নব্বই দশকের শুরু থেকে ২০০০ সালের শেষ পর্যন্ত আমরা দেখেছি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যেমন বৃক্ষরোপণ, টিকাদান, স্যানিটেশন কর্মসূচি—গণসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এসব ক্ষেত্রে শুধু সচেতনতা নয়, কখনো কখনো জবাবদিহিতার কিছু প্রাথমিক কাঠামোও গড়ে উঠেছিল। ফলে দেশের টিকাদান বা স্যানিটেশন নিয়ে নাগরিক মনোভাব ও অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক ছিল এবং সেসব কর্মসূচি সফলতার মুখও দেখেছে। কিন্তু একই সময় বা পরবর্তী সময়ে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর তেমন কোনো প্রয়াস চোখে পড়েনি। অথচ জাতি হিসেবে আমরা প্রবলভাবে রাজনৈতিক—গ্রামের টং দোকান থেকে শুরু করে শহরের চায়ের টেবিল পর্যন্ত রাজনীতি আমাদের প্রতিদিনের আলোচনার অংশ। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা, সেবার প্রাপ্যতা, স্থানীয় সংকট সব নিয়েই চলে প্রাণবন্ত তর্ক, মতামত ও ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ। মানুষজন তাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেশের ভালো-মন্দ বিচার করে, নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করে। কিন্তু নিজেদের অধিকার, স্থানীয় পরিষদের কাজ, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা কিংবা এ-সংক্রান্ত আইনের প্রসঙ্গ এলেই এ আলোচনা যেন খেই হারিয়ে ফেলে। কেন?
কারণটা মূলত চেয়ারের এপাশ আর ওপাশকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতি কিংবা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যেখানে সমাজের প্রভাবশালী (প্যাট্রন) এবং তাদের সুবিধাভোগী (ক্লায়েন্ট) একে অন্যের সঙ্গে এক ধরনের জটিল সমীকরণে আবদ্ধ। বিষয়টা অনেকটা এ রকম যে ক্ষমতাবান কেউ ‘সেবা’ দেয় আর সাধারণ মানুষ সেটি কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করে। কিন্তু সেবা পাওয়া যে তাদের নাগরিক অধিকার, সেটি অনেকেই জানে না, আর জানলেও দাবি করতে ভয় পায়। ভয় থাকে প্রতিবাদ করলে হয়তো ভবিষ্যতে সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অথচ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের জন্যই কাজ করবেন—এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু গণমাধ্যমগুলোয় প্রায়ই দেখা যায়, অনেক জনপ্রতিনিধিই জনগণের কথা না শুনে দলীয় নেতাদের খুশি রাখতে ব্যস্ত; আমাদের মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাও একই বার্তা দেয়। স্থানীয় প্রতিনিধিরা জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে দলীয় নেতার অনুসারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করায় ব্যস্ত। এভাবে স্থানীয় সরকার কাঠামোও হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় রাজনীতির অংশ যেখানে জনগণ দর্শকমাত্র। এ সংকট শুধু কাঠামোগত নয়, এখানে নৈতিকতার ঘাটতিও একটা বড় বিষয়। জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশ রাজনীতিকে পেশা বা ব্যবসা হিসেবে দেখে, দায়বদ্ধতা বা জনসেবার মানসিকতা নিয়ে দেখে না। যদিও জনসেবা বা দায়বদ্ধতার কথা বলেই নির্বাচনের সময়ে তারা ভোট সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
দিনের পর দিন সেবা পেতে হয়রানি এবং জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতায় মানুষ এক ধরনের রাজনৈতিক নিরাসক্ততার দিকে এগিয়ে চলেছে। অনেকেই মনে করে—ভোট দিলেও কিছু হয় না; পরিষেবা পাওয়া যায় না, অভিযোগ করলে কেউ শোনে না, ন্যায্য পাওনার জন্য ঘুরতে হয় দ্বারে দ্বারে। এতে মানুষের মাঝে এক ধরনের তিক্ত মনোভাবের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় রাজনীতি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ‘ওপরের জগৎ’, যেখানে নিজের কোনো ভূমিকা আছে বলে কেউ মনেই করে না, বিশেষ করে নারী ও তরুণরা। বিআইজিডি ও দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের ২০২২-২৩ সালে ‘দ্য স্টেট অব বাংলাদেশ’স পলিটিক্যাল গভর্ন্যান্স, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোসাইটি: অ্যাকর্ডিং টু ইটস সিটিজেন’ শীর্ষক জরিপেও রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে। নারীরা অনেক সময় নিজের ভোটের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নেয় না—পরিবারের পুরুষ সদস্যের সিদ্ধান্তেই তারা ভোট দেয়। এ নিষ্ক্রিয়তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, হয়ে উঠছে সামাজিক এক অবরোধ, যা ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে।
সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় জনগণের ভূমিকা নিয়ে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনকে ঘিরে বিআইজিডির এ পর্যবেক্ষণ আবর্তিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একদম তৃণমূল পর্যায়েও নাগরিকরা সুযোগ পেলে সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন সভায় অংশ নেয় ও তাদের মতামত জানায়। এছাড়া সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের নিজস্ব রাজনৈতিক সচেতনতাও বিদ্যমান। এ রাজনৈতিক বোঝাপড়ার দ্বারা মানুষ তার ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক স্বার্থ বুঝতে পারে। নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে যা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও পরিষেবার উন্নয়নে নাগরিকদের শক্তি অর্থপূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব, যদি আমরা কিছু মৌলিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাই।
প্রথমত, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাজেট সভা বা ওয়ার্ড সভাগুলো নিয়মিত ও অর্থবহ করতে হবে। কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেই যেন সেসব সভায় মানুষ আসে, কথা বলে এবং শুনতে পায় সেটা নিশ্চিত করতে কাজ করতে হবে। নাগরিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের যৌথভাবে এ সভাগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পরোক্ষ নির্বাচন, প্রত্যক্ষ নির্বাচন, আলোচনাপ্রসূত গণতন্ত্র, সামষ্টিক নাগরিকদের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমে একেবারে তৃণমূল থেকে জনপ্রতিনিধি বাছাই করে সভাগুলোয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বাজেট, প্রকল্প ও বরাদ্দসংক্রান্ত সব তথ্য যেন সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে ও পেতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই এসব তথ্য সবার নাগালে পৌঁছে দেয়া সম্ভব, যেমনটা আমরা কভিডকালে লক্ষ করেছি।
তৃতীয়ত, স্থানীয় নির্বাচনকে শুধু বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিযোগিতার মঞ্চ না বানিয়ে এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। সরকারের ওপর মহল থেকে যেমন চেষ্টা করতে হবে, অন্যদিকে অর্থাৎ নাগরিকদেরও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে। এতে করে সর্বস্তরের নাগরিকদের স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
চতুর্থত, নারী ও তরুণদের প্রস্তুত করতেও ভবিষ্যতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠদের উচিত হবে তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা এবং তাদের চিন্তাভাবনা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা। নারীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শুধু সংরক্ষিত আসনেই নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি, যাতে নারী ও তরুণরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, নিজস্ব অবস্থান থেকে নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে পারে।
সবশেষে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার কমিশনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ পর্যবেক্ষণ, ব্যর্থ হলে প্রশ্ন তোলা এবং জনগণের সামনে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাধ্য করাই হবে এ কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ। জনপ্রতিনিধিদেরও মনে রাখতে হবে নির্বাচন জিতলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং সেখান থেকেই শুরু হয় জনসেবার প্রকৃত যাত্রা।
স্থানীয় সরকারকে সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য কার্যকর করতে হলে এ কাঠামোকে শুধু নিয়মতান্ত্রিক নয়, জনসম্পৃক্ত করে তুলতে হবে। আর তার জন্য চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতন ও সক্রিয় নাগরিকদের অংশগ্রহণ।
মাধুরী গোস্বামী: বাংলা কনটেন্ট এডিটর ও
জিহাদ আল মেহেদী: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সিনিয়র কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট