অভিমত

সিলেট অঞ্চলে তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রবণতা

বাংলাদেশ আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও এর ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অনন্য। এগুলোর বৈচিত্র্যময় গঠন ও বৈশিষ্ট্য মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশ আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও এর ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অনন্য। এগুলোর বৈচিত্র্যময় গঠন ও বৈশিষ্ট্য মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। প্রকৃতিগতভাবেই বংশপরম্পরায় সেই ধারা চলতে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মের অবচেতন মনে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলও তার ব্যতিক্রম নয়।

এ অঞ্চলের তরুণেরা লাইফস্টাইল ও জীবনবোধের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য লালন ও চর্চা করে। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই চর্চাগুলো তরুণদের পেশা বাছাই বা কর্মজীবন শুরুকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। এ অঞ্চলে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রবণতায় যার বিশেষ প্রভাব রয়েছে।

বিদেশগামী মানসিকতা: সিলেট অঞ্চলের তরুণদের লেখাপড়ার কোনো এক পর্যায়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে প্রবল। অধিকাংশ পরিবারও সেটাতে সমর্থন জোগায়। ফলে দেশে পরিবারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা থাকা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার মতো সাপোর্ট থাকলেও তারা সেগুলোয় মনস্থির করতে পারে না। তারা শৈশব-কৈশোর থেকে নানা আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বিদেশ যেতে দেখে, প্রবাসী প্রিয়জনদের সঙ্গে আলাপ করে, পরিবারের কাছে তাদের গল্প শোনে। এক পর্যায়ে তাদের মনেও স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়। তারাও বড় হয়ে বিদেশ যাবে—এমন স্বপ্নে বিভোর হতে থাকে। তারা নানা উপায়ে বিদেশে যাওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। ফলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বা পেশা বাছাইসংক্রান্ত বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অধিকাংশই খুব একটা আগ্রহী হয় না।

বিনিয়োগে তুলনামূলক ভাবনা: দেশে বহু কষ্ট করে একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, বহু ক্ষেত্রে তার চেয়ে কম পরিমাণ অর্থে বিদেশে যাওয়া সম্ভব হয়। তাছাড়া দেশে নানারকম অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকায় পরিবারও দেশে বিনিয়োগের জন্য অর্থ দিতে রাজি হয় না। বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা হলে ঋণ-দেনা করে হলেও পরিবার তাতে সহজে সম্মত হয়। ফলে তুলনামূলক সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে তরুণ ও যুবকরা বিদেশে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দেন।

তাছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা প্রতিকূলতা এবং সন্তানের কঠোর পরিশ্রম করার অভ্যাস না থাকায় সে যে একটা ব্যবসা উদ্যোগ সত্যিই ঠিকমতো দাঁড় করাতে বা পরিচালনা করতে পারবে... বহু অভিভাবক সেটা বিশ্বাস করেন না। পাশাপাশি বিদেশে গিয়ে অল্প কিছুদিন কঠোর পরিশ্রম করলেই সৌভাগ্যের দরজা খুলে যাবে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাতে পারবে—এমন ভাবনা অভিভাবকদের প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, দেশে থাকলে সারা জীবন কষ্ট করেও খুব একটা ভালো করার সম্ভাবনা দেখেন না কিংবা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে জীবনের ঝুঁকি, মামলা-হামলার ভয় ইত্যাদি কারণে মা-বাবা সন্তানের বিদেশে পাড়ি জমানোকে অধিকতর পছন্দ করেন।

ব্যবসায়িক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা: অধিকাংশ তরুণের ব্যবসা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় তাদের অভিভাবকরা তাদের হাতে অর্থ তুলে দিতে ভয় পান। তাদের সন্তান নতুন একটা পণ্যের ব্যবসা করতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা সমস্ত পুঁজি যদি হারিয়ে ফেলে—এ ভয়ে তাদের ব্যবসার উদ্যোগে সমর্থন দেয় না। বরং অনেক মা-বাবা সন্তানের বিজনেস আইডিয়া শোনার পর বলেন, ব্যবসা করে তোমার যা লাভ হবে আমরা প্রতি মাসে তোমাকে সেই পরিমাণ টাকা দেব। যতদিন বিদেশ যাওয়া না হয়, তুমি কেবল নিজের মতো করে সময় কাটাও... তবুও ব্যবসার ঝুঁকি নেয়ার দরকার নেই। ফলে ব্যবসায় বিনিয়োগ করার চেয়ে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট রাখা তাদের অনেকেই বেশি পছন্দ করেন। সেজন্যই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বৃহত্তর সিলেটে ব্যাংকগুলোয় বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ পড়ে থাকে।

দক্ষ কর্মীর সংকট: একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে গেলে অসংখ্য দক্ষ কর্মীর দরকার হয়। বিশেষত উৎপাদনমুখী ব্যবসায় শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সিলেট অঞ্চলে এ-জাতীয় কর্মীর সংকট বেশ প্রকট। স্থানীয় শ্রমিক সরবরাহের চিত্র হতাশাজনক। ফলে দূরবর্তী বা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। এটা অনেক সময় উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বড় সংকট বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে সিলেটের অধিকাংশ ব্যবসায়ী তাদের কর্মচারীদের আচার-আচরণে অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত। অনেক বেশি অর্থ দিয়েও ক্ষেত্রবিশেষে নিবেদিত কর্মী পাওয়া যায় না।

উৎপাদনমুখী উদ্যোগ নিয়ে শ্রমিকসংক্রান্ত নানা জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার ঘটনা অনেকের কাছেই শোনা যায়। কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় এবং মানসম্মত কর্মী না পাওয়ায় এক পর্যায়ে সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতেও বাধ্য হয়েছেন। তাছাড়া কিছু দক্ষ কর্মী ম্যানেজ করে ব্যবসা শুরুর পর হঠাৎ করে সেই শ্রমিকের (বাবুর্চি, কারিগর, দর্জি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি প্রভৃতি) বিদেশ চলে যাওয়ার কারণে উদ্যোক্তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সেই উদ্যোক্তা অথৈ সাগরে পড়ে যান। আসলে আগ্রহ নিয়ে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করবে—এমন শ্রমিক বা কর্মী দুর্লভ। সবাই সাময়িক একটা কিছু করতে চায়। কিন্তু লেগে থেকে কাজটা শেখা বা ভালো দক্ষতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা স্বল্পসংখ্যক কর্মীর মধ্যে দেখা যায়।

অন্যদিকে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেগুলোর ফোকাস বিদেশে লোক পাঠানোকেন্দ্রিক। ফলে সেগুলোয় প্রশিক্ষণ নেয়া ব্যক্তিরা নিজেদের অধিকতর যোগ্য ভাবতে শুরু করে এবং দেশে ভালো কিছু করা সম্ভব—সেটা তারা বিশ্বাস করে না। ফলে বিদেশ যাওয়ার আগ পর্যন্ত কেবল টাইম পাস করতে চায়। এমন লোক দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হয়। তাছাড়া যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের যোগাযোগের সরাসরি কোনো মাধ্যম নেই। ফলে চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি রয়েই যায়। সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের ডাটাবেজ থাকার প্রয়োজনীয়তা অনেক উদ্যোক্তা অনুভব করেন যেন তারা সহজেই বিশেষ দক্ষতার মানুষগুলোকে খুঁজে বের করতে পারেন।

প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব: শুধু আবেগ বা সাময়িক মোটিভেশন দিয়ে ব্যবসা চলে না। এর জন্য বিশেষ কিছু বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু দরকারি তথ্যও বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সমগ্র সিলেট অঞ্চলে এমন কোনো ‘তথ্য কেন্দ্র’ নেই যেখান থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার বা ব্যবসা শুরুসংক্রান্ত সব প্রশ্নের জবাব মিলতে পারে। কিংবা সহযোগিতা চাইলে নিয়মিত অর্গানাইজড সাপোর্ট দিতে পারে।

একজন ব্যবসায়ীর আর্থিক জ্ঞান থাকা খুব দরকার। সম্ভাব্য বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলো ধরতে পারা, ব্যয়ের খাতগুলো চিহ্নিত করা, ব্রেকইভেন পর্যায়ে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় অনেকেই ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। অথবা বিভিন্ন সংস্থা যে ডকুমেন্টগুলো চায় (যেমন বিজনেস প্ল্যান বা প্রপোজাল) তা প্রস্তুত করতে হিমশিম খায়। তাই এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মৌলিক শিক্ষা থাকা জরুরি। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মডিউল প্রস্তুত করে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে অনেকেই সেগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে।

বিসিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় অনেক কিছু করছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিটি বিভাগীয় শহরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি সফলতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ সমাপ্তকারীদের অন্তত দুই-তিন বছর পর্যন্ত দরকারি সব সাপোর্ট দেয়ার উদ্যোগ নেয়া উচিত। কারণ তাদের ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, বাজার খুঁজে পাওয়া, পণ্য প্রদর্শন করা, ভ্যাট-ট্যাক্সসংক্রান্ত ইস্যুতে সাপোর্ট দেয়ার মতো একটা আস্থার জায়গা থাকলে অনেকেই হয়তো ব্যবসার উদ্যোগ নিতে সাহস পেত। কিন্তু এখন কার কাছে যাবে, কাকে ওই বিষয়ে অনুরোধ করবে তা স্পষ্ট নয়।

সাম্প্রতিককালে তরুণদের মাঝে উচ্চশিক্ষা বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষত সিলেট অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি, বৃত্তিমূলক নানা প্রশিক্ষণ চালু হওয়ায় অনেকেই নিজেদের সেই ধারায় সম্পৃক্ত করছে। তাদের অধিকাংশই সফলও হচ্ছে। এমনটা হওয়ার পেছনে বেশকিছু ইতিবাচক উপাদান কাজ করছে যেমন:

শিক্ষিত ও নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি: সিলেট অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাস করা অনেকেই এখন ব্যবসায় নামছেন। বিশেষত বিজনেস বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়ায় তাদের অনেকেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছেন যে তারা ব্যবসায় নামলে কীভাবে সফল হওয়া সম্ভব। এমন পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বিদেশে থাকায় তরুণ সদস্য বাসাবাড়িতে থেকে একটা কিছু করবে—এটা অনেক অভিভাবক ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ফলে ইদানীং তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত নারীরা উদ্যোক্তা হতে এগিয়ে আসছেন। বিগত কয়েক বছরে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। তাদের অনেকেই বেশ ভালো করছে।

আত্মীয়-স্বজনদের অর্থায়ন বাড়ছে: পরিবারের বা গোষ্ঠীর কোনো সদস্য নিজ থেকে এলাকায় কিছু করতে আগ্রহ দেখালে বিদেশে থাকা অনেকেই তাকে সহযোগিতার মনোভাব দেখাচ্ছেন। এর পেছনে অন্যতম মোটিভেশন হলো দেশে পরিবারের সম্পদগুলো দেখেশুনে রাখা, আত্মীয়-স্বজনদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো সর্বোপরি নিজ পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নিজেদের একজন এলাকায় থাকা—এ বিষয়গুলোকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তাছাড়া বিদেশে গিয়ে কী কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তা তারা নিজেরাও জানেন। তাই তুলনামূলক কম পরিশ্রম করেও দেশে সফল হওয়ার জন্য তরুণদের উৎসাহ দেন। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মূলধন ও অন্যান্য সাপোর্ট দিতে তারা এগিয়ে আসেন। ফলে তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা সাম্প্রতিককালে বেশ বেড়েছে। অনুকূল পরিবেশ পেলে ভবিষ্যতে এর মাত্রা আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়।

চাকরির চেয়ে ব্যবসা পছন্দের: বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষ সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে সর্বাধিক মনোযোগ দেন। কিন্তু কোনো (বিশেষত পারিবারিক) কারণে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে তাদের দ্বিতীয় পছন্দ থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য করা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ যখন লেখাপড়া শেষে যেনতেন একটা চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন সিলেটের তরুণদের মধ্যে এমন প্রবণতা খুব একটা দেখা যায় না। তাদের পরিবারও চাকরির ব্যাপারে খুব একটা তৎপর হয় না। এতে প্রচলিত ধারায় পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করা তারা পছন্দ করে না। ফলে সন্তান মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা আইডিয়া নিয়া কিছু একটা শুরু করার চেষ্টা করলে পরিবার নেতিবাচক থাকে না। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কায় বহু ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয়।

কাঁচামালের সরবরাহ: বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির গঠন বেশ বৈচিত্র্যময়। তাই চার জেলায় উৎপাদিত ফল-ফসলে ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। তবে হাওর অঞ্চলে ধান-মাছ ছাড়াও নানারকম ফল ও সবজির চাষ ভালো হয়। কিছু অঞ্চলে কাঠের গাছও ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে। ফলে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা থাকা ওই পণ্যগুলোর ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। অর্গানিক সবজি, প্রসেসড ফুড ও ফ্রুট জুসের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা সম্ভব। দেশের অধিকাংশ চা বাগান সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত। অথচ তার কেনাবেচার কেন্দ্র করা হয়েছে চট্টগ্রামে যেটা অপ্রয়োজনীয় ও জটিলতার সৃষ্টি করে। এখানকার আগর থেকে তৈরি হওয়া আতর মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এ শিল্পের বিকাশে সরকারের তরফ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। বাঁশ ও বেত শিল্পের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রকৃতি অনেক দিয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারের উদ্যোগ নেই। ফলে সম্পদের যথার্থ ব্যবহার হচ্ছে না।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর চারু ও কারুশিল্প: সিলেট বিভাগে মোট ২৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যরা দীর্ঘকাল থেকে বসবাস করেন। খুব ব্যতিক্রম ছাড়া তারা নানারকম হস্তশিল্পজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এমনকি যারা দিনের সিংহভাগ সময় কৃষিকাজ ও বাগান চর্চায় ব্যস্ত থাকেন তারাও অবসর সময়ে নানা দ্রব্য প্রস্তুত করেন। সেগুলোর দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে পণ্যের জোগানের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় উৎস যার ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশ: পর্যটন খাত সাধারণত বহুমুখী শিল্পের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। তাই এ শিল্পের বিকাশে পরিবহন, হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, বিনোদন প্রভৃতি খাতে ব্যবসার সুযোগ বাড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ক্রমেই পর্যটন বাণিজ্যে ইতিবাচক ধারার সূচনা হচ্ছে। ফলে ট্যুরিজমসংশ্লিষ্ট নানা ব্যবসার সুযোগ বাড়ছে। মূলত সেবাকেন্দ্রিক হওয়ায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগে এ ব্যবসা করা যায়। ফলে তরুণদের অনেকেই এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসার উদ্যোগ নিচ্ছে।

ড. মো. আব্দুল হামিদ: সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) অতিরিক্ত পরিচালক

আরও