আলোকপাত

বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে করণীয়

ব্যাংকের দিক থেকে ডিপোজিট হলো ব্যাংকের দায়। এ দায়ের কারণে ব্যাংকের খাতায় ডিপোজিটরদের অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হিসেবে দেখানো হয়। ব্যাংক স্টেটমেন্টে এটা দায়ের ঘরেই দেখানো হয়। এ দায় পূরণ হয় নগদ অর্থের জমা হিসেবে অথবা অন্য ব্যাংকের চেকের ফলে।

ডিপোজিট দিয়ে যাত্রা

ডিপোজিট ব্যাংকিংয়ের উৎপত্তি হয়েছিল রেনেসাঁর প্রাথমিক যুগে ইতালির কয়েকটি শহরে। সেই সময় মানুষজন যাদের ওপর আস্থা ছিল তাদের নিকট ধাতব মুদ্রা মজুদ রাখত নিরাপদে রাখার জন্য। এরা হতে পারেন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাংকারদের ধাতব মুদ্রার ওপর কোনো মালিকানা ছিল না। তারা ছিল মূল মালিকদের এজেন্ট। এ সেবা প্রদানের জন্য এজেন্টরা একটি ফি পেত। ধাতব মুদ্রার মালিকরা যেকোনো সময়ে তা ফেরত চাইতে পারত। পরবর্তীকালে এ প্রথা থেকে একটি ভিন্ন প্রথা গড়ে ওঠে। ধাতব মুদ্রার মালিকরা ব্যাংকারদের তৃতীয় ব্যক্তিকে এ অর্থ বা তার অংশবিশেষ পরিশোধের নির্দেশ দিতে পারত।

ব্যাংক ডিপোজিটের পরবর্তী বিবর্তনের ধাপের সূচনা হলো যখন ব্যাংকররা তাদের কাছে গচ্ছিত তহবিলের মালিকানা অর্জন করল এবং দায়বদ্ধ হলো মালিকের হুকুমে অর্থ ফেরত দিতে, যা ধাতব মুদ্রার মানসম্পন্ন ওজন ও মসৃণতার সমপর্যায়ের। এটা বোধগম্য ছিল যে ব্যাংকার সমুদয় ধাতব মুদ্রা তার নিজের কোষাগারে জমা রাখত, যাতে সে ডিপোজিটরের চাহিদানুযায়ী প্রদান করতে পারত। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ব্যাংকাররা বুঝতে পারল কোন দিবসে, সপ্তাহে অথবা মাসে ব্যাপকসংখ্যক ডিপোজিটরদের মধ্যে ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র অর্থের জন্য চাহিদা জ্ঞাপন করত। আরো মজার ব্যাপার হলো এভাবে টাকা উত্তোলন আরো বড় বা ছোট আকারে জমা হিসেবে পূরণ হয়ে যেত। ব্যাংকগুলো উপলব্ধি করল সমুদয় ধাতব মুদ্রা হাতে রাখার দরকার নেই। অভিজ্ঞতার আলোকে যুক্তিসংগতভাবে অধিক পরিমাণ ধাতব মুদ্রা হাতে রাখলেই চলবে। বাকি অর্থ ঋণ আকারে ভালো ঋণকারীদের ধার দেয়া যায়। এভাবে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত আয় করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, এ অতিরিক্ত আয় করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে সততা, বিচারক্ষমতা ও বিবেচনাবুদ্ধি প্রয়োগ করতে হতো। এভাবে মোট জমা ধাতব মুদ্রার পরিমাণ হস্তে মজুদকে ছাড়িয়ে যায়।

এ দুটি সংখ্যার মধ্যে ব্যবধান আরো বৃদ্ধি পায়, কারণ যারা ঋণ নিত তারা প্রায়ই ধাতব মুদ্রা ফেরত চাইত না, বরং ব্যাংকের ওপর তাদের পাওনাদারদের জন্য ড্রাফট ড্র করার অধিকার চাইত এবং তাদের কাছ থেকে চলতি সময়ে কিছু ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করত। এ অধিকার ব্যাংকের খাতায় ঋণকারীর অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হিসেবে প্রতিফলিত হতো। যদিও এর উৎস একটি ঋণ কার্যক্রম, এ ক্রেডিট কোনো ক্রমেই কাস্টমারদের জমাকৃত ধাতব মুদ্রার ক্রেডিট থেকে ভিন্নতর ছিল না। অনেক বছর ধরে এ রীতি প্রচলিত থাকার ফলে দেখা গেল ব্যাংকে ডিপোজিট কোনো ক্রমেই ধাতব মুদ্রার মূল পরিমাণে বজায় থাকল না। এগুলোর অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথমত, স্বর্ণ, রৌপ্য ও কাগুজে মুদ্রা; দ্বিতীয়ত, ডিপোজিটরের অ্যাকাউন্টে প্রবিষ্ট ক্রেডিট যখন ঋণের নেগোসিয়েশন হয়; তৃতীয়ত, যেসব চেক ডিপোজিটরের মালিকানায় এসেছে; এগুলোর বিরাট একটি অংশ সম্ভব হয়েছে অন্যান্য ব্যাংকের ঋণ প্রক্রিয়ার ফলে।

ব্যাংকের দিক থেকে ডিপোজিট হলো ব্যাংকের দায়। এ দায়ের কারণে ব্যাংকের খাতায় ডিপোজিটরদের অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হিসেবে দেখানো হয়। ব্যাংক স্টেটমেন্টে এটা দায়ের ঘরেই দেখানো হয়। এ দায় পূরণ হয় নগদ অর্থের জমা হিসেবে অথবা অন্য ব্যাংকের চেকের ফলে। যেহেতু একটি ব্যাংক নিজ হস্তে সমুদয় ডিপোজিটরের অর্থ মজুদ রাখতে বাধ্য হয় না, এ ধরনের ডিপোজিট থেকে বৃহত্তর ঋণ প্রদান করা সম্ভব হয় এবং এ থেকে অধিকতর আয় আসে।

ডিপোজিট দুই রকমের। টাইম ডিপোজিট ও ডিমান্ড ডিপোজিট। টাইম ডিপোজিট আইনানুযায়ী ওঠানো যায়, টাকা তোলার জন্য আগাম নোটিস প্রদান করার পর। ব্যক্তি ও করপোরেশনগুলোর অর্থের প্রয়োজন হয় না একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। যদি নির্দিষ্ট সময়ের আগে অথবা আগাম নোটিস ছাড়া এ অর্থ উত্তোলনের চুক্তি থাকে তাহলে এটা টাইম ডিপোজিটে পরিণত হয়। এ রকম ডিপোজিটের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে স্বল্প পরিমাণে রিজার্ভ রাখতে হয়। বাকি অর্থ সুবিধাজনকভাবে বিনিয়োগ করা যায়। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে টাইম ডিপোজিটের একটি অংশ সেভিংস ডিপোজিটের জন্য ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি হারে সুদ প্রদান করে। ব্যাংকের অবশ্য আইনি অধিকার থাকে সেভিংস ডিপোজিটরকে অর্থ প্রদান না করার। যেহেতু উত্তোলনের চাহিদা কম, ব্যাংকগুলো এ তহবিলের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ প্রদায়ী উচ্চ আয় লাভের জন্য খাটাতে পারে। অন্যদিকে ডিমান্ড ডিপোজিট ব্যবসায়িক জগতের তরল তহবিলের একটি বড় অংশ। ব্যক্তি ও করপোরেশনগুলো পকেট মানি ছাড়া তাদের নগদ অর্থ চেকিং অ্যাকাউন্টে (চলতি হিসাব) রাখতে চায়। অতিরিক্ত অর্থ এলে তা ব্যাংকে জমা রাখা হয়, এ ডিপোজিট ক্রেডিটের বিপরীতে চেক দিয়ে প্রয়োজনে অন্যদের অর্থ প্রদান করা হয়। ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় এগুলো বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম। ব্যাংকগুলোকে তাই দ্রুত ডিমান্ড ডিপোজিটের টার্নওভারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এর জন্য বড় আকারের রিজার্ভ রাখতে হয় এবং বাকি অর্থ এমন সম্পদে রাখতে হয় যাতে প্রয়োজনে বিলম্ব না করে একে নগদে পরিণত করা যায়। এভাবে ব্যাংক ক্লিয়ারিং হাউজের ভূমিকা পালন করে অথবা সমগ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বুককিপার হিসেবে কাজ করে। সেহেতু এর খরচ বেশি হয়। এসব কারণে ব্যাংক ডিমান্ড ডিপোজিটের ক্ষেত্রে নামমাত্র সুদ দেয়।

ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা আস্থার ভিত্তি তৈরি করে, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, কাস্টমারদের রক্ষা করে এবং প্রতিষ্ঠানকে জোচ্চুরি ও শোষণের হাত থেকে রক্ষা করে।

কেন ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা জরুরি

কাস্টমারের আস্থা বজায় রাখা: আর্থিক ব্যবস্থা চালিত হয় আস্থার মাধ্যমে। সৎ ও স্বচ্ছ তথ্যের আদান-প্রদান কাস্টমারদের তাদের ডিপোজিট সম্পর্কে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে।

আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে: নৈতিক দিকনির্দেশনা এবং দায়িত্বশীল ঋণ প্রদান বলগাহীন ঝুঁকি নিরোধ করে। এ ঝুঁকি নিরোধ করতে না পারলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়।

আর্থিক অপরাধ নিরোধ করে: কঠোর নৈতিকতা পালনের ফলে মানি লন্ডারিং, জাল-জুয়া চুরি এবং সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন বন্ধ করা সম্ভব হয়।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা: কাস্টমারদের তথ্য এবং তাদের অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য কঠোরভাবে গোপন রাখার মাধ্যমে পেশাগত সাধুতা রক্ষা হয়।

সমাজের জন্য সহায়ক: নৈতিকভাবে পরিচালিত ব্যাংকগুলো স্থানীয় প্রকল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং টেকসই পরিবেশ রক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করে। নৈতিকভাবে পরিচালিত ব্যাংকগুলো ক্ষতিকর শিল্পে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকে।

ব্যাংকিং নৈতিকতায় ইংরেজি সি অক্ষরটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যঞ্জনা বজায় রাখে। এর দ্বারা প্রকাশিত হয় ভিত্তিমূলক নীতিগুলো। ভিত্তিমূলক নীতিগুলো নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং চরিত্র মূল্যায়নে নির্দেশনা প্রদান করে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এগুলো বুঝিয়ে থাকে কীভাবে ব্যাংকের আচরণ করা উচিত অথবা ঐতিহ্যবাহী ঋণ পরিচালনায় পাঁচটি ‘ঈ’ দেখা হয় নৈতিক সরসি কাচের মাধ্যমে।

ব্যাংক পরিচালনায় নৈতিকতার চারটি সি

এ নীতিগুলো নির্দেশ করে কীভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের আস্থা রক্ষায় কাজ করবে।

কমপ্লায়েন্স: আর্থিক আইনের সমুদয় বিষয় অক্ষরে অক্ষরে পালন করা, ভোক্তা সুরক্ষার নিয়মগুলো মেনে চলা এবং মানি লন্ডারিংবিরোধী নিয়মকানুন অনুসরণ করা।

গোপনীয়তা: ক্লায়েন্টদের সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষা করা এবং আর্থিক তথ্যের রেকর্ড বেআইনি অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা করা।

স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা: ব্যক্তিগত লাভালাভের সঙ্গে নীতিনিষ্ঠ পেশাগত বিচারের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে ব্যক্তিগত লাভালাভকে বিবেচনায় বিন্দুমাত্র স্থান না দেয়া।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি: ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সর্বত্র এমন একটি করপোরেট পরিবেশ সৃষ্টি করা, যার ফলে নিষ্ঠা, সততা ও কাস্টমারের প্রতি ন্যায্য আচরণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্ধভাবে লাভ করার প্রবণতা দূর হয়।

ঋণের পাঁচটি ‘সি’

যখন ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের মূল্যায়ন করবে, তখন ঐতিহ্যবাহী পাঁচটি ‘সি’ প্রয়োগ করে ন্যায্য ঋণদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আগ্রাসী অথবা লাগামহীন আচরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

চরিত্র: ঋণগ্রহীতার সততা, নির্ভরযোগ্যতা ও অতীতে আর্থিক দায় ন্যায্যতার সঙ্গে পরিপূরণের ইতিহাস মূল্যায়ন করা।

সক্ষমতা: ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নৈতিকভাবে মূল্যায়ন করা, যাতে ঋণগ্রহীতা আগ্রাসী ঋণের বন্ধনে আবদ্ধ না হন।

পুঁজি: নিশ্চিত করা যে ঋণগ্রহীতার ঋণের এ ঝুঁকি বহন করার মতো যথেষ্ট নিজস্ব মূলধন রয়েছে, যাতে পারস্পরিক ঝুঁকির ভারসাম্য বজায় থাকে এবং লাগামহীন ফাটকাবাজি প্রতিহত হয়।

