চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন

পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি ও সুবিধাভোগী শ্রেণী তৈরি নয় অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ বিএনপির অঙ্গীকার

অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণের আলোচনায় আসার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট আছে। দেশে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি এবং সুবিধাভোগী অর্থনীতি গড়ে ওঠার কারণে এগুলোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায়নি।

অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণের আলোচনায় আসার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট আছে। দেশে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি এবং সুবিধাভোগী অর্থনীতি গড়ে ওঠার কারণে এগুলোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপি অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণের কথা বলছে। রাজনীতি গণতন্ত্রায়ণের মতো অর্থনীতিকেও গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে হবে। কেননা কেবল রাজনীতির গণতন্ত্রায়ণের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সেটি নিশ্চিত করতে বিগত অর্থনীতির ধারা থেকে বের হয়ে আসা এবং একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলি, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে কর্মরত অসংখ্য মানুষ রয়েছে। যুগ যুগ ধরে তারা এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু তাদের পণ্যের মানোন্নয়ন হয়নি। এমনকি তাদের জীবনযাত্রার মানও সেভাবে বাড়েনি। তাই আমাদের এমন অর্থনীতির মডেল তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে এবং যার সুফল সবাই পাবে।

এক্ষেত্রে বিএনপির পরিকল্পনা হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ ও কাঁচামাল প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি, কাজের দক্ষতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ডিজাইনিং, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন মার্কেটিং সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা করছে। দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সেভাবে কখনই বিনিয়োগ করা হয়নি। সিংহভাগ বিনিয়োগ করা হয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। ফলে অর্থনীতির অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোর প্রকৃত বিকাশ ঘটেনি। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নিয়োজিতদের পণ্যের মানোন্নয়ন ঘটলে তার বাজার চাহিদা ও মূল্য বাড়বে। এতে এ খাতের শ্রমজীবীদের জীবনযাত্রার মানও বাড়বে। উদ্যোক্তাদের ই-বে, আলিবাবা ও অ্যামাজনের মতো বিভিন্ন ই-কমার্স প্লাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে তারা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এতে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে।

গণতন্ত্রায়ণের জন্য অর্থনীতিকে ডিজিটালাইজড করাটাও জরুরি। নয়তো এর সুফল সবার কাছে পৌঁছবে না। এজন্য দুটি বিষয় বিএনপির পরিকল্পনায় আছে। প্রথমত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কোনো ধরনের সমঝোতা করা যাবে না। এখানে বিনিয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এর সঙ্গে শক্তিশালী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় পুরো দেশকে নিয়ে আসা। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিএনপি এ দুই ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দেবে। এ দুই সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দেয়া গেলে দেশে কল সেন্টার, ডাটা সেন্টার, অনলাইন, রিয়াল-টাইম বিজনেস ইত্যাদির সুযোগ তৈরি হবে। দেশের প্রত্যেকের কাছে এসব সুবিধাও পৌঁছানো সম্ভব হবে। উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’-এর কথা বলা যেতে পারে। এ প্রকল্পের আওতায় একটা গ্রামে একটা পণ্য তৈরি করা হয়। সরকার এর পেছনে বিনিয়োগ করে। পাশাপাশি ঋণ, ব্র্যান্ডিং, প্রণোদনা সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। সেই পণ্য বিভিন্ন ই-কমার্স প্লাটফর্মে বিক্রি করা হয়। এমন একটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মডেল বিএনপি দাঁড় করাতে চায়, যেখানে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাই এ দুই বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। আর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি মূলনীতি অনুসরণ করা হবে। প্রথমত, বিনিয়োগ হবে ভ্যালু ফর মানি অর্থাৎ বিনিয়োগের তুলনায় যথাযথ লাভ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা) নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে হবে। বিএনপির জন্য এটা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারের জায়গা। জবলেস গ্রোথ বা কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি দিয়ে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ সম্ভব না। চতুর্থত, পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আমাদের মেনে চলতে হবে। প্রকৃতি-পরিবেশও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়। দেশের অর্থনীতি উন্নয়নশীল ও টেকসই করতে এ চার নীতি পালন অপরিহার্য।

কোন কোন জায়গায় কর্মসংস্থান হতে পারে সে প্রসঙ্গে বলা যাক। বিশ্বে স্পোর্টস (খেলা) উন্নত অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। ব্রাজিল বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের অর্থনীতির দিকে লক্ষ করলে বিষয়টি বোঝা যায়। তাই বিএনপির পরিকল্পনা রয়েছে, প্রত্যেকটি উপজেলা পর্যায়ে স্পোর্টস সেন্টার তৈরি, যেখানে ফুটবল, ক্রিকেট, সুইমিং, শুটিং, আর্চারির মতো সম্ভাবনাময় স্পোর্টসগুলোর বিকাশে কাজ করা হবে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সুযোগ আছে। মানুষ খেলা দেখতে যান। এতেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটে। তাই অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের অংশ হিসেবে আমরা স্পোর্টসকে প্রাধান্য দিচ্ছি।

এর বাইরে সাংস্কৃতিক ব্যবধান কমানোয় আমরা প্রাধান্য দেব। স্থানীয়দের যাদের মঞ্চনাটক, গান বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয়ে আগ্রহ আছে, তাদের পেছনে বিএনপি বিনিয়োগ করতে চায়। আমরা চাচ্ছি, দেশের সর্বস্তরের মানুষ যেন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। সেটা স্পোর্টসম্যান হোক বা কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট হোক।

বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম বা যারা শিক্ষিত বেকার, ডিজিটাল অর্থনীতিতে তাদের অবদান রাখার বিরাট সুযোগ রয়েছে। এজন্য আমরা ঠিক করেছি বিএনপি সরকার গঠন করলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে বিএনপি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া ছাড়া দেশের ভালো ভবিষ্যৎ নেই। আর আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আত্মবিশ্বাসী কারণ বিএনপির পূর্ববর্তী শাসনামলগুলোয়ও এমপ্লয়মেন্ট কার্ভ সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আমরা আশা করছি, এবার সেটি আরো ওপরে উঠবে। আমরা যে এগুলো বলছি তাহলে টাকাটা আসবে কোথা থেকে? ব্যাংকের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের ব্যাংক খাতকে খোঁড়া করে দিচ্ছে। এজন্যই আমরা পুঁজিবাজারকে উন্নত করার চিন্তা করছি। যে যা-ই বলুক বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এজন্যই ব্যাংকিং সিস্টেমে চাপ পড়ছে। আমরা এখন ফ্রন্টিয়ার মার্কেটে আছি। আমাদেরকে ইমার্জিং মার্কেটের দিকে এগোতে হবে। ফ্রন্টিয়ার মার্কেটের মোট বৈশ্বিক ফান্ড হচ্ছে ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার, এর বেশিও হতে পারে। আমরা যদি ইমার্জিং মার্কেটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, ট্রিলিয়ন ডলারে সেটা উন্নীত হবে। আমাদের পরিকল্পনা আছে পুঁজি বাজারের ওপর বড় ফোকাস নিয়ে আসার। বিএনপি কিন্তু কোনোদিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করেনি। এজন্য বিএনপির সময় কখনো পুঁজিবাজারে ধস নামেনি। বিএনপির সময় কখনই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়নি। যার ফলে ব্যাংক খাতে আমাদের সময় কখনই কোনো সমস্যা হয়নি। আগামী দিনে তো হবেই না—এটা আমরা গর্ব করে বলতে পারি। বরং প্রাইভেট সেক্টরে আমরা যে উন্নতি করেছি, এর সবকিছুই বিএনপির সময় করা। আমাদের এখানে গার্মেন্টস সেক্টর কীভাবে এল? এটা বিকশিত হয়েছে ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধায়। এটা আমরা করেছি। আগামী দিনে আমরা পরিকল্পনা করছি যারাই রফতানি করবে আমরা তাদেরকে একই সুবিধা দেব। আজকে গার্মেন্টস সেক্টর যে সুবিধা পাচ্ছে আমরা তাদের জন্য সেই দ্বার উন্মুক্ত করে দেব। তাদেরকে ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা দেব, তাদেরকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ দেব। যাতে কোনো রফতানিকারক কোনো অসুবিধার মধ্যে না পড়েন। আরো দশটা খাত যদি রফতানিতে আসে তাহলে তাদেরকে এ সুবিধাগুলো দেব। সবচেয়ে বড় প্রোগ্রাম যেটা আমরা নিচ্ছি সেটা হচ্ছে, বড় আকারের ডিরেগুলেশন। খুবই দুঃখজনক হলেও এটা সত্য, বাংলাদেশ অতিরিক্ত রেগুলেটেড দেশ। এটা হয়তো সবার ভালো লাগবে না শুনতে। আমরা খুবই গুরুত্বসহকারে ডিরেগুলেশনে যাব যাতে করে কোনো নাগরিকের সরকারি অফিস-আদালতে ঘুরতে না হয়। এখান থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের মুক্ত করতে হবে। আমরা কি সরকারকে শক্তিশালী করব নাকি জনগণকে করব? এ ব্যাপারে আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আমাদেরকে রাজনীতিবিদ হিসেবে মন স্থির করতে হবে কোনটা করব। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি জনগণকে শক্তিশালী করব। আমরা এটা সিরিয়াস ