মূলত কার্যকর নীতি না নেয়ার ফলে যেকোনো বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের রফতানি খাতের চাপ বেড়ে যায়। এটাকে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থেকে উদ্ভূত সংকট বললে অত্যুক্তি হবে না।
রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনার কথা জনপরিসরে বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু এর পরও দেখা যায় এ লক্ষ্য পূরণে তেমন কোনো বাস্তব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। আবার দেশে যেকোনো উদ্যোগে অর্থায়নের উৎস করা হয়েছে ব্যাংক খাতকে। যে কারণে ব্যবসা বা রফতানিতে মন্দাবস্থা তৈরি হলেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংক খাতে; ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। এতে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দেয় এবং ব্যাংকগুলো অর্থায়নের সক্ষমতা হারায়। এতে চক্রকারে আবার ব্যবসা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। সুতরাং যতদিন পর্যন্ত রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনা যাবে না ততদিন যুদ্ধ বা যেকোনো বিরূপ বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রফতানি খাত অরক্ষিত হয়ে পড়বে। এর সামগ্রিক চাপ পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।
এ চাপের চক্র থেকে বের হতে হলে সরকারকে রফতানি খাতের নীতি-কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের ব্যবসা চিত্রে পরিবর্তন আনা। দেশের রফতানি কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই একমুখী। মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। এ খাত নিঃসন্দেহে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি ঝুঁকিও তৈরি করেছে; যা অতিরিক্ত নির্ভরতা সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়া কিংবা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা—এর যেকোনো একটি কারণেই যখন তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যায়, তখন পুরো রফতানি আয়ে প্রভাব পড়ে, যার প্রতিফলন বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি দেশের ব্যবসা খাতে যে বৈচিত্র্য কম সেটিও স্পষ্ট করে।
দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা যদি তাদের বাড়তি অর্থ নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ করেন তবে কেবল পোশাক রফতানি কমে গেলে বিপাকে পড়ার ঝুঁকিও কমে যাবে। বিদ্যুৎ, আবাসন, কৃষি, গবাদি পশুর খামার, হোটেল, ব্যাংকিং, চা বাগান, কম্পিউটার চিপস, বীমা, পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, লিজিং, ই-কমার্স, নির্মাণশিল্প, ওষুধ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা খাতে তারা বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের ব্যবসা পরিবেশে বৈচিত্র্য আনতে পারেন। এতে রফতানি পণ্যও বহুমুখী করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। কার্যকর শিল্পনীতি ও প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ব্যবসা ও রফতানি খাতকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
প্রধান বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা হ্রাস, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন—এসব কারণে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি কমছে। মাসের পর মাস নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এ সংকটকে সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আবারো সামনে এনেছে। অথচ বিকল্প রফতানি খাতগুলো—যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল, আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য বা প্রকৌশল পণ্য যদি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বিকশিত করা যেত তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব ছিল।
পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে অন্যান্য অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংকটগুলো। জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি—এসব কারণে শিল্প-কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শুধু রফতানি নয়, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও হুমকির মুখে পড়ছে।
এ প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্ট, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই রাখতে হলে ব্যবসা খাত ও রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনা অপরিহার্য। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতগুলোয় বিনিয়োগ ও নীতিসহায়তা বাড়াতে হবে। ফার্মাসিউটিক্যাল, তথ্যপ্রযুক্তি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যে পরিকল্পিত উন্নয়ন ঘটাতে পারলে রফতানি আয়ের ভিত্তি বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। এক্ষেত্রে চীন, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর ব্যবসা বা রফতানি মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। এসব দেশ ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল, সৌর প্যানেল, কেমিক্যাল, এমনকি উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যও রফতানি করে। বাংলাদেশও ক্রমেই এ পথে হাঁটতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন বা পুরনো ব্যবসায়িক উদ্যোগে অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যাংকনির্ভরতা কমানোই সমীচীন। কেননা বর্তমানে ব্যাংক খাতের যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও এক ধরনের নীতি দুর্বলতা থেকে উদ্ভূত। এজন্য পুঁজিবাজারকে কার্যকর করা যেতে পারে, যাতে শিল্প খাত ব্যাংক ঋণের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে ব্যবসায়ীরা অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। করপোরেট বন্ড মার্কেট চালু করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়ানো এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এতে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমবে এবং ঝুঁকিও কমে আসবে। এছাড়া ব্যাংক খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। নির্দিষ্ট খাতে অতিরিক্ত ঋণ দেয়ার প্রবণতা ও চর্চা কমাতে হবে এবং ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শুধু পুনঃতফসিল বা নীতিসহায়তার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আড়াল না করে, বাস্তবসম্মত ঋণ পুনর্গঠন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
সবশেষ বর্তমান সংকট একটি সতর্কবার্তা—অর্থনীতির ভিত্তি যতই শক্তিশালী মনে হোক, যদি তা একমুখী ও সীমিত বৈচিত্র্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সামান্য ধাক্কাতেই নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে। ব্যবসা ও রফতানি পণ্য—এ দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট ফিরে আসবে।
সরকারের উচিত এক্ষেত্রে টেকসই কাঠামোগত সংস্কারের দিকে যাওয়া। সঠিক নীতিনির্ধারণ, কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। অন্যথায় রফতানি খাতের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা আরো গভীর হয়ে পুরো অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।