শর্তাবলি: সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে ঋণের শর্তগুলো যেন সমসাময়িক অর্থনৈতিক দুরবস্থার সুযোগ গ্রহণ না করে।

জামানত: ঋণগ্রহীতা ঋণ নেয়ার সময় যে বন্ধক দেন, তার মূল্য স্ফীত করে অথবা সংকুচিত করে দেখা যাবে না। এ রকম করা হলে ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি হলে বিপদে পড়তে পারেন।

সি. জে কাওটন ২০২১ সালের ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বেলজিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইন্যান্সিং এসএমই: দ্য ইউরোপিয়ান অ্যাপ্রোচ শীর্ষক সম্মেলনে এথিকস ইন ফাইন্যান্স প্রসঙ্গে উপস্থাপিত বক্তব্যে বলেছেন, আধুনিক পুঁজিবাদে অর্থায়নের বেশির ভাগই পরিবার, গোষ্ঠী, গোত্র এবং এমনকি জাতির বন্ধন থেকে মুক্ত। আর্থিক বাজার ও প্রতিষ্ঠান পরিপক্ব পুঁজিবাদের হৃৎপিণ্ড। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থায়নের প্রক্রিয়া হলো বিরামহীনভাবে ভালো লাভের জন্য অনুসন্ধান করে বেড়ানো। অবশ্য এ অনুসন্ধানে যথাযোগ্য পরিমাণে ঝুঁকি রয়েছে। অর্থায়ন এখন আমাদের কর্মকাণ্ড কীভাবে সংঘটিত করব, তার মূলে স্থান নিয়েছে।

আর্থিক বাজার ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ হলো অর্থায়নের চত্বরটি বেশ প্রশস্ত এবং এতে বিভিন্ন ধারা রয়েছে। প্রতি বছর আর্থিক হাতিয়ার ও আর্থিক কারকতায় নতুন নতুন উদ্ভাবন হচ্ছে। ফলে আর্থিক ব্যবস্থা জটিল হয়ে উঠেছে। তবে ব্যাংকের ঋণ-অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আর্থিক সেতুবন্ধ সৃষ্টি করা ব্যাংকের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এতে প্রয়োজন ডিপোজিটরদের। তাদের দিয়েই পুরো প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। ডিপোজিটররা নানা ধরনের অরক্ষিত অবস্থার মধ্যে পড়ে। ব্যাংকে নৈতিকতার বিষয়টি আস্থার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে। ডিপোজিটররা শুধু ব্যাংকের কারিগরি সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়, তারা এর নৈতিক সততার ওপরও নির্ভরশীল।

পেশাদার ব্যাংকাররা জানেন, আস্থা সৃষ্টি করতে সততার কোনো বিকল্প নেই। শুরুর যুগ থেকে ব্যাংকিং এমন এক ধরনের ব্যবসা হিসেবে গড়ে উঠেছে, যেখানে পারস্পরিক আস্থা এবং ব্যক্তিগত সততা প্রাধান্য পেয়েছে। যদিও ব্যক্তিগত সততা একটি ইস্যু, ডিপোজিটরের জন্য তাদের সংযোগকারী ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণাবলি যথেষ্ট নয়। মানুষ যখন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে টাকা ধার দেয়, তখন সে একজন ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখে। কিন্তু যখন সে ব্যাংকে টাকা জমা দেয় তখন সে একটি প্রতিষ্ঠানকে আস্থায় নেয়। ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে আস্থার স্থানান্তর আসলে আধুনিকতার একটি লক্ষণ। তবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার কথা বলতে গিয়ে ব্যক্তি-ব্যাংকারের গুণাবলিকেও খাটো করে দেখা যায় না। আমরা যখন ‘ব্যাংক অন’ বাগধারাটি ব্যবহার করি, তখন আমরা বুঝিয়ে থাকি ‘বিশ্বাস করা যায়’।

