এমনটি হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে গভীর সংকট দেখা দেবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী নিঃসন্দেহে কিছু দিক থেকে অতিরঞ্জিত। কিছু কিছু খাতে সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জড়তা কাজ করলে পরিবর্তনের গতি ধীর হয়ে যায়। এমন উদাহরণ ইতিহাসে অনেক আছে। এই যেমন স্বয়ংক্রিয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ প্রযুক্তি ১৯২০-এর দশকেই উদ্ভাবিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ টেলিফোন অপারেটর মানুষটিকে প্রতিস্থাপন করা হয় ১৯৮০-এর দশকে।
প্রযুক্তি নিজেই কখনো একমাত্র নিয়ামক নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জরুরি। এখানেই প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু সুবিধা পায়। তারা হয়তো সব সময় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে না, কিন্তু তাদের সেবার ওপর গ্রাহকের আস্থা থাকে। তাছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যয় কমানো ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, তা সবসময় শুধু আরো বেশি এআই ব্যবহারের দিকে নিয়ে যাবে এমন ধারণা ঠিক নয়। মানুষের জন্য নতুন ধরনের কাজও তৈরি হতে পারে। ইন্টারনেটের উত্থান এবং তথাকথিত ‘ইনফ্লুয়েন্সার অর্থনীতি’ এরই উদাহরণ।
ভিন্ন দৃষ্টিকোণে সিট্রিনির বিশ্লেষণ হয়তো যথেষ্ট হতাশাবাদীও নয়। আমরা যদি এআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোনো ভবিষ্যৎ বা মানুষের ওপর প্রযুক্তির প্রভুত্বের সম্ভাবনাকে বাদও দিই, তবু বৃহত্তর অর্থনৈতিক ফলাফল নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। সেগুলো হচ্ছে, এআই কত দ্রুত উন্নত হচ্ছে এবং কত দ্রুত তা ব্যবহার করা যাচ্ছে। এমনকি কত দ্রুত এর আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে কিংবা সমাজ ব্যবস্থা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এসব প্রভাবককে তুলনা করে আমরা কিছু চরম পরিস্থিতি তো যাচাই করে নিতেই পারি। যেমন ভবিষ্যতে অ্যানথ্রপিক বা মেটার মতো প্রতিষ্ঠান হয়তো এমন কিছু সাধারণ এআই মডেল বানাল, যেগুলো ব্যবহার করে তারা প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে থাকবে। এসব মডেল ব্যবহার করে তারা অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারবে। এআই মডেল পরিষেবা দিয়ে তারা অর্থ আদায় করবে। তাতে প্লাটফর্মগুলোর লাভ হবে অনেক। তাদের অল্পসংখ্যক কর্মী ও শেয়ারহোল্ডাররা বড় আকারে উপকৃত হবেন।
অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করবে তারা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে আরো বেশি অফিসের কর্মী ছাঁটাই করতে পারবে। ছাঁটাই হওয়া কর্মীরা তখন এমন খাতে কাজ খুঁজবেন যেখানে এআই এখনো তাদের দক্ষতাকে অচল করে দেয়নি। কিন্তু যদি সেই ধরনের কাজ সীমিত হয়, তাহলে তারা বাগান পরিচর্যা, রেস্তোরাঁর পরিবেশন বা দোকানের সহকারী—এ ধরনের কাজে ভিড় জমাবেন। এতে এসব পেশার মজুরি আরো কমে যাবে। যেহেতু এআই প্রথমে মানসিক বা জ্ঞানভিত্তিক কাজগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে, তাই দক্ষ কারিগরি পেশা অর্থাৎ মেশিন অপারেটর, প্লাম্বার বা রাজমিস্ত্রি—কিছু সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অফিসের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ওপর নির্ভরশীল কর্মীরা এসব পেশায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢুকে পড়লে সেখানেও প্রতিযোগিতা বাড়বে। তখন কষ্ট ছড়িয়ে পড়বে সমাজজুড়ে। আর প্রকৃত লাভবান হবে শুধু এআই প্লাটফর্মগুলো ও তাদের বিনিয়োগকারীরা—অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হতে পারে। তবে আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। ধরা যাক, কোনো একটি প্লাটফর্ম একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা অন্য মডেলগুলোর মধ্যে ব্যবধান কম। প্রযুক্তিগত ব্যবধান কম থাকায় তাদের মধ্যে একচেটিয়া আধিপত্যও গড়ে উঠছে না। এ পরিস্থিতিতেও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু এআইয়ের দাম কম থাকবে। তখন উৎপাদনশীলতার লাভ পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলো এআইয়ের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে পণ্যের দাম কমাতে পারবে এবং উৎপাদন বাড়াতে পারবে, ফলে অন্য খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। প্রথম পরিস্থিতির তুলনায় এতে সামাজিক কষ্ট অনেক কম হবে।
বর্তমান প্রবণতা দেখলে মনে হয় দ্বিতীয় পরিস্থিতির সম্ভাবনাই বেশি। সরকার চাইলে নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে—যেমন এআইয়ের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা মডেল নির্মাতাদের অতিরিক্ত আইনি সুরক্ষা না দেয়া। এআই অলিগার্করা যেন ধরে না নেয় যে তাদের প্রযুক্তি যদি ব্যাপক বেকারত্ব ও কষ্ট তৈরি করে, তবু সমাজ তাদের বিপুল মুনাফা রক্ষা করবে। অবশ্যই এআই শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র লবিং করবে। তারা অনেক আইনপ্রণেতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে এবং জনমত গঠনের প্রচারণা চালাবে। তারা যুক্তি দেবে—নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হবে এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা লাভবান হবেন। এ যুক্তির কিছু সত্যতা থাকলেও যদি এআইজনিত কষ্ট ব্যাপক হয়, তবে রাজনৈতিক চাপও বাড়বে।
ধরা যাক, সরকার এআইয়ের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখতে ব্যর্থ হলো। তখনো তারা অলিগোপলি ধরনের এআই কোম্পানি, তাদের কর্মী ও শেয়ারহোল্ডারদের ওপর কর আরোপ করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এখানেই আরেকটি জটিলতা আছে। এআই থেকে অস্বাভাবিক মুনাফা কারা করছে তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। আবার কাকে সহায়তা দেয়া হবে সেটাও কঠিন—কেউ প্রযুক্তির কারণে চাকরি হারিয়েছে, নাকি ব্যবসায়িক মন্দা বা ব্যক্তিগত অদক্ষতার কারণে, তা নির্ণয় করাও সহজ নয়। এ জটিলতা এড়াতে অনেক দেশে হয়তো উদার বেকার ভাতা চালুর দাবি উঠবে, যা শেষ পর্যন্ত সর্বজনীন মৌলিক আয়ের ধারণার দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এতে আরেকটি সমস্যা তৈরি হবে। কারণ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা সরকারগুলো যদি পর্যাপ্ত রাজস্ব তুলতেও পারে, তবু অনেক কাজ থাকবে যেখানে মানুষের প্রয়োজন হবে। অতিরিক্ত উদার বেকার ভাতা তখন শ্রমবাজারে মজুরি বাড়িয়ে দিতে পারে, ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যেতে পারে।
বাস্তবে বড় আকারের কিন্তু সর্বজনীন নয়—এমন বেকারত্ব সমস্যার সহজ কোনো সমাধান নেই। সমাজকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে—একদিকে সামাজিক সুরক্ষা কিছুটা শক্তিশালী করা, অন্যদিকে ব্যবসাকে উৎসাহ দেয়া যাতে তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দেয়। একই সঙ্গে যদি কোনো এআই প্লাটফর্ম প্রায় একচেটিয়া অবস্থানে পৌঁছে, তবে সরকারি নীতি তার মুনাফা সীমিত করার দিকে যেতে পারে। তখন প্রশ্ন উঠবে—এআই কোম্পানিগুলোর বিপুল ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে? কোনো আর্থিক সংকট কি সামনে অপেক্ষা করছে?
সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হবে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যৎ—যেখানে এআই এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে না যে কর্মীরা নতুন দক্ষতা অর্জনের আগেই চাকরি হারাবেন, আবার শিল্প খাত এতটা একচেটিয়াও হবে না যে লাভের বড় অংশ কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে জমা হবে। সিট্রিনির মতো কল্পনাশক্তিসম্পন্ন বিশ্লেষণ আমাদের বাধ্য করে ভেবে দেখতে—এআইয়ের গল্প যদি অন্য পথে মোড় নেয়, তাহলে কী হতে পারে। তাই এখনই সময় সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির মানচিত্র তৈরি করার এবং তার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
রঘুরাম জি রাজন: ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেসের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক। ভারতের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান অর্থনীতিবিদ