২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির শুনানিতে শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে দেয়া গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিলের দাবিতে ক্যাব মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে। শুনানির সময় শুনানি বাতিলের দাবিতে অংশীজনরা স্লোগান দেয়, বিক্ষোভ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মধ্যাহ্ন বিরতি দেয়া হয়। বিরতি শেষে শুনানিতে প্রত্যেকেই শুধু বিবৃতি প্রদান করে। জেরা ও যুক্তি-তর্ক পর্বে কেউই অংশগ্রহণ করেননি। মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব খারিজের দাবিতে ক্যাব যা কিছু বলেছে, এর উল্লেখযোগ্য অংশ:
২. গণশুনানিতে উপস্থাপিত বিইআরসির কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্যাসের মূল্যহার নির্ধারণে দুইবার ভ্যাট নেয়া হয়। কমিটি একবার নেয়ার প্রস্তাব করেছে। তাতে ব্যয় বা ঘাটতি হ্রাস পায় বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। অথচ শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যহার প্রস্তাব অনুযায়ী ৭৫ দশমিক ৭২ টাকা বৃদ্ধি হলে বছরে সম্ভাব্য রাজস্ব বৃদ্ধির পরিমাণ হবে প্রায় ৩ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যদি বছরে ২৮ হাজার ২২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। তাছাড়া গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চলনে সিস্টেমলস ১৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। কিন্তু বিইআরসির হিসাবে ১ দশমিক ১২ শতাংশ। বাকি অপচয় ও চুরি। তা সমন্বয় হলে বিদ্যমান মূল্যহারে সাশ্রয় হয় প্রায় ১০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। এ তথ্যাদিতে প্রমাণিত হয়, শুধু ভ্যাট ও সিস্টেমলস ন্যায্য ও যৌক্তিক হলে যে পরিমাণ লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রোধ হয়, তাতে বছরে ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। অথচ গ্যাস সরবরাহে সমন্বয়কৃত লুণ্ঠনমূলক ব্যয়গুলো রোধ করা হলে কী পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়, তা বিবেচনা না করে মন্ত্রণালয় মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং বিইআরসি সে প্রস্তাব গ্রহণ করে সেসব ব্যয় সুরক্ষা দেয়। ফলে উভয়ই ভোক্তা স্বার্থ ও অধিকার খর্ব এবং ভোক্তাকে জ্বালানি সুবিচার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত।
৩. মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ সালে যথাক্রমে ২৮ হাজার ৬৪০, ২৮ হাজার ৩৭ ও ২৮ হাজার ২২৪ (প্রাক্কলিত) মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাস সরবরাহ হয়েছে যথাক্রমে ২২ হাজার ৬৫১, ২১ হাজার ৮২ ও ২০ হাজার ৬৭ (প্রাক্কলিত) মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ক্রমন্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। গ্যাসে এখন ২৫ শতাংশ এলএনজি। ২০৩০ সালে হবে ৭৫ শতাংশ। আগামীতে জ্বালানি নিরাপত্তায় অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে। অথচ সব চার্জ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
৪. ২০২৩ সালে মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা হাতে পেয়ে এক বছরে বিগত সরকার উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জহার বৃদ্ধি করে যথাক্রমে কম-বেশি ৪০, ১১৪ ও ৬০ শতাংশ। সিএনজি অপারেটর ও বিইআরসি চার্জহার বৃদ্ধির দরকার না হলেও পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের চার্জহার বাড়ানো হয়েছে যথাক্রমে ২৪ ও ১০৯ শতাংশ। গ্যাসের মূল্যহার বৃহৎ, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র, কুটির শিল্পে বৃদ্ধি করে যথাক্রমে ১৫০, ১৫৫ ও ১৭৮ শতাংশ। ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ৯৭ শতাংশ। বিদ্যুতে ২০৯ শতাংশ। বর্তমান সরকারের আমলে শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যহার এলএনজির মূল্যহারের সমান হবে। অর্থাৎ বৃদ্ধি হবে ১৫২ শতাংশ। এসব তথ্যদিতে প্রমাণিত হয়, বিগত সরকার দেশকে কেবল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি বাজারে পরিণত করেনি, শিল্পজাত পণ্যেরও আমদানি বাজারে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় ছিল। বর্তমানে মন্ত্রণালয় ও বিইআরসি ওই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
৫. ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে জানা যায়, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ৬৫ শতাংশ অর্থ খরচ হয়নি। ৩৫ শতাংশ বিদেশী ঠিকাদারের বিল দিতে ব্যয় হয়েছে। জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়ন গুরুত্ব পায়নি। ফলে গ্যাস সংকট মোকাবেলায় ২০৩০ সালে গ্যাসের ৭৫ শতাংশ হবে এলএনজি। বিগত সরকারের আমলে অত্যন্ত সুচতুরভাবে মন্ত্রণালয় এভাবে বিইআরসি সহযোগিতায় এলএনজি আমদানির প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এ সরকারের আমলে তারই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে।
৬. বিগত সরকার প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়নে বৃহৎ পরিসরে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী সেসব প্রকল্পের বিদ্যুতের মূল্যহার ছিল কম-বেশি ১৪ টাকা। অথচ এ বিদ্যুৎ সাড়ে ৪ টাকারও কম ব্যয়ে উৎপাদন করা যায়। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের নেয়া ওই উদ্যোগ বাতিল করে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ আহ্বান করেছে। কিন্তু বিদ্যুতের মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক পর্যায়ে কতটা নামিয়ে আনা যাবে, বিদ্যুৎ বিভাগের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সে ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। এ খাত উন্নয়নে স্রেডার সক্ষমতা উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দরকার, বিইআরসির আওতায় অংশীজনদের অংশগ্রহণ দরকার এবং বিদ্যুৎ বিভাগকে নিষ্ক্রিয় রাখাও দরকার। সেই সঙ্গে বটোম-আপ অ্যাপ্রোচে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে এ খাত উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা দরকার।
৭. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগের আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন অব্যাহত থাকায় লুণ্ঠনমূলক ব্যয়বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩-এর ৩৪ ধারা সংশোধন করে সব ধরনের এনার্জির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেয়া হয়।
৮. অতঃপর মন্ত্রণালয় ঘন ঘন বেশি বেশি এনার্জির মূল্যহার বৃদ্ধি দ্বারা জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় বৃদ্ধি ঘটায় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা চরম বিপর্যয়ে পড়ে। ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হয়। মন্ত্রণালয় কর্তৃক অলোচ্য মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন ও বিইআরসি কর্তৃক তা গৃহীত হওয়ায় প্রমাণিত হয় বিগত সরকারের আমলে গৃহীত ব্যবস্থাদির ধারাবাহিকতা এ সরকারের আমলে রক্ষিত হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
৯. পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সরকারের পতন হয়। বর্তমান সরকার ওই বিশেষ বিধান আইন, ২০১০ এবং বিইআরসি আইনে সংযোজিত ধারা ৩৪ক বাতিল করে। তবে আইনে সংযোজিত, ‘... কমিশন কর্তৃক প্রবিধান প্রণয়ন না করা পর্যন্ত, সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করিতে পারিবে।’, বাক্যটি বাতিল না করে মন্ত্রণালয় তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ অব্যাহত রেখেছে। আবার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশেষ বিধান আইন বাতিল করা হলেও তাতে ২(ক) ও ২(খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে ওই আইনের আওতায় যেসব অন্যায় ও অপরাধমূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে, সেসব কার্যক্রমকে সুরক্ষা দেয়ায় জনগণ প্রতারিত এবং নতুনভাবে লুণ্ঠনের শিকার হয়। এমন পরিস্থিতির প্রতিকার না করে মন্ত্রণালয় ও বিইআরসি অতিতের ধারাবাহিকতায় তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় তারা এখন গণশত্রু হিসেবে অভিহিত।
১০. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনয়ন, ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ১৩ নং আইন দ্বারা স্বাধীন নিরপেক্ষ রেগুলেটরি সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ আইনের ২২ ও ৩৪ ধারায় প্রাপ্ত দায়িত্ব ও ক্ষমতা পালন না করে নিষ্ক্রিয় থেকে কেবল লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় অব্যাহত রাখায় গণশুনানিতে বিগত বিইআরসির ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিইআরসিকেও অভিযুক্ত করা হয়। গণশুনানিতে বিইআরসির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর অন্যতম:
ক. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, উহার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের মান নিরূপণ, এনার্জি অডিটের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে জ্বালানি ব্যবহারের খরচের হিসাব যাচাই, পরীক্ষণ, বিশ্লেষণ, জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতার মান বৃদ্ধি ও সাশ্রয় নিশ্চিত না করে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ২২(ক) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে বিশেষভাবে অভিযুক্ত;
খ. লাইসেন্সির (বিইআরসির লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান/কোম্পানি) সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে স্কিম অনুমোদন এবং এই ক্ষেত্রে তার চাহিদার পূর্বাভাস (load forecast) ও আর্থিক অবস্থা (financial status) বিবেচনায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যতীত লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ২২(ঘ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
গ. লুণ্ঠনমূলক ব্যয় প্রতিরোধ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারকে কোনো সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান না করে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ২২(ঝ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
ঘ. জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণে জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভোক্তা সাধারণের পক্ষে আনীত কোনো বিরোধ মীমাংসা না করে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ২২(ঞ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
ঙ. ভোক্তা বিরোধ, অসাধু ব্যবসা বা সীমাবদ্ধ (monopoly/oligopoly) ব্যবসা সম্পর্কিত বিরোধের উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত করা থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ২২(ট) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
চ. বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঞ্চালন, বিপণন, বিতরণ, সরবরাহ ও মজুদকরণের ন্যায্য ও সঠিক ব্যয়ের সঙ্গে মূল্যহার সামঞ্জস্যপূর্ণ করা থেকে বিরত থাকে এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ৩৪(২)(খ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
ছ. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে দক্ষতা, ন্যূনতম ব্যয়, উত্তম সেবা প্রদান, ও উত্তম বিনিয়োগ বিবেচনা ও নিশ্চিত করা থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ৩৪(২)(গ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
জ. ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা ও নিশ্চিত করা থেকে বিরত থেকে এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ৩৪(২) (ঘ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত;
ঝ. স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষদের শুনানি দেয়ার পর তাদের যুক্তি ও বক্তব্য উপেক্ষা করা এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত রাখায় বিইআরসি, বিইআরসি আইনের ৩৪(৪) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং
ঞ. বিইআরসি আইনের ২২ ও ৩৪ ধারায় উল্লিখিত দায়িত্ব বিইআরসি কর্তৃক যথাযথভাবে প্রতিপালিত হলে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকত। ফলে ঘাটতিও নিয়ন্ত্রণে থাকায় ভর্তুকি বা মূল্যহার বৃদ্ধির দরকার হতো না। তাই কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিগত ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে বিইআরসিকে লেখা চিঠিতে ও ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মূল্যহার বৃদ্ধির জন্য আয়োজিত শুনানি স্থগিত এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রোধ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার কমানোর প্রস্তাব করে। বিইআরসি তা বিবেচনা না করে আগের বিইআরসির ধারাবাহিকতায় মূল্যহার নির্ধারণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে এবং আগের বিইআরসির ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিইআরসিও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করে মূল্যহার বৃদ্ধিতে মনোযোগী—এ অভিযোগে বর্তমান বিইআরসি বিশেষভাবে অভিযুক্ত।
১১. ৯ মার্চ, ২০২৫ তারিখের শুনানি-পরবর্তী প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাকৃতিক গ্যাসের শিল্প ও ক্যাপটিভ শ্রেণীতে বিদ্যমান, প্রতিশ্রুত ও সম্ভাব্য গ্রাহকের গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধ সম্পর্কে বলেছে, ‘...প্রস্তাবিত আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ভিত্তি করে শিল্প ও ক্যাপটিভ শ্রেণীর নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গ্যাসের ট্যারিফ/মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব কোনভাবেই দেশের উন্নয়নের স্থিতিশীলতার পক্ষে নয়। ...বিদ্যমান মূল্যহার কমিয়ে blended মূল্যহারে সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ৩৯ টাকা নির্ধারণ করে শিল্প ও ব্যবসা খাতকে টিকিয়ে রাখা উচিত...’। তাছাড়া প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শিল্প মালিক/ব্যবসায়ীরা চাহিদার ৩০-৪০ পার্সেন্ট কম গ্যাস পায় এবং কম চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সেজন্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো কর্তৃক তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, এলএনজি আমদানিতে দ্বৈত ভ্যাট ও উৎসে কর প্রত্যাহার এবং গ্যাস সরবরাহে সরকার আরোপিত ট্যাক্স ও পেট্রোবাংলা/বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত বিভিন্ন চার্জ কমিয়ে গ্যাসের মূল্য এবং সরকারের ভর্তুকি কমানো সম্ভব।
১২. ১৩ মার্চ, ২০২৫ তারিখে দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকায় ‘বিদ্যুতের ভর্তুকি বরাদ্দ বাড়ছে গত অর্থবছরের তুলনায় ৭৭ শতাংশ’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ৬২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় ভর্তুকি বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ৭৭ শতাংশ। সারে ভর্তুকি বরাদ্দ ২৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ব্যয় কমাতে সরকার নানা উদ্দ্যোগ নিলেও বিতর্কিত চুক্তি বাতিলসহ প্রভাব ফেলার মতো কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। কেবল ভর্তুকিই বাড়েনি, এরই মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যহারও দফায় দফায় বেড়েছে।
১৩. ওই খবরে ক্যাবের সূত্রে বলা হয়েছে, ‘বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুতে যে পরিমাণ ভর্তুকি ছিল, সরকার এ খাতে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলে এ ভর্তুকির পরিমাণ কমার কথা ছিল। এখন যদি ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে এখাতে বিগত সরকারের চলমান অবৈধ ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ছিল তা অব্যাহত রয়েছে। এ খাতে চুরি ও দুর্নীতি অব্যাহত আছে। ব্যয় কমাতে হলে ট্যারিফ কাঠামোয় অযৌক্তিক যেসব ব্যয় রয়েছে, এগুলো কমাতে হবে। আর এসব করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তারা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে কীভাবে বিদ্যুৎ খাতের অযৌক্তিক ব্যয় ও ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসা যায়, সেই পথ খুঁজবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, এ খাতে বিগত সরকারের চেয়ে ব্যয় আরো বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।’
১৪. ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে কোনোভাবেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এজন্য জ্বালানি খাতের আগাগোড়া সংস্কার দরকার। এ কাজ বিইআরসির দ্বারা অংশীজনদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে করা প্রয়োজন। তাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। শুনানিতে বলা হয়েছে, আবেদন যেন আন্দোলনে পরিণত না হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সরকার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মানুষ তার সমস্যা সমাধান করে নেবেন। তাই ভোক্তাদের দাবি:
ক) শুনানিতে উপস্থাপিত শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যহার ৭৫ দশমিক ৭২ বৃদ্ধির প্রস্তাব খারিজ করতে হবে;
খ) সংশোধিত বিইআরসি আইনের ৩৪ক ধারার আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের সব আদেশ বাতিল করতে হবে এবং জ্বালানি তেলের মূল্যহার বিইআরসি কর্তৃক গণশুনানির ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে;
গ) বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে সমন্বয়কৃত লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের সর্বমোট পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে এবং বিদ্যমান মূল্যহারে সমন্বয়কৃত লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও সরকারের রাজস্ব কমিয়ে বিদ্যুৎ ও সব জ্বালানির মূল্যহার কমাতে হবে;
ঘ) জ্বালানি অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে;
ঙ) জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য বিইআরসি আইন সংস্কার করতে হবে এবং
চ) ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসির আওতায় অংশীজন প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিশন দ্বারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার এবং মন্ত্রণালয়কে নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
এম শামসুল আলম: জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব এবং
ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়