হয়রানি করা বা পুলিশি বাণিজ্যের ব্যবস্থা করা অবিলম্বে থামানো দরকার। সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারী দল হিসেবে জামায়াত-শিবিরকে আগের আমলে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছিল। হাল আমলে একইভাবে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে তাদের দলগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সদস্যরা গণহত্যা বা দুর্নীতি বা লুটপাটের সঙ্গে সবাই কি জড়িত ছিল? তাছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে একাত্তরের নয় মাসব্যাপী গণহত্যা ও সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের (১৫ আগস্ট পর্যন্ত) ছাত্র-জনতা-পুলিশ হত্যা কি একইভাবে তুলনীয় হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এক্ষেত্রে কী রায় দেয় সেটার ওপর এ সিদ্ধান্ত অনেকখানি নির্ভর করবে।

তবে হোয়াইট পেপারে যেসব লুটপাটের সুনির্দিষ্ট বিবরণ উল্লেখ হয়েছে, দুদক এরই মধ্যে যাদের গ্রেফতার করেছে তাদের টাকাগুলো যথাসম্ভব উদ্ধার করে দ্রুত একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে না পারলে সবই গরল ভেল হয়ে যাবে। কারণ টাকার শক্তিই যদি আবার লুকিয়ে ছদ্মবেশে পুনরায় ফিরে আসে তাহলে এক দখলদারকে তাড়িয়ে, এক স্বৈরাচারকে তাড়িয়ে আমরা আবার আরেক দখলদার বা স্বৈরাচারের কবলে পতিত হব।

তাই যারা আগস্ট আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চান তাদের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রধান দাবিটি হবে, ‘বরং কম কিন্তু ভালো’ অর্থাৎ কমপক্ষে এমন একটি নির্বাচন যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’ তা কার্যকর করতে পারা। সেক্ষেত্রে কীভাবে সব ধরনের নির্বাচনকে থ্রিএম থেকে মুক্ত রাখা যায় (Money, Muscle and Administrative Manupulation); অর্থাৎ টাকা, পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক কারসাজি থেকে মুক্ত রাখা যায়, সেটাই হবে যাবতীয় সংস্কারের কেন্দ্রীয় বিষয়। কারণ সেটি সফল না হলে একটি যথার্থ অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংসদ হবে না। আর তা না হলে সব সংস্কার কমিশন রিপোর্টগুলো ১৯৯০ সালের টাস্কফোর্স রিপোর্টের মতো অব্যবহৃত থেকে যাবে। তাই যথাসম্ভব দ্রুত ন্যূনতম সংস্কার শেষে এমন একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন চাই, যেখানে দেশের তৃণমূল থেকে দরিদ্র-জনপ্রিয়-সৎ প্রার্থীদেরও বিজয়ী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এমএম আকাশ: অধ্যাপক

অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও