সে নিরিখে নারীই পরিবারের ‘অদৃশ্য চালিকাশক্তি’। প্রাতিষ্ঠানিক তো বটেই, আর্থিকভাবে মূল্যায়নহীন কাজগুলো করার দায়ও নারীর ওপর বর্তায়। আমরা যখনই নারীর অধিকারের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করি, তখন পরিবার, সমাজ ও সর্বোপরি রাষ্ট্রের আলোচনা ধারাবাহিকভাবে না করলে হয় না। কর্মজীবী হোক বা গৃহস্থালি, যেকোনো পরিবারে এখন নারীই বড় অর্থ জোগানদাতা। অন্তত যদি নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্যায়ন করা যেত তাহলে এ কথা স্পষ্টভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতো। কিন্তু স্বাধীনতার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৫৬ বছর। নারীকে যেন এখনো আমরা অধিকারসম্পন্ন মানুষ বলে দেখতে পারছি না। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর ভূমিকা সেবাদানকারী হিসেবেই।
পরিবার ও সমাজে নারী মূলত মাল্টিটাস্কিং করে থাকে। সমাজ নারীর ঘরের কাজকে ওই অর্থে ‘কাজ’ মনে করে না। নারীর কাজের যদি আর্থিক মূল্যায়ন করা হতো, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। নারীর প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমকে যথাযথ মূল্যায়ন করা গেলে নারীর গুরুত্ব আরো স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো। কর্মজীবী হোক বা গৃহিণী, নারীরা কর্মক্ষেত্র এবং পরিবারের মধ্যে যে ভারসাম্য রক্ষা করেন, তা অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। এগুলোকেই আমরা মাল্টিটাস্কিং বলে অভিহিত করছি। নারীকে সবক্ষেত্রে শুধু গুরুত্ব দিলেই হবে না। তাকে আইনি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেশি দিতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুবিচার না পাওয়ার বিষয়টি বেশি দায়ী।
নারীর নিরাপত্তাহীনতা অনেকাংশে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত নয়। দেখা গেছে, যারা নারীর অধিকার বিষয়ে সোচ্চার তাদের অনেকে নানাভাবে নারীর ওপর নিপীড়ন চালান। বেসরকারি নানা সংস্থায় নারী নিজ যোগ্যতাবলে কাজ পেলেও অনেক ক্ষেত্রেই তাকে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাবের সম্মুখীন হতে হয়। নারীকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নেতিবাচক ধারণা কর্মস্থলে গুজবে রূপ নেয়। এ গুজবও নারীর অগ্রগতির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত নারীর পদোন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনো নারীকে অসহায় ভেবে তার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেন কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা—এ অভিযোগ নতুন নয়। দেশে বেকারত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বড় সমস্যা। যেকোনো উপায়ে মানুষ একটা চাকরি আদায় করতে চান। তা করতে গিয়ে অনেক সময় ঘুস-তদবির করতে হয়। নারীর ক্ষেত্রে সমস্যাটা ভিন্ন। অনেক সময় তাকে কুপ্রস্তাবের মুখোমুখি হতে হয়। শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, অনেক জায়গাতেই নারীকে অপ্রীতিকর, অশোভন মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। তাই অনেক নারী সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে যুক্ত হওয়ার সাহস পান না। এত সংকটের মধ্যে ক’জনের পক্ষে সম্ভব নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা? শহরে নারী কর্মীর সংখ্যা আমলে নিয়ে সারা দেশে নারীর কর্মসংস্থানের তুলনা করতে গেলে আমরা কিছুটা ভুল ধারণা পেতে পারি। নারীর সুযোগ-সুবিধা যে বেড়েছে এর সত্যতা অবশ্য আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু সার্বিকভাবে নারীর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা পুরোপুরি দূর হয়নি। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও নারী প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, এ অভিযোগও আছে। নিয়োগদাতা সংস্থায় যে নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তি নেই এমনটি নয়। কিন্তু এমন ব্যক্তির সংখ্যাও কম। সমস্যা হলো দেশে যোগ্য নারী শিক্ষার্থীর তুলনায় যোগ্য কর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছি। তার পরও কিছুসংখ্যক নারী নিজ যোগ্যতাবলে কর্মসংস্থান গড়ে তুলছেন।
নারীর কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তাদের মানসিক ভাবনাগত সংকটও রয়েছে। এখনো অনেক নারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও চাকরির ক্ষেত্র সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেন না। তার নিজস্ব দক্ষতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে কেমন চাকরি তিনি পেতে পারেন এ বিষয়ে কোনো ধারণা অর্জন করেন না। যেহেতু তিনি চাকরির বাজার সম্পর্কে অবহিত নন সেহেতু এক পর্যায়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। আত্মবিশ্বাসহীনতার কারণে অনেক নারী তার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে বিয়ে করে ফেলেন। এভাবেই অনেক নারী উচ্চশিক্ষা নেয়ার পরও স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। এমন অনেক পরিবার রয়েছে যেসব পরিবারে নারীকে উচ্চতর শিক্ষা নিতে পাঠানো হয় যাতে তার ভালো একটি বিয়ের সম্বন্ধ আসে। এছাড়া নারীর নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও অনেক ক্ষেত্রে তাদের দমিয়ে দেয়। এসবই সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর নিজের সৃষ্ট সংকট। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সুযোগ একটি বড় বিষয়। পুরুষ-নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই চাকরির ক্ষেত্র ও সুযোগের বিষয়টিকে আমলে নিয়ে কাজ খুঁজতে হয়। কিন্তু দেশের নারী এখনো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতন হয়ে উঠেছেন এমনটি বলা যাবে না।
নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করার মানে এই নয়, পুরুষকে পিছিয়ে পড়তে হবে। বরং নারীর দক্ষতা ও যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তার মেধার মূল্যায়নের ওপর জোর বাড়াতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে বিভিন্ন সময়ে বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়ার মাধ্যমেই আমরা ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে এগোতে পারি। দক্ষ জনসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্য পূরণে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গোটা বিশ্বেই ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। আমাদেরও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। নারীকে নিপীড়ন করার সুপ্ত যে প্রবণতা এখনো অনেকের মধ্যে রয়েছে তা সামাজিক নানা প্রভাবেই হয়ে থাকে। পশ্চাৎপদ চিন্তার মানুষদের এ থেকে বের করে আনতে হবে। নারীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রচলিত আইনের বাস্তবায়ন সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে নারীর প্রতি অবজ্ঞা কিংবা অবমূল্যায়নের অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসবে সমাজ।
সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব—এ কথা অনস্বীকার্য। একটি সভ্য সমাজের অগ্রগতির অন্যতম সূচক হলো নারীর স্বাধীন ও নিরাপদ চলাচল। যে সমাজে মেয়েরা নির্ভয়ে স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র, বাজার কিংবা বিনোদনস্থলে যেতে পারে না, সেই সমাজ কখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু নারীর নিরাপদ চলাচলের প্রশ্নে এখনো নানা শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এজন্য নারীর জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা। প্রতিদিন গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা অনলাইন প্লাটফর্মে নারীরা হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না সামাজিক লজ্জা, ভয় বা বিচারহীনতার আশঙ্কায়। আইন থাকলেও তার প্রয়োগে ঘাটতি, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ফলে নারীরা আত্মবিশ্বাস হারান, পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন থাকে আর সমাজে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন রয়েছে, যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিশেষ সেল গঠন করেছে। এ আইনগুলো যুগোপযোগী নিঃসন্দেহে। আমি মনে করি, আমাদের আইনগুলো যথেষ্ট ভালো। কিন্তু আইনের প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচার অবকাঠামো যদি উন্নত না হয় তাহলে অপরাধ কমবে না। দেখা যায়, কোনো নারী নির্যাতিত হলে সঠিক সময়ে বিচার পান না। তাছাড়া দেশে নারী নির্যাতনকেন্দ্রিক আদালতের এজলাসও টেকসই নয়। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিশেষ আদালত আছে। কিন্তু এ আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নেই। এমনকি আমরা আইনজীবীরাও সেখানে গেলে নানা ভোগান্তির শিকার হই। অভিযুক্ত, বিবাদী, বিচারক, আইনজীবী—কারো জন্যই আলাদা জায়গা নেই। এজলাসের আয়োজন ছোট। তাছাড়া এখানে প্রতিনিয়ত এত অভিযোগ আসে এবং পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে তার দ্রুত নিষ্পত্তি ঘটে না। তাই অনেকে চাইলেও ভোগান্তির কথা চিন্তা করে বিচার চাইতে পারেন না। এজন্য কাঠামোর আমূল পরিবর্তন জরুরি। পরিবর্তন আনতে না পারলে নারীর ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে আলোচনাই হবে শুধু, প্রতিবিধান মিলবে না।
নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন, সামাজিক প্রতিবন্ধকতাগুলো আইনের কঠোর প্রয়োগ করার মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে হবে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ কমিটি থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সিসিটিভি, অভ্যন্তরীণ অভিযোগ সেল এবং হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। অনলাইন নিরাপত্তাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ভুয়া ছবি ছড়ানো কিংবা ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা বাড়ছে। সাইবার অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। নারীকে ভোগের বস্তু নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থলে, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ সমাজ সৃষ্টি সম্ভব। শুধু আইন নয়, সামাজিক প্রতিরোধও হতে হবে শক্তিশালী। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, নারীরা যদি নিজেরা সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিরোধী হয়ে ওঠেন, তবে নিরাপত্তাবেষ্টনী আরো শক্তিশালী হয়। সচেতনতা ও আত্মরক্ষার মানসিকতা অনেক অপরাধের আগেই ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে। নারীর সচেতনতা ও প্রতিরোধী মানসিকতার কথা বলতে গিয়ে যেন দায়িত্বের বোঝা কেবল নারীর কাঁধে না পড়ে। নিরাপত্তাহীনতার দায় কখনই ভুক্তভোগীর নয়। রাষ্ট্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকবে। নারীর আত্মসচেতনতা এ দায়িত্বকে সম্পূরক করবে, প্রতিস্থাপন নয়। আসলে নিরাপদ সমাজ গঠনে দ্বিমুখী প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একদিকে শক্তিশালী আইন ও সামাজিক জবাবদিহিতা, অন্যদিকে নারীর আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও প্রতিরোধী মানসিকতা। নারীরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, তবে নিরাপত্তা কেবল একটি দাবি নয়, বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
এলিনা খান: আইনজীবী এবং চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন