গত জুনে জাতীয় বাজেট ও অর্থবিল ২০২৬ উপস্থাপনের সময় এ দেশের কর ব্যবস্থায় একটি আশাব্যঞ্জক দিক লক্ষ করা গিয়েছিল—সরকার ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ও করপোরেট করের একটি ভবিষ্যৎমুখী বা প্রক্ষেপণযোগ্য রূপরেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী কর কাঠামোয় এক ধরনের পূর্বাভাসযোগ্যতা তৈরির প্রয়াস প্রশংসিতও হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়েই একটি দৈনিকে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছিলাম যে এ দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক দর্শনকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দিচ্ছে বাজেটের অন্যান্য বিধানে পেছনের সময় থেকে কার্যকর হওয়া ‘ভূতাপেক্ষ’ পরিবর্তনের সংস্কৃতি।
আশা ছিল, অর্থ আইন পাস হওয়ার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের বার্ষিক আয়কর পরিপত্রের মাধ্যমে এ অসংগতি দূর করবে এবং করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু সম্প্রতি এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২৭’ পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে এ আশা বাস্তবায়ন হয়নি। পরিপত্রে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে—আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী ১৬৩(১১) উপধারায় থাকা উৎসে করের চূড়ান্ত করদায়-এর সুরক্ষাবলয় ভেঙে যেগুলোকে ‘অগ্রিম আয়কর’ (এআইটি) করা হয়েছে, তা বিগত পুরো আয়বছরের (২০২৫-২৬) লেনদেনের ওপর ভূতাপেক্ষভাবেই কার্যকর হবে।
এই একটি সিদ্ধান্তের কারণে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়েছে, তা বুঝতে বাস্তবধর্মী একটি দৃশ্যপট বিবেচনা করা যাক।
একটি বাস্তব গল্প: সততার চড়া মূল্য
ধরা যাক একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী রফিকের কথা। ঢাকায় পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৫ শতাংশ জমি তিনি ২০২৫ সালের শেষভাগে বিক্রি করেন। উদ্দেশ্য, সন্তানের উচ্চ শিক্ষা ব্যয় মেটানো এবং অসুস্থ স্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় মেটানো।
আমাদের দেশে জমি কেনাবেচায় সরকারি মৌজা দর ও প্রকৃত বাজারদরের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক থাকা এবং রেজিস্ট্রির সময় কম মূল্য দেখিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থের বিস্তার ঘটানো এক পুরনো ব্যাধি। কিন্তু রফিক সাহেব সিদ্ধান্ত নেন, তিনি কোনো লুকোচুরি করবেন না। সরকারের স্বচ্ছতার নীতিতে আস্থা রেখে তিনি দলিলের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রকৃত লেনদেন মূল্য—ধরা যাক ৪ কোটি টাকা—ঘোষণা করলেন।
তৎকালীন বলবৎ আয়কর আইন ২০২৩-এর ১২৫ ধারা এবং তৎকালীন ১৬৩(১১) ধারা অনুযায়ী বিধান ছিল সুস্পষ্ট: স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে জমি বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রির সময় উৎসে কর্তিত বা সংগৃহীত কর হবে তার জন্য ‘চূড়ান্ত করদায়’। অর্থাৎ রেজিস্ট্রির সময় নির্ধারিত হারে (৫ শতাংশ অথবা কাঠা প্রতি ৩ লাখ যাহা অধিক সেই হিসাবে ২০ লাখ টাকা) কর পরিশোধ করার পর ওই জমি বিক্রির মূলধনি মুনাফার ওপর করদাতার আর কোনো অতিরিক্ত করদায় থাকবে না।
রফিক সাহেব হাসিমুখে ২০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করলেন। পুরো লেনদেনটি তখন আইন মেনে, কর পরিশোধ করে শতভাগ স্বচ্ছ ও বৈধভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।
আকস্মিক নীতি বদল ও নির্মম বাস্তবতা: সমস্যা শুরু হলো ২০২৬ সালের জুনে অর্থ আইন পাসের মাধ্যমে, যা সম্প্রতি এনবিআরের পরিপত্রে সিলমোহর দেয়া হয়েছে। অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইনের ধারা ১৬৩ সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করে আগের ১৬৩(১১) উপধারার ‘চূড়ান্ত কর’ ধারণাটি প্রায় সব খাতের জন্য বিলুপ্ত করা হয়েছে। জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় কর্তিত এ করকে এখন বিবেচনা করা হচ্ছে সাধারণ ‘অগ্রিম আয়কর’ (এআইটি) হিসেবে এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো এনবিআরের পরিপত্র অনুযায়ী এটি কার্যকর করা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে সংঘটিত সব লেনদেনের ওপর (ভূতাপেক্ষভাবে)!
এখন আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে যখন রফিক সাহেব তার ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্ন দাখিল করতে যাবেন, তখন তার হিসাবের খাতা কী দাঁড়াচ্ছে?
১। জমিটির তৎকালীন ক্রয় বা অধিগ্রহণ মূল্য যদি শূন্য টাকাও হয়ে থাকে, যেহেতু পৈতৃক সূত্রে কর আইন ২০২৩-এর পূর্বে প্রাপ্ত ও আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত ছিল, তবে তার মূলধনি মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি টাকা।
২। আগে এটি চূড়ান্ত করের আওতাভুক্ত থাকায় এর ওপর আর কোনো হিসাব করতে হতো না। কিন্তু এখন যেহেতু জমি হস্তান্তরের করটি কেবল ‘অগ্রিম কর’, তাই রিটার্নে এ ৪ কোটি টাকা মূলধনি আয় হিসেবে প্রদর্শিত হবে এবং তার ওপর প্রযোজ্য হারে (ধরা যাক ১৫ শতাংশ) নিয়মিত কর নিরূপণ করা হবে।
৩। ৪ কোটি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ লাখ টাকা।
৪। রফিক সাহেব রেজিস্ট্রির সময় অগ্রিম কর হিসেবে জমা দিয়েছেন ২০ লাখ টাকা।
৫। ফলে রিটার্ন জমার সময় তাকে এখন নতুন করে আরো ৪০ লাখ টাকা কর পরিশোধ করতে হবে! শুধু তা-ই নয়, মূলধনি মুনাফা যুক্ত হয়ে তার মোট নিট পরিসম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরো ৬-৯ লাখ টাকার অতিরিক্ত ‘সারচার্জ’।
হিসাব শেষ করার পর রফিক সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। যে ৪ কোটি টাকা তিনি পেয়েছিলেন, তার অধিকাংশ টাকা তিনি গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই পরিবারের কাজে ব্যয় করে ফেলেছেন এবং বাকি ১ কোটি টাকা ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে জমা রেখেছেন যাতে সুদ দিয়ে সংসারের অবশিষ্ট ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন। এখন আয়বছর শেষ হয়ে যাওয়ার পর, আইন পেছনের তারিখ থেকে বদলানোর কারণে তিনি হঠাৎ করে অতিরিক্ত ৪০-৪৮ লাখ টাকার নগদ তারল্য কোথা থেকে জোগাড় করবেন?
সততার শাস্তি, অনিয়মের পুরস্কার?
এ সিদ্ধান্তের ফলে নীতিগতভাবে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হয়েছে, তা হলো সততা ও স্বচ্ছতাকে সরাসরি শাস্তি দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি চালাকি করে ৪ কোটি টাকার জমির দলিল মৌজা রেটে ১ কোটি টাকা দেখিয়েছে, সে রেজিস্ট্রির সময় কর ফাঁকি দিয়েছে এবং এখন ভূতাপেক্ষ অগ্রিম করের নিয়মেও তার দৃশ্যমান মূলধনি মুনাফা কম থাকায় তাকে বড় কোনো বাড়তি করের মুখে পড়তে হচ্ছে না। বিপরীতে যিনি রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে শতভাগ প্রকৃত লেনদেন মূল্য দেখালেন, আইন পরিবর্তনের খড়্গ নেমে এল তারই ঘাড়ে। এটি কি অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা উৎসাহিত করবে, নাকি মানুষকে আবারো কালো টাকার নিরাপদ চাদরে আশ্রয় নিতে বাধ্য করবে?
করনীতির মৌলিক দর্শনের পরিপন্থী: অ্যাডাম স্মিথের করনীতির সর্বজনীন মূলনীতিগুলোর একটি হলো ‘নিশ্চয়তা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা’। করদাতার অধিকার হলো কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মুহূর্তে তিনি নিশ্চিতভাবে জানবেন ওই লেনদেনে তার করদায় কত। পেছনের তারিখ থেকে নতুন শর্ত বা করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া যেকোনো আধুনিক সভ্য কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এবং নাগরিকের রাষ্ট্রীয় আস্থাকে সমূলে বিনষ্ট করে।
যে করদাতা একটি আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সম্পত্তি বিক্রি করলেন এবং কর পরিশোধ করলেন, খেলা শেষ হওয়ার পর গোলপোস্ট বদলে দিয়ে তাকে বলা হচ্ছে—‘আপনার খেলা বৈধ হয়নি, আরো গোল (টাকা) দিতে হবে।’ এ ধরনের নীতি কর প্রশাসন ও করদাতার মধ্যকার বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
নীতিনির্ধারকদের আশু করণীয়: সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির তাগিদ অনস্বীকার্য। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু সেই রাজস্ব আদায় হতে হবে সুনির্দিষ্ট, ন্যায়সংগত এবং ভবিষ্যৎমুখী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে; নাগরিকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নয়।
এনবিআরের উচিত পরিস্থিতিটির গভীরতা উপলব্ধি করা। জমি হস্তান্তর থেকে শুরু করে ধারা ১৬৩-এর অধীনে যেসব খাতকে চূড়ান্ত কর থেকে অগ্রিম করে রূপান্তর করা হয়েছে, পরিপত্রের সেই ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনা করে একটি স্পষ্ট এসআরও জারি করা অত্যন্ত জরুরি। সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে:
১৬৩ ধারার অধীন চূড়ান্ত কর থেকে অগ্রিম করে রূপান্তরের এ বিধানাবলি কেবল ২০২৬ সালের ১ জুলাই বা অর্থ আইন কার্যকর হওয়ার পরবর্তী তারিখ থেকে সম্পাদিত লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর পূর্বে বিদ্যমান বিধান মেনে সম্পন্ন হওয়া লেনদেনের ওপর কর্তিত করকে ‘চূড়ান্ত করদায়’ হিসেবেই গ্রহণ করা হবে।
যেহেতু চূড়ান্ত কর আইন ব্যবস্থা কর আইনের মূল নীতির পরিপন্থী, সেক্ষেত্রে কিছু বছর করহার ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তার কিছু বছর পর ১০ শতাংশ এবং ধীরে ধীরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হলে করদাতাদের করভার কম হতো। উল্লেখ্য যে অর্থ আইন ২৬-এর মাধ্যমে স্বর্ণ বিক্রয় হতে মূলধনি লাভের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর ব্যবস্থার সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন তা করদাতাকে ভীতি ও অনিশ্চয়তায় না ফেলে ন্যায্যতার নিশ্চয়তা দেবে। ভূতাপেক্ষ করের এ ফাঁদ দ্রুত দূর না করা হলে তা কেবল ব্যক্তি করদাতাকেই নিঃস্ব করবে না, বরং রিয়েল এস্টেট খাতসহ সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশে এক দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট তৈরি করবে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড