দেশের বাজেট দর্শনের গলদ কোথায়, নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে কোন খাতগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত তা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
আমাদের বাজেট দর্শনের গলদ কোথায়? গতানুগতিক বাজেট থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
আমাদের বাজেট দর্শনের বড় দুর্বলতা হলো, বাজেটকে এখনো মূলত আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের নীতিপত্র। সেখানে স্পষ্ট করে বলা থাকবে, আগামী এক বছরে সরকার কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেবে, কোন সংস্কার বাস্তবায়ন করবে, কর্মসংস্থান কোথায় তৈরি হবে, বিনিয়োগের বাধা কীভাবে কমবে, এবং দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ কীভাবে সুরক্ষা পাবে। আমাদের বাজেটে এসব কথা থাকে, কিন্তু বাস্তবায়নের শক্তিশালী কাঠামো থাকে না। ফলে বাজেট অনেক সময় ঘোষণার বড় দলিল হয়ে যায়, পরিবর্তনের কার্যকর রূপরেখা হয় না।
প্রতি বছর আমরা প্রায় একই ধরনের বাজেট দেখি। আয় বাড়ানোর চাপ থাকে, কিন্তু কর কাঠামো সংস্কারের সাহস থাকে না। ব্যয় বাড়ে, কিন্তু ব্যয়ের গুণগত মান নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পায়ন, রফতানি বহুমুখীকরণ—এসব দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকার বাজেটে প্রাপ্য গুরুত্ব পায় না। অন্যদিকে ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং প্রকল্প ব্যয়ের অদক্ষতা বাজেটের বড় অংশ আটকে রাখে।
নতুন সরকারকে তাই প্রথমেই বাজেটকে সংস্কারমুখী করতে হবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দের ফলাফল কী হচ্ছে সেটি দেখতে হবে। একটি ফলাফলভিত্তিক বাজেট কাঠামো দরকার। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা পেল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ দিয়ে কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো, কত শিক্ষার্থী দক্ষ হলো, কত রোগী সেবা পেল, কত বিনিয়োগ এল, কত দরিদ্র পরিবার সুরক্ষা পেল। বাজেটকে মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এক বছরের বাজেটকে পাঁচ বছরের রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভাবতে হবে।
আরেকটি বড় কাজ হলো রাজস্ব সংস্কার। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে খুবই কম। এ সীমিত রাজস্ব দিয়ে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু অভিযোজন, সবকিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু কর বাড়ানোর অর্থ সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ দেয়া নয়। কর ব্যবস্থাকে ন্যায্য, আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। কর ফাঁকি কমাতে হবে, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা করতে হবে, সম্পদশালী ও উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর কার্যকর কর আরোপ করতে হবে এবং ব্যবসার জন্য কর কাঠামোকে পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে। এটাই গতানুগতিক বাজেট থেকে বের হওয়ার প্রথম শর্ত।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে কী ধরনের অভিমুখ প্রত্যাশা করছেন?
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভরতা। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বা সরবরাহ ব্যাহত হলে আমাদের অর্থনীতি দ্রুত চাপে পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ে, ভর্তুকির বোঝা বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে হবে না। এটি সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন, রফতানি প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। এখন পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ খুবই কম। এ জায়গায় ধীরে চলার সুযোগ নেই। সৌরবিদ্যুৎ, রুফটপ সোলার, সেচে সৌরশক্তি, শিল্পাঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল এবং গ্রিড আধুনিকায়নে স্পষ্ট বরাদ্দ ও নীতিসহায়তা দরকার। শুধু লক্ষ্য ঘোষণা করলে হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন, জমি ব্যবস্থাপনা, গ্রিড সংযোগ, আর্থিক প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কর ও শুল্ক সুবিধা আরো যৌক্তিক করা যেতে পারে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, স্মার্ট মিটার, গ্রিড প্রযুক্তি, এনার্জি স্টোরেজ—এসব ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি করতে হবে। তবে স্থানীয় উৎপাদন সুরক্ষার নামে যেন প্রযুক্তির খরচ অযৌক্তিকভাবে বেড়ে না যায়, সেটিও দেখতে হবে।
জ্বালানি দক্ষতা আরেকটি বড় ক্ষেত্র। আমরা অনেক সময় নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে বেশি কথা বলি, কিন্তু বিদ্যুৎ সাশ্রয়, দক্ষ যন্ত্রপাতি, শিল্পে এনার্জি অডিট, ভবনের জ্বালানি মানদণ্ড—এসব নিয়ে কম কথা বলি। নতুন বাজেটে এনার্জি ইফিশিয়েন্সি কর্মসূচির জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকা উচিত। শিল্প খাতে কম সুদের সবুজ ঋণ, ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন এবং প্রযুক্তি আপগ্রেডের জন্য প্রণোদনা দেয়া যায়। এতে জ্বালানি আমদানি কমবে, উৎপাদন খরচ কমবে এবং পরিবেশগত দায়ও কমবে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মন্দ ঋণ সংকট কাটছে না। দুর্বল ব্যাংকগুলো নিয়ে নতুন সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
ব্যাংক খাতের সংকট এখন আর শুধু কয়েকটি ব্যাংকের সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার, ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ, দুর্বল তদারকি এবং পরিচালনা পর্ষদের অনৈতিক ভূমিকা মিলিয়ে ব্যাংক খাতে আস্থার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ পদক্ষেপ দরকার।
দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বের করা। অনেক ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে যে চিত্র দেখানো হয়, তা বাস্তব অবস্থার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। তাই স্বাধীন অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করতে হবে। কোন ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণ কত, মূলধন ঘাটতি কত, প্রভিশন ঘাটতি কত, তার পরিষ্কার ছবি জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের সামনে থাকতে হবে। সমস্যা আড়াল করে সময় কেনা যাবে, কিন্তু সংকট সমাধান হবে না।
দ্বিতীয়ত, দুর্বল ব্যাংক নিয়ে একক নীতি দরকার। সব ব্যাংককে একইভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। কিছু ব্যাংক পুনর্গঠনযোগ্য হলে তাদের জন্য সময়সীমাবদ্ধ পুনর্গঠন পরিকল্পনা দরকার। সেখানে মূলধন পুনঃসংস্থান, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, ঋণ আদায় পরিকল্পনা, ব্যয় কমানো এবং কঠোর তদারকি থাকবে। আর যেসব ব্যাংক কার্যত অকার্যকর, তাদের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ অথবা সুশৃঙ্খল এক্সিটের ব্যবস্থা করতে হবে। আমানতকারীর স্বার্থ অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, কিন্তু দুর্বল মালিক বা অসৎ ঋণগ্রহীতাকে রক্ষা করার দায় রাষ্ট্রের নয়।
তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, সম্পদ জব্দ, বিদেশে অর্থ পাচারের তদন্ত এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। বারবার পুনঃতফসিল করে ঋণখেলাপিকে সুবিধা দেয়া হলে সৎ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর ব্যাংকিং সংস্কৃতি আরো নষ্ট হয়। নতুন সরকারকে এ বার্তা দিতে হবে যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি আর চলবে না।
ব্যাংকের মালিক ও পরিচালনা পর্ষদ কীভাবে সাজানো উচিত? পেশাদারত্ব ও শৃঙ্খলা ফেরাতে আপনার পরামর্শ কী?
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হওয়া উচিত পেশাদার, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ মালিকগোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হাত হিসেবে কাজ করেছে। পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক অংশীদার, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি অথবা ঋণগ্রহীতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পর্ষদে থাকলে ব্যাংকের স্বার্থরক্ষা করা কঠিন। ফলে ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অডিট এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়।
পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকা শক্তিশালী করতে হবে। তবে শুধু নামের স্বাধীন পরিচালক হলে চলবে না। তাদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি, হিসাবরক্ষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আইন, প্রযুক্তি ও করপোরেট গভর্ন্যান্স বিষয়ে দক্ষতা থাকতে হবে। পর্ষদে একই পরিবার বা গোষ্ঠীর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে। পরিচালকদের মেয়াদ, যোগ্যতা, স্বার্থের সংঘাত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ বিষয়ে কঠোর নিয়ম থাকতে হবে। ব্যাংক পরিচালনায় ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি ক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে। কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অনিয়মে জড়িত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট, বহিঃনিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ক্রেডিট কমিটির কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি, বড় ঋণগ্রহীতার তথ্যভাণ্ডার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণের ওপর রিয়েল টাইম মনিটরিং দরকার।
পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে মালিকের সরাসরি প্রভাব থেকে দূরে রাখতে হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, অপসারণ ও মূল্যায়নে স্বচ্ছতা দরকার। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে তখনই, যখন সৎ ব্যাংকার সুরক্ষা পাবেন, অনৈতিক পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে এবং ঋণখেলাপি রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব দিয়ে দায় এড়াতে পারবেন না।
জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গবেষণায় কেমন বাজেট হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের বড় শক্তি তার মানুষ। কিন্তু মানুষ তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের ওপর ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকে। আমাদের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই প্রাপ্য অগ্রাধিকার পায় না। বরাদ্দ কম, ব্যয়ের গুণগত মান দুর্বল এবং ফলাফলও প্রত্যাশিত নয়। এ অবস্থায় জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়।
শিক্ষা বাজেটে শুধু ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো নয়, শেখার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষা দক্ষতা, বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণে বেশি জোর দিতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শেখার ঘাটতি কমানো সবচেয়ে জরুরি। একজন শিক্ষার্থী যদি স্কুলে ১০ বছর কাটিয়েও মৌলিক ভাষা, গণিত, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জন না করে, তাহলে উচ্চশিক্ষা বা শ্রমবাজারে সে পিছিয়ে পড়বে।
স্বাস্থ্য খাতেও বড় পরিবর্তন দরকার। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব খরচ এখনো অনেক বেশি। ফলে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার একটি বড় রোগের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে। বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের মানোন্নয়ন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় বেশি বিনিয়োগ দরকার। স্বাস্থ্য খাতে জনবল, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনা, সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাজেটে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত এবং সরকারের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি না হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে না। কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, জলবায়ু, শিল্প প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসব ক্ষেত্রে গবেষণা তহবিল দরকার। আমরা যদি ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করতে চাই, তাহলে গবেষণাকে বিলাসিতা হিসেবে নয়, উন্নয়নের মৌলিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
বৈশ্বিক মানদণ্ডে আমাদের সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না কেন? কী ধরনের পরিবর্তন দরকার?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো শ্রমবাজারের সঙ্গে তার সংযোগ দুর্বল। সাধারণ শিক্ষায় অনেক সময় মুখস্থনির্ভরতা বেশি, বিশ্লেষণী দক্ষতা কম। কারিগরি শিক্ষাতেও বাস্তব প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, শিল্প-সংযোগ এবং প্রশিক্ষকের মান নিয়ে বড় সমস্যা আছে। ফলে ডিগ্রি অর্জন হচ্ছে, কিন্তু দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। এ বৈপরীত্যই বেকারত্ব ও দক্ষতার ঘাটতি—দুটো সমস্যাকেই একসঙ্গে বাড়াচ্ছে।
বৈশ্বিক মানদণ্ডে খাপ খাওয়াতে হলে শিক্ষায় তিনটি পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে আধুনিক করতে হবে। শুধু পরীক্ষার জন্য পড়া নয়, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের মান বাড়াতে হবে। শিক্ষক উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা সংস্কার সফল হবে না। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে স্থায়ী সংযোগ তৈরি করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষায় জার্মানি, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আছে। সেখানে শিল্প খাত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অংশ। আমাদের ক্ষেত্রেও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় শিল্প, রফতানি খাত, নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, আইটি, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও লজিস্টিকস খাতে যুক্ত করতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি বা উদ্যোক্তা হওয়ার পথ যেন স্পষ্ট থাকে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের কথাও ভাবতে হবে। বাংলাদেশ থেকে যে শ্রমিক বিদেশে যান, তাদের অনেকেই নিম্ন দক্ষতার কাজে যান। ফলে আয় কম, ঝুঁকি বেশি। যদি ভাষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ার ইকোনমি, নির্মাণ প্রযুক্তি, মেশিন অপারেশন, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি—এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেয়া যায় তাহলে প্রবাসী আয়ের গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। তাই শিক্ষা সংস্কারকে শুধু দেশের ভেতরের চাকরির সঙ্গে নয়, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে।
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে করণীয় কী? বাজেট কতটুকু সহায়তা করতে পারে?
বাংলাদেশে বেকারত্বের সমস্যা শুধু সংখ্যার সমস্যা নয়, গুণগত সমস্যাও। অনেক তরুণ কাজ পাচ্ছে না। আবার অনেকেই এমন কাজে যাচ্ছে যেখানে আয় কম, নিরাপত্তা নেই, দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ কম। শিক্ষিত বেকারত্ব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু অর্থনীতি তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কাজ তৈরি করতে পারছে না। এর পেছনে বিনিয়োগের স্থবিরতা, শিল্প বৈচিত্র্যের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি, ব্যবসার উচ্চ খরচ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বড় কারণ।
কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগকে চাঙ্গা করতে হবে। বাজেট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কর কাঠামো সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সুলভ অর্থায়ন দিতে হবে, শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ-গ্যাস-জমি-লজিস্টিকস নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন খাতে বিনিয়োগে প্রণোদনা দিতে হবে। তৈরি পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু শুধু এক খাতের ওপর নির্ভর করে শ্রমবাজারের চাপ সামলানো যাবে না। এগ্রো-প্রসেসিং, ফার্মাসিটিক্যালস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, আইটি-এনাবলড সার্ভিসেস, কেয়ার সার্ভিসেস, লজিস্টিকস, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—এসব খাতে কর্মসংস্থানের বড় সম্ভাবনা আছে।
বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। যেমন যে প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগ করবে এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেবে, তারা কর সুবিধা বা আংশিক মজুরি সহায়তা পেতে পারে। নারী ও তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ স্কিম থাকতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, গ্রামীণ অ-কৃষি খাত এবং স্টার্টআপের জন্য সহজ ঋণ, বাজার সংযোগ এবং ডিজিটাল সেবা দরকার। শুধু ঋণ দিলেই হবে না, ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পরিবেশও দিতে হবে।
সরকারি প্রকল্পেও কর্মসংস্থানকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। অবকাঠামো প্রকল্পে কত স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, দক্ষতা উন্নয়ন হচ্ছে কিনা, স্থানীয় সরবরাহকারীরা যুক্ত হচ্ছে কিনা—এসব দেখা দরকার। একই সঙ্গে শ্রমবাজার তথ্য ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। কোন খাতে কী দক্ষতা দরকার, কোথায় চাকরি তৈরি হচ্ছে, কোন জেলায় শ্রমশক্তি বেশি—এসব তথ্য ছাড়া কর্মসংস্থান নীতি কার্যকর হবে না। বাজেট সব সমস্যা সমাধান করতে পারে না, কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার করলে বাজেট কর্মসংস্থান সৃষ্টির শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
শিল্পনীতি, কর কাঠামো ও ওয়ান স্টপ সার্ভিসে কোন সংস্কার অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?
বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ কম আসার বড় কারণ শুধু অবকাঠামো নয়। নীতির অনিশ্চয়তা, জটিল কর ব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, জমি পাওয়ার সমস্যা, অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, মুনাফা প্রত্যাবাসনে জটিলতা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখেন, কিন্তু বাস্তবায়নের ঝুঁকি বেশি মনে করেন। তাই বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু প্রচারণা যথেষ্ট নয়, বাস্তব পরিবেশ বদলাতে হবে।
শিল্পনীতিতে প্রথম সংস্কার হওয়া উচিত রফতানি বহুমুখীকরণকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে নীতিগত সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতকেন্দ্রিক। অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত যেমন ফার্মাসিটিক্যালস, এগ্রো-প্রসেসিং, লেদার ও ফুটওয়্যার, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, পাটজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, আইটি ও ডিজিটাল পরিষেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সামগ্রী—এসব খাতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রণোদনা দিতে হবে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, রফতানি সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে।
কর কাঠামোতে বড় সংস্কার দরকার। ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, অগ্রিম কর, উৎসে কর, জটিল ভ্যাট ব্যবস্থা এবং উচ্চ আমদানি শুল্ক অনেক সময় ব্যবসার খরচ বাড়ায়। বিশেষ করে মধ্যবর্তী পণ্যে উচ্চ শুল্ক উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে রফতানি প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। তাই কর কাঠামোকে সহজ, স্বচ্ছ, ডিজিটাল এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। কর অব্যাহতি ও প্রণোদনার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা উচিত। কোন প্রণোদনা কার্যকর, কোনটি অকার্যকর, সেটি মূল্যায়ন করতে হবে।
ওয়ান স্টপ সার্ভিসের ধারণা ভালো, কিন্তু বাস্তবে এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কারণ অনেক অনুমোদন এখনো ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থার হাতে। বিনিয়োগকারী এক জায়গায় আবেদন করলেও সিদ্ধান্তের জন্য তাকে বহু দপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস অনেক সময় ‘ওয়ান মোর স্টপ’ হয়ে যায়। এটি বদলাতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ক্ষমতা, প্রক্রিয়া ও তথ্য ব্যবস্থা একীভূত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন না দিলে অটো অনুমোদনের (ডিমড অ্যাপ্রোভাল) ব্যবস্থা বিবেচনা করা যায়, তবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় যাচাই অবশ্যই থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। কোন সংস্থা কত দিনে অনুমোদন দিচ্ছে, কোথায় ফাইল আটকে আছে, কেন বিলম্ব হচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। বিনিয়োগকারীর অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। একই সঙ্গে কাস্টমস, কর প্রশাসন, ভূমি নিবন্ধন, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ আসবে তখনই, যখন বিনিয়োগকারী দেখবেন নিয়ম পরিষ্কার, সিদ্ধান্ত দ্রুত, খরচ পূর্বানুমানযোগ্য এবং চুক্তির নিরাপত্তা আছে।