ব্যাংকগুলো আস্থার এ দাবি পূরণ করতে গিয়ে কোড অব ব্যাংকিং তৈরি করেছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে। স্বনিয়ন্ত্রণের একটি ভূমিকা আছে, তবে আধুনিক আর্থিক জগতে বহিঃস্থ নিয়ন্ত্রণ প্রাধান্য বিস্তার করেছে। নিয়ন্ত্রণকারীরা ব্যাংকগুলোর আচরণ সম্পর্কে ব্যবস্থাপত্র দেন এবং যেসব আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় সেগুলো নিষিদ্ধ করেন। ফলে ডিপোজিটররা অনেকটুকু নিরাপদ হয়ে ওঠে। কখনো কখনো নৈতিকতা এবং নিয়ন্ত্রণ একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে নৈতিকতার অভাবের ক্ষেত্রে যখন নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়। এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে যখন কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। অবশ্য পেশাগত নৈতিকতা ও স্বনিয়ন্ত্রণ একদিকে এবং অন্যদিকে বহিঃস্থ নিয়ন্ত্রণ অনেক জটিলতার জন্ম দেয়। জটিল ব্যবসার ক্ষেত্রে যেখানে পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত দ্রুত এবং দুষ্ট কাজে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ ব্যাপক, সেসব ক্ষেত্রে বিস্তারিত নিয়মকানুন প্রণয়ন অত্যন্ত কঠিন। বস্তুত নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাপনা শেষ বিচারে আত্মপরাজয় ডেকে আনতে পারে। ব্যাংক ও কাস্টমারের মধ্যে সম্পর্ক যখন প্রধানত আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তখন এর কার্যকরতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এর ব্যবসা সততা, বাজার আচরণের যথাযথ মান বজায় রাখা, কাস্টমারদের স্বার্থের প্রতি প্রয়োজনীয় সম্মান পোষণ করা এবং তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করা, তাদের স্পষ্ট, ন্যায্য ও বিভ্রান্তিমুক্ত তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ নীতিগুলো একগুচ্ছ নিয়মকানুন, নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা দ্বারা সমর্থিত অথবা আংশিকভাবে বর্ণিত হয়। এ অর্থে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকে এমন পরামর্শ আসে যে কোড অব এথিকস হবে সাধারণ নীতিমালা এবং অধিকতর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার মিশ্রণ।

বিস্তারিত নিয়মকানুনের পরিবর্তে নীতির ওপর জোর দেয়ার অর্থ হচ্ছে আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোরভাবে ব্যাংকিং শিল্পে সততা বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে আরো গভীরভাবে চিন্তা করা। প্রতিটি ব্যাংক চিন্তা করে বের করবে তাদের প্রেক্ষাপটে সততা বলতে কী বোঝায়। অবশ্য এর জন্য লিখিত কোনো নির্দেশনা থাকে না। একটি ফার্ম অথবা ব্যক্তি অধিকতর সম্ভাবনার সঙ্গে সঠিক পথটি খুঁজে বের করতে পারবে, যদি তাদের নিয়ন্ত্রণের নিচে কী নীতি কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা থাকে। এভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়ে উঠতে পারে একটি নৈতিকতার সংস্কৃতি বিকাশ ও সমর্থনের উপায়, নিছক তার বিকল্প নয়। উদ্দেশ্য হলো অর্থায়নে নৈতিকতা নিশ্চিত করা, এর চারদিকে ঘুরে বেড়ানো নয়।

দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ঋণ দেয়া

যেসব মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা ব্যাংকের দায়িত্ব। ব্যাংকের আরো দায়িত্ব হলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তহবিল ধার দেয়া। এক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কীভাবে আদায় ও আয় উঠে আসবে সে ব্যাপারগুলো। এক্ষেত্রে ডিপোজিটরদের স্বার্থ মোটা দাগে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যুক্তি হিসেবে বলা যায়, ব্যাংকের আরো অনেক দায় আছে; এ দায় ডিপোজিটর ও শেয়ারহোল্ডার ছাড়া অংশীজনদের কাছে। বৃহত্তর এ দায়বোধকে বলা হয় দায়িত্বশীলতা। একজন কী কাজ করল বা করল না তার জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার জবাবদিহিতা থাকতে হবে। দায়িত্বশীলতার প্রকৃতি এবং এর গুরুত্ব সময়ের প্রবাহে পরিবর্তন হয়। ব্যাংক যে রকম দায়িত্বশীলতার মুখোমুখি হয়, প্রায় একই ধরনের দায়িত্বশীলতা দেখা দেয় বৃহৎ বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এদের ভালো নিয়োগকারী, দ্রুত ঋণ পরিশোধকারী অথবা ন্যায্য প্রতিযোগী হতে হয়। যাই হোক ব্যাংকের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কালে কিছু ইস্যু আলোচনায় এসেছে। যেমন ব্রাঞ্চ বন্ধ করে দেয়া এবং আর্থিক বাধাদান, যা ব্যাংকিং সেবা থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি সৃষ্টি করে।

