নীতি আলোচনা

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি: সিন্ডিকেট মধ্যস্বত্বভোগী ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ

এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কেন একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে? বাস্তবে বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি সিন্ডিকেট গঠনের পথ সুগম করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কারণটি হলো কর্মী নিয়োগের কার্যাদেশ বা ‘রিক্রুটমেন্ট অর্ডার’ পাওয়ার ক্ষেত্রে একচেটিয়া বা সীমিত সুযোগ।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি একটি কৌতূহলোদ্দীপক উদাহরণ, যা দেখায় যে বাজারের সীমিত প্রবেশাধিকার, মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর, সুশাসনের ঘাটতি, স্বচ্ছতার অভাব ও অন্যায্য সুবিধা আদায়ের প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে কীভাবে একটি নিয়োগ-সংক্রান্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে। সমস্যাটি কেবল অভিবাসন ব্যয়ের আধিক্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রতিযোগিতা, শ্রমিকদের সুরক্ষা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও শ্রমবাজার-সংশ্লিষ্ট স্বার্থকেও প্রভাবিত করে।

এ সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার পেছনের কারণগুলো বুঝতে হলে আমাদের কয়েক বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। কর্মী নিয়োগ চার বছর বন্ধ থাকার পর, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগ-সংক্রান্ত একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং অনিয়ম রোধ করা। তবে মালয়েশিয়া শুরু থেকেই বাংলাদেশী নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত রাখার চেষ্টা করেছিল। বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াটি একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর—প্রথমে ২৫টি এবং পরে ১০১টি সংস্থার—হাতে ন্যস্ত করা হয়। এটিই সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার মূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে: সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) চুক্তির ফলে অনুমোদিত নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে নিয়োগ আদেশ ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। ফলে অন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং এ সুযোগ পাওয়ার জন্য সিন্ডিকেট সদস্যদের অর্থ প্রদানের পথ সৃষ্টি হয়। এর পরিণামে কর্মীদের নিয়োগের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার ফলে তারা আরো বেশি ঋণগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে বাংলাদেশী ও মালয়েশীয় এজেন্টদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শোষণের ঘটনার জেরে ২০১৬-১৮ সালের বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিয়োগ ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়েছিল। এখন বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের সমঝোতা স্মারকের পরও সরকারিভাবে নির্ধারিত খরচের সর্বোচ্চ সীমা অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও কর্মীদের প্রায় ৫-৬ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের জন্য। এর কারণ হলো সিন্ডিকেট গঠনের ফলে বেশকিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল।

প্রথমত, অভিবাসন ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধি, যা সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান ফলাফল। ২০২১ সালের সমঝোতা অনুযায়ী অভিবাসনের জন্য নির্ধারিত সরকারি ব্যয় ছিল প্রায় ৭৯ হাজার টাকা, কিন্তু বাস্তবে কর্মীদের গড়ে প্রায় ৫ হাজার ডলার (বা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা) ব্যয় করতে হতো। ফলে সরকার নির্ধারিত ব্যয় ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়। এর বেশকিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল: অভিবাসন ব্যয়ের সংস্থান করতে কর্মীদের বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হতো, পরিবারগুলোকে সম্পদ বন্ধক রাখতে বা বিক্রি করতে হতো, ঋণের কারণে অভিবাসীরা নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তেন, শোষণমূলক কর্মপরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা কমে যেত এবং অভিবাসন থেকে পরিবারের প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেত। এ বিষয়ক গবেষণায় অতিরিক্ত নিয়োগ ফির সঙ্গে ঋণের বোঝা এবং শোষণ ও জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির সরাসরি সম্পর্ক চিহ্নিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এতে কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি হয়। একটি সিন্ডিকেট গঠনের জন্য সব নিয়োগকারী সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আঁতাত করতে হয় না। নিয়োগ আদেশ পাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণই একটি সিন্ডিকেটের মতো কাঠামো সৃষ্টি করতে পারে। যখন শুধু সীমিতসংখ্যক সংস্থা মালয়েশীয় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে, তখন বাজারে প্রবেশাধিকার দুর্লভ হয়ে পড়ে। সিন্ডিকেট গোষ্ঠীর বাইরের সংস্থাগুলো সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার কিনতে হতে পারে; অতিরিক্ত ‘সিন্ডিকেট ফি’ দিতে হতে পারে; মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কাজ করতে হতে পারে এবং তাদের নিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার একটি অংশ ছেড়েও দিতে হতে পারে। এমন খবরও পাওয়া যায় যে সদস্য নয় এমন সংস্থাগুলোকে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সিন্ডিকেট-সম্পর্কিত চার্জ দিতে হয়েছে।

