পলিসি কনক্লেভ

সাপ্লাই চেইনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে ইসলামী ব্যাংক

সময়োপযোগী সেমিনার আয়োজন এবং সেখানে আমন্ত্রণের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। আপনারা জানেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কৌশলগত দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক।

সময়োপযোগী সেমিনার আয়োজন এবং সেখানে আমন্ত্রণের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। আপনারা জানেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কৌশলগত দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক। দেশের রেমিট্যান্সের ৪০ শতাংশের বেশি আমাদের মাধ্যমে আসে, আমানতের ক্ষেত্রেও আমাদের অংশীদারত্ব সর্বাধিক এবং সম্পদের দিক থেকেও আমরা শীর্ষে। আমাদের শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং মিলে ৬ হাজার ৫০০ প্লাস ইউনিট রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে গ্রামের সংখ্যা ৬৪ হাজার (সরকারী হিসেবে ৮৭ হাজার)। আমাদের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা এরই মধ্যে ৩২ হাজার গ্রামে পৌঁছেছি।

আমরা সম্প্রতি মাননীয় গভর্নর মহোদয়ের কাছে আরো শাখা খোলার অনুমতি চেয়েছি। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যদি এটি বাস্তবায়ন করা যায়, আগামী তিন বছরে আমরা ৬৪ হাজার গ্রামে পৌঁছতে সক্ষম হব। ফলে সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারব।

আমি ধন্যবাদ জানাই আজকের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমকে, যিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেছেন। তিনি ইন্টিগ্রেটেড (সমন্বিত) সরবরাহ চেইন নিয়ে কথা বলেছেন, যা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এবং স্বপ্ন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক যে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন, সেগুলোর প্রতিও আমাদের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগী শব্দটি আমরা নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করি। এটাকে আমরা অনেক ক্ষেত্রে গালি হিসেবে দেখি। মিলার, সিন্ডিকেট নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করি। এতে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটা অস্পষ্টতার জন্ম দেয় এবং সেখানে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করেন। সুবিধাভোগীরা সুযোগ নিয়ে ফেলেন। আমরা যাদের মধ্যস্বত্বভোগী বলছি তারা পুরো সরবরাহ চেইনে সার্ভিস প্রভাইডার। তারা যদি না থাকত, তাহলে আমাদের ঘরে খাবার পৌঁছাত না। মূল সমস্যা অন্যত্র—অসংগঠিত বাজার ব্যবস্থা, চাঁদাবাজি ও অস্বচ্ছ প্রাইসিং। ড. মোয়াজ্জেম ও কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন একমত হয়েছেন যে ন্যায্য দাম না পাওয়াই মূল সংকট।

আমরা যখন ন্যায্যমূল্য নিয়ে কথা বলি তখন প্রায়ই ভোক্তাদের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু সেখানে কৃষকের স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে। আমরা কৃষকের ন্যায্যমূল্য বলি না। খাদ্যশস্য নিয়ে আলোচনায় আমাদের কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আমরা কৃষিপণ্য উৎপাদনও করি আবার আমদানিও করি। আমরা যদি উৎসে দেখি, অনেক সময় কৃষকরা ২ টাকাতেও তাদের পণ্য বিক্রি করেন, কখনো-বা রাস্তায় ফেলে দেন। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কিনা আরেকটা উদাহরণ দিতে পারি, একজন কৃষক ৫০ হাজার টাকায় গরু কেনেন এবং কোরবানির সময়

১ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। অনেকেই মনে করেন তিনি ৫০ হাজার টাকা লাভ করেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ৩০ হাজার টাকা গরুর খাবার ও অন্যান্য খরচে ব্যয় করেছেন। ফলে তার প্রকৃত লাভ মাত্র ২০ হাজার টাকা, যা আসলে তার শ্রমের পুঞ্জীভূত মূল্য—শুধু নগদ লাভ নয়।

আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, উৎস পর্যায়ে কৃষিপণ্য উৎপাদকরা খুব কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। উদাহরণস্বরূপ, উৎসে টমেটোচাষীরা মাত্র ২ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন, কিন্তু শহরে আমরা সেটি ১০০-২০০ টাকা কেজিতে কিনি।

আমরা পরীক্ষামূলকভাবে নাটোরে দুই হাজার টমেটোচাষীকে সংযুক্ত করে একটি প্রকল্প চালু করেছিলাম। তাদের বলেছিলাম, তারা যদি ২ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা পান, তাহলে তারা লাভবান হবেন। অন্যদিকে টমেটো কেচাপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ১০০ টাকার পরিবর্তে ৬০ টাকায় কিনতে পারে, তাহলে তাদেরও লাভ হবে। কিন্তু শর্ত ছিল, উৎপাদনকারীদের সুদের বোঝা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বহন করবে। ফলাফল—সব পক্ষই রাজি হয় এবং ১০০ শতাংশ ঋণ আদায় সম্ভব হয়।

আমরা রাজশাহীর আমচাষীদের সঙ্গেও একই রকম একটি প্রকল্প পরিচালনা করেছি। সাধারণত আমচাষীরা আম বিক্রির ১৮০ দিন পর পেমেন্ট পান। কিন্তু আমরা চাষীদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে নগদ অর্থ প্রদান করেছি এবং আম কিনে নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সুদসহ পরিশোধ করেছে।

আরেকটি সফল উদ্যোগ ছিল বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে আদা ও হলুদ চাষে বিনিয়োগ। সেখানে আমাদের শাখা কম থাকায় আমরা একটি এনজিওর মাধ্যমে কৃষকদের ঋণ প্রদান করি। এনজিওটি বিনিময়ে মাত্র ৫০ পয়সা কমিশন চেয়েছিল, কিন্তু পরে তারা এত ভালো উদ্যোগ দেখে ১ পয়সাও নেয়নি।

ফলাফল—আমরা ১০০ শতাংশ ঋণ আদায় করতে পেরেছি এবং প্রথম বছরেই এক লাখ টন আদা উৎপাদন হয়েছে, যা আমাদের মোট চাহিদার দশ ভাগের এক ভাগ। পরবর্তী ১০ বছর যদি আমরা এভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশকে আর আদা আমদানি করতে হবে না। বিশেষভাবে এটি টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত আদা ছিল, যার গুণগত মান ভারত ও চীনের আদার চেয়েও ভালো।

সবশেষে আমি বিশেষভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মানিত দুই নেতাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। মূল্য নিয়ন্ত্রণে ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ছাত্ররা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা প্রমাণ করেছেন, ছাত্রসমাজ চাইলে রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যায়। বাজার নিয়ন্ত্রণেও তারা ভূমিকা রাখতে পারেন। বরিশালে করোনাকালে, যখন তরমুজচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন, তখন তরুণদের উদ্যোগে একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়, যা প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির সুযোগ তৈরি করে।

আমরা বিশ্বাস করি, ইসলামী ব্যাংক ৬৮ হাজার গ্রামে (সরকারি হিসেবে ৮৭ হাজার) পৌঁছানোর মাধ্যমে এ সাপ্লাই চেইনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে। মাননীয় গভর্নর মহোদয়কে আমরা এরই মধ্যে জানিয়েছি, আমরা এ খাতকে ইনফ্লেশনের (মূল্যস্ফীতি) বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ: চেয়ারম্যান, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ

[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘‌খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]

আরও