ঋণ দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে ঐতিহ্যবাহীভাবে ঝুঁকি এবং আয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পেতে হয়। কিন্তু বৃহত্তর অর্থে দায়িত্বশীল ঋণদান আরো কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখার কাজ।

প্রথমত, ব্যাংকের দায়িত্ব হলো সমাজের কোনো গোষ্ঠীকে তার সেবা থেকে বাদ না দেয়া। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হলো ন্যায্যভাবে ঋণ বিতরণ করা। সমস্যার সৃষ্টি হয় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়ে। অনেক সময় এ নীতি অহেতুক বাধা সৃষ্টিকারী। ফলে সমাজের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বিরূপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা ঋণবঞ্চিত হয়, অথবা তাদের জন্য অসুবিধাজনক শর্তের কারণে তারা ঋণ নিতে পারে না। ফলে তারা সমাজজীবনে কাঙ্ক্ষিতভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না, অথবা তারা বাধ্য হয় লোন শার্কসদের (মহাজন) মুখাপেক্ষী হতে। বাদ দেয়া অথবা অসুবিধাজনক অবস্থায় থাকা গোষ্ঠীগুলোকে আমরা নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। যেমন আয়ের ভিত্তিতে (দারিদ্র্য) অথবা ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে।

কিছুসংখ্যক সংস্থা— যেমন এসএমই, স্টার্টআপরা সমস্যায় পড়ে। তারা ভৌগোলিকভাবে এমন এলাকায় কাজ করে যেখানে ব্যাংকগুলো যেতে চায় না, অথবা সেখানকার ব্যাংকগুলো বেঠিক ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয়।

দ্বিতীয়ত, ঋণ দেয়ার পর ব্যাংকের দায়িত্বশীলতার মধ্যে দ্রুততার সঙ্গে সম্পত্তি দখল অন্তর্ভুক্ত নয়। যদিও ঋণ পরিশোধের দাবি সমর্থন করা যায় নৈতিকভাবেই ডিপোজিটরদের তহবিল রক্ষা করার জন্য এবং শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজি রক্ষা করার জন্য। তবে ব্যাংকগুলোকে এদের অবস্থান রক্ষায় অত্যুৎসাহী না হওয়াই শ্রেয়। অন্য কথায় বলা যায় ব্যাংক ঋণদান করা থেকে সরে আসবে অংশীজনদের ওপর পরিণতি বিবেচনা করে। এ সরে আসার সময় ও চরিত্র এসএমই সেক্টরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বস্তুত এটা এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিষয়টি কেবল একটি ফার্মকে কেন্দ্র করে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে সরবরাহকারী এবং কাস্টমাররা, এর কর্মচারীরা এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক যোগাযোগ। এ কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া ব্যাপক হতে পারে।

তৃতীয়ত, অনেক বিরাট পরিমাণে ঋণ দেয়া যেমন বড় সমস্যা, তেমনি খুব কম ঋণ দেয়াও বড় সমস্যা। উভয়টির মধ্যেই নৈতিকতার প্রশ্ন আছে। বেশি করে ঋণ দিলে বিষয়সম্পত্তি দখল করার সম্ভাবনা বড় হয়ে দাঁড়ায়। যা-ই হোক এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করা যৌক্তিক। কারণ বিষয়সম্পত্তি দখলে নেয়ায় ব্যাংকের প্রয়াস কার্যত ঋণ দেয়ার প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত নাও হতে পারে। ঋণগ্রহণকারীদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং এটা তাদের প্রধান দায়িত্ব তারা কী পরিমাণ ঋণ নেবে। একই দায়িত্ব ব্যাংকেরও, কীভাবে ঋণ গ্রহণ উৎসাহিত করা হবে এবং কীভাবে তারা তাদের দক্ষতা ঋণ অনুমোদনে ব্যবহার করবে। এছাড়া মনে রাখতে হবে কোনো নির্দিষ্ট পার্টি অথবা প্রজেক্টকে বড় আকারে অর্থায়ন করার ফলে অন্য অংশীজনরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া ইদানীং ব্যাংকগুলোকে সাবধান করা হচ্ছে তাদের অর্থায়নের পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে। (পর্ব-১)

[২৩তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায়]

ড. মাহবুব উল্লাহ্: জাতীয় অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আরও