তৃতীয়ত, মধ্যস্থতাকারীদের একাধিক স্তর তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, নিয়োগ শৃঙ্খলটি এভাবেই কাজ করত: মালয়েশীয় নিয়োগকর্তা থেকে মালয়েশীয় নিয়োগকারী মধ্যস্থতাকারী; সেখান থেকে বাংলাদেশী নিয়োগকারী সংস্থা, তারপর সাব-এজেন্ট, স্থানীয় দালাল ও সবশেষে সম্ভাব্য অভিবাসী। প্রতিটি ধাপে একটি ফি যোগ হয়। এটি চিরায়ত প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যার সৃষ্টি করে। সম্ভাব্য কর্মী নির্ধারণ করতে পারেন না: নিয়োগটি আসলে কে নিয়ন্ত্রণ করছেন; নিয়োগকর্তা কী পরিমাণ অর্থ প্রদান করছে; আইনসম্মত নিয়োগ ফি কত; কোন অংশ কোন মধ্যস্থতাকারীর কাছে যাচ্ছে এবং প্রতিশ্রুত চাকরিটি আদৌ বিদ্যমান কিনা। ফলে তথ্যগত অসামঞ্জস্য মুনাফা আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে।

চতুর্থত, ভিসা ও নিয়োগ আদেশ-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ভিসা ও নিয়োগ আদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ মধ্যস্থতাকারীদের যথেষ্ট দরকষাকষির ক্ষমতা দেয়। যেখানে নিয়োগকারী সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে নিয়োগ আদেশ পেতে বা কর্মী প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে না, সেখানে এ সুযোগের অধিকারী সংস্থা অতিরিক্ত মূল্য ধার্য করতে পারে। এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ বাজারকে মুনাফালোভী বাজারে রূপান্তরিত করে। বিষয়টি এতটাই গুরুতর ছিল যে অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় এবং কর্মীদের নিয়োগ ছাড়া আগমনের মতো উদ্বেগের কারণে মালয়েশিয়া ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে।

পঞ্চমত, কর্মসংস্থান ছাড়া কর্মীদের আগমনের বিষয়। এর সবচেয়ে ক্ষতিকর পরিণতিগুলোর মধ্যে একটি হলো অভিবাসনের জন্য প্রদত্ত অর্থ এবং প্রকৃত কর্মসংস্থানের মধ্যে ব্যবধান। একজন কর্মী একটি নির্দিষ্ট চাকরির প্রত্যাশায় বড় অংকের অর্থ প্রদান করতে পারেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি দেখতে পান কোনো তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান নেই; ভিন্ন নিয়োগকর্তা; ভিন্ন পেশা; প্রতিশ্রুত মজুরির চেয়ে কম মজুরি এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আয় নেই।

ষষ্ঠত, অনানুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি। কর্মী নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকায় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেনের প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে হুন্ডি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহারের অভিযোগও কিন্তু রয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনায় আইনিভাবে প্রমাণিত তথ্যের সঙ্গে এসব অভিযোগকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও এর ব্যাপকতর অর্থনৈতিক প্রভাবটি স্পষ্ট: অনানুষ্ঠানিক লেনদেন স্বচ্ছতা কমিয়ে দেয় এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত আয়ের প্রকৃত বণ্টন প্রক্রিয়াটি যাচাই করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য কঠিন করে তোলে।

এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কেন একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে? বাস্তবে বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি সিন্ডিকেট গঠনের পথ সুগম করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কারণটি হলো কর্মী নিয়োগের কার্যাদেশ বা ‘রিক্রুটমেন্ট অর্ডার’ পাওয়ার ক্ষেত্রে একচেটিয়া বা সীমিত সুযোগ। যদি দেড় হাজার এজেন্সি নিয়োগের ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, তবে সেই প্রতিযোগিতা সাধারণত মুনাফার হারকে সীমিত রাখে। কিন্তু যদি এ সুযোগ মাত্র ২৫ বা ১০১টি এজেন্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই সদস্যপদ পাওয়ার অর্থনৈতিক মূল্য বা গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া এতে আন্তঃসীমান্ত মধ্যস্থতার বিষয়টিও জড়িত। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন এখতিয়ারভুক্ত অঞ্চলের—বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া—সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জড়িত থাকে। ফলে তদারকি বা নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে; কারণ বাংলাদেশ তার দেশের এজেন্সিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর মালয়েশিয়া নিয়ন্ত্রণ করে নিয়োগকর্তা ও মালয়েশীয় মধ্যস্থতাকারীদের। ফলে অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর হলেও কর্মীরা বুঝতে পারেন না যে কোন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ বা সহায়তা চাইতে হবে। সৃষ্ট এ নিয়ন্ত্রণমূলক শূন্যতার সুযোগ নেয় মধ্যস্থতাকারীরা। পাশাপাশি তথ্যের অসামঞ্জস্যও একটি বড় বিষয়। মালয়েশিয়ার মজুরির হার, নিয়োগকর্তার পরিচয়, নিয়োগের ব্যয়, ভিসার শর্তাবলি, কাজের প্রাপ্যতা এবং চুক্তির শর্তাবলি সম্পর্কে নিয়োগকারীদের তুলনায় কর্মীদের কাছে সাধারণত অনেক কম তথ্য থাকে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীরা অন্যায্য বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নেয়।

তাছাড়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন তদন্ত ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কোনো কোনো পক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশের অভিযোগ অনেক সময় উঠেছে। তবে এগুলো কেবলই অভিযোগ ও তদন্তলব্ধ তথ্য; এর ভিত্তিতে প্রতিটি এজেন্সি বা ব্যক্তি এসবের সঙ্গে জড়িত তা গণ্য করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনে এজেন্সি নির্বাচন এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত ফি আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ফির সর্বোচ্চ সীমা বা ‘ফি সিলিং’ কার্যকর করার ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়েছে। শ্রমিকদের প্রকৃত কত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে তা তদারক করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ফির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের বিষয়টি অর্থহীন হয়ে পড়ে। নির্ধারিত খরচ (প্রায় ৭৯ হাজার টাকা) এবং প্রকৃতপক্ষে পরিশোধিত অর্থের (প্রায় ৫-৬ লাখ টাকা) মধ্যকার বিশাল ব্যবধানই এ তদারকি বা বাস্তবায়নজনিত সমস্যাটিকে স্পষ্ট করে তোলে।

উল্লিখিত সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশের ওপর যে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে, তা কেবল অভিবাসী কর্মীদের ব্যক্তিগত গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিবাসন প্রক্রিয়ার উচ্চ ব্যয়ের ফলে অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল বেশ অনেকটাই কমে যায়; কারণ নিয়োগ-সংক্রান্ত ঋণ, ঋণের সুদ এবং অভিবাসনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচের কারণে অভিবাসীর মোট উপার্জনের তুলনায় পরিবারের হাতে আসা নিট অর্থের পরিমাণ অনেক কম হয়। নিয়োগের ব্যয় যদি সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়, তবে সেই ব্যয় পুষিয়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। বাংলাদেশের শ্রম-রফতানি খাতের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হ্রাস করে; দক্ষতার পরিবর্তে বিশেষ সুযোগ বা প্রবেশাধিকারকে প্রাধান্য দেয়; নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশকে নিরুৎসাহিত করে; লেনদেন-সংক্রান্ত ব্যয় বাড়িয়ে দেয়; বাংলাদেশী নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন করে এবং মালয়েশীয় নিয়োগকর্তাদের মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল করে তোলে। এছাড়া শুরুতে উচ্চ ব্যয়ের কারণে একজন অভিবাসী কর্মীর পক্ষে নিজের পরিবারের জন্য প্রকৃত রেমিট্যান্স বা অর্থ পাঠানো শুরু করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক কর্মী তাদের প্রাথমিক উপার্জনের একটি বড় অংশই অভিবাসন-সংক্রান্ত ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে, নিয়োগ-সংক্রান্ত একের পর এক কেলেঙ্কারির ফলে কর্মী নিয়োগ স্থগিত হওয়া, মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে কঠোর যাচাই-বাছাই, বাংলাদেশী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার মডেলে পরিবর্তনের জন্য চাপের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। অতীতের ঘটনাপ্রবাহই এ ঝুঁকির বিষয়টি প্রমাণ করেছে: মালয়েশিয়া অতীতেও এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছিল।

এ প্রেক্ষাপটে মূল সুশাসন-সংক্রান্ত সমস্যাটি উদ্ভূত হয়েছে একটি বিষয় থেকে আর তা হলো অভিবাসনের যে সুযোগটি মূলত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা ছিল, তা এখন মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের (এজেন্সি) একচেটিয়া বা সীমিত অধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ যখন অল্প কিছু এজেন্সির হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে, তখন সেই সুযোগটি এক ধরনের অনৈতিক ‘অর্থনৈতিক সুবিধা’ বা ‘রেন্ট’ উপার্জন করার উৎস হয়ে ওঠে। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এ এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ দেয়ার বিনিময়ে অন্য এজেন্সি এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীদের—কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং সমস্যাটি কেবল ‘দুর্নীতিপরায়ণ নিয়োগকারী এজেন্ট’-এর বিষয় নয়; বরং এটি মূলত বাজার কাঠামো ও সুশাসনের সমস্যা।

উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর সমাধান প্রয়োজন: ১. এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণে উন্মুক্ততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ২. প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ চাহিদা বা ‘জব অর্ডার’ বণ্টন, ৩. নিয়োগকর্তার পরিচয় ও অবস্থান সরাসরি যাচাই করা, ৪. প্রতিটি কর্মীর নিয়োগ-সংক্রান্ত খরচের ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা নজরদারি, ৫. শনাক্তযোগ্য আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে কর্মীদের পারিশ্রমিক প্রদান, ৬. যেখানে সম্ভব সেখানে নিয়োগকর্তা কর্তৃক নিয়োগ ব্যয় বহন, ৭. বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ তদারকি ব্যবস্থা, ৮. অননুমোদিত ফি আদায়কারী এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, ৯. কর্মীদের অভিযোগ জানানোর সরাসরি ব্যবস্থা এবং ১০. ভিসা ও জব অর্ডার বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরীক্ষা বা অডিট। বিকল্প ব্যবস্থা যে সম্ভব তার প্রমাণও রয়েছে। বাংলাদেশের বোয়েসেলের তথ্য অনুযায়ী, একটি বিশেষ নিয়োগ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ সালে ৮৮৫ জন কর্মী কোনো প্রকার অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন।

মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হচ্ছে এই যে শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিয়োগকারী সংস্থার সংখ্যা বাড়ালেই সিন্ডিকেট নির্মূল হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রতিটি সংস্থা প্রকৃত নিয়োগ আদেশে স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার পাচ্ছে কিনা এবং সরকার প্রত্যেক অভিবাসীর প্রদত্ত প্রকৃত মূল্য পর্যবেক্ষণ করতে পারছে কিনা। সুতরাং একটি অধিকতর টেকসই মডেল হবে এজেন্টকেন্দ্রিক নিয়োগ ব্যবস্থা থেকে সরে এসে নিয়োগকর্তা চালিত, ডিজিটালভাবে স্বচ্ছ ও শ্রমিক সুরক্ষাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যেখানে নিয়োগের ব্যয় প্রধানত নিয়োগকর্তারা বহন করবেন এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিয়োগ করিডোরের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে। বিশ্লেষণাত্মকভাবে মালয়েশিয়ার ঘটনাটিকে বাজার কেন্দ্রীকরণ, তথ্যগত অসামঞ্জস্য, নিয়ন্ত্রক আরবিট্রেজ, রেন্ট সিকিং ও আন্তঃসীমান্ত মধ্যস্থতার একটি সংমিশ্রণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ পাঁচটি কারণ নিয়োগ সিন্ডিকেট গঠন এবং বাংলাদেশী শ্রমিকদের অস্বাভাবিক উচ্চ অভিবাসন ব্যয়—উভয়ই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

মোস্তফা কে মুজেরী: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)

আরও