ইনানী সমুদ্রসৈকতে পরিত্যক্ত ঘোড়া, কাফকার গ্রেগর সামসা ও বৃদ্ধাশ্রম

ফেসবুক স্ক্রলিং করতে গিয়ে একটি জাতীয় পত্রিকার অনলাইনে প্রচারিত ছবিতে চোখ আটকে যায়। ছবিটি ছিল একটি ঘোড়ার। ইনানী সমুদ্রসৈকতে একটি দুর্বল, অসুস্থ ও বয়স্ক ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে।

ফেসবুক স্ক্রলিং করতে গিয়ে একটি জাতীয় পত্রিকার অনলাইনে প্রচারিত ছবিতে চোখ আটকে যায় ছবিটি ছিল একটি ঘোড়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতে একটি দুর্বল, অসুস্থ ও বয়স্ক ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে ছবির ক্যাপশনে ঘোড়াকে নিয়ে কয়েক লাইন পড়তেই ফ্রান্ৎস কাফকার বিখ্যাত উপন্যাসিকা মেটামরফোসিসের নায়ক গ্রেগর সামসার চিত্র চোখের সামনে ভেসে আসে আরেকটু ভিন্নভাবে এ ঘোড়াকে দেখলে দেখা যায়, এ ঘোড়া সমাজের বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত বৃদ্ধদের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি

ফ্রান্ৎস কাফকা তার বিখ্যাত উপন্যাসিকা মেটামরফোসিসে পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিধ্বস্ত সম্পর্ককে চিত্রায়িত করেছেন চিত্রায়িত করেছেন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মনস্তত্ত্ব, চিন্তাচেতনা ও বাস্তবতা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আত্মিকভাবে গড়ে না ওঠে কীভাবে অর্থনীতি ও উৎপাদন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে

এ উপন্যাসিকার নায়ক ছিলেন গ্রেগর সামসা যার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটে যায় একটি কোম্পানির সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করে তার উপার্জিত সব টাকা-পয়সা বাবার ঋণ শোধ করতে এবং পরিবারের হাল ধরতে শেষ হয়ে যায় তিনি নিজের উপার্জিত টাকা-পয়সা নিজে ভোগ করতে পারতেন না প্রত্যেক দিন তার চাকরির প্রয়োজনে ছুটে বেড়াতে হতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য ট্রেন ধরতে হতো। যথাযথ পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের প্রধানকে খুশি করার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তার। একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখেন, তিনি মানুষ থেকে পোকায় রূপান্তরিত হয়েছেন এর পর থেকে শুরু হয় পরিবারের বিদঘুটে আচরণ প্রত্যেক মুহূর্তে অবজ্ঞা সহ্য করতে করতে গ্রেগর সামসা একসময় অতিমাত্রায় হতাশায় ভুগতে থাকেন দীর্ঘদিন কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার কারণে কর্মস্থলের প্রধান গ্রেগর সামসার বাড়িতে আসেন অসুস্থতার খোঁজ নিতে নয়, বরং কেন কাজে যাচ্ছেন না তা জানতে পোকা হয়ে যাওয়ার খবর শুনে কর্মস্থলের প্রধান গ্রেগর সামসাকে বাদ দিয়ে তদস্থলে তার বোনকে নিযুক্ত করেন কাফকা এ পোকার মাধ্যমে দুই ধরনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন বাস্তবিক চিত্র ও রূপক চিত্র

ইনানী সমুদ্রসৈকতের পরিত্যক্ত ঘোড়া হলো গ্রেগর সামসার ভিন্ন আরেকটি রূপ যে দীর্ঘদিন পর্যন্ত মালিকের ভার বহন ও পর্যটকদের বহন করত মালিক ঘোড়াটির মাধ্যমে সমুদ্রসৈকতে শ্রম উৎপাদন করে উপার্জন করতেন একসময় ঘোড়া দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়লে মালিক ঘোড়াটিকে পরিত্যাগ করে যেহেতু ঘোড়ার উৎপাদনক্ষমতা নেই, তাই ঘোড়ার মূল্য শেষ আবার দীর্ঘদিন ঘোড়াটি যে মালিকের হয়ে কাজ করেছিল, সে কাজের কোনো মূল্যও মালিকের কাছে নেই মালিক ঘোড়াকে এমনভাবে পরিত্যাগ করেছেন যেভাবে গ্রেগর সামসাকে পরিত্যাগ করেছিল পরিবার গ্রেগর সামসার মতো ঘোড়াটিও নিজের উপার্জন নিজে উপভোগ করতে পারত না সবকিছু বিলিয়ে দিতে হতো মালিকের জন্য

গ্রেগর সামসা ও ঘোড়ার আরেকটি রূপ দেখা যায়, বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত বৃদ্ধদের দিকে তাকালে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হয়েছিল মূলত সেসব অসহায় বৃদ্ধ মানুষের জন্য যারা কোনো দুর্ঘটনায় পরিবার-পরিজন হারিয়েছেন এবং যাদের ঘরবাড়ি নেই তাদের আশ্রয়ের জন্য কিন্তু বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রম রূপ নিয়েছে শ্রম উৎপাদনে ব্যর্থ এবং পরিবারে অর্থ প্রদানে ব্যর্থ মানুষের স্থানে উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়ার পর সন্তান কর্তৃক মা-বাবাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় এবং চার দেয়ালের বৃদ্ধাশ্রমে তাদের পাঠানো হয় বদ্ধ জায়গায় মা-বাবাদের আবদ্ধ থাকতে থাকতে এক ধরনের যাতনার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যেভাবে গ্রেগর সামসা উৎপাদনক্ষমতা হারানোর পর এবং পোকা হয়ে যাওয়ার পর চার দেয়ালের বদ্ধ ঘরে যাতনার জীবন কাটিয়েছিল জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে পরিবারবিহীন এক যাতনার জীবন কাটাতে কাটাতে ও মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সময় পার করতে হয় বৃদ্ধ মা-বাবাদের

ফ্রান্ৎস কাফকা গ্রেগর সামসার মাধ্যমে এটা ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ নীরেট একখানা বস্তুর মতো বিবেচিত হয় মানুষের উৎপাদনক্ষমতা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মূল্যায়ন হয় বস্তুর যেমন প্রয়োজন কিংবা মূল্য শেষ হয়ে গেলে আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না, ঠিক তেমনি পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে বা উৎপাদনক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে আর গ্রহণযোগ্যতা থাকে না; বস্তুকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয় কোনো পরিত্যক্ত স্থানে ঠিক একইভাবে মানুষের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে একাকী রেখে সবাই সটকে পড়ে

পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো পুঁজি বা অর্থনীতি যারা যথেষ্ট অর্থ বা পুঁজির অধিকারী নন, তারা যেন এ সমাজ ব্যবস্থায় মূল্যহীন বস্তু হিসেবে গণ্য হন ফলে এ সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার পরিবর্তে বস্তুভিত্তিক সাময়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে না ওঠার কারণে মানুষ উৎপাদনহীন হওয়ার পর সমাজে আর মূল্য থাকে না কার্ল মার্ক্স এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন তার একটা তত্ত্বে

কার্ল মার্ক্সের মতে, বিচ্ছিন্ন বা একাকী করে দেয়া পুঁজিবাদের সহজাত প্রবৃত্তি পুঁজিবাদী সমাজের অর্থ ব্যবস্থা মানুষকে একাকী তো করেই, পাশাপাশি নিঃসঙ্গ করে দেয় এবং অমানবিক করে তোলে মার্ক্সের বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব মিলে যায় গ্রেগর সামসা, সমুদ্রসৈকতের ঘোড়া ও বৃদ্ধাশ্রমের মা-বাবাদের সঙ্গেতবু প্রত্যাশা, মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রাণীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠুক মানুষ মুক্তি পাক পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও সম্পর্কের সংকট থেকে

রুদ্র ইকবাল: সাংবাদিক, বণিক বার্তা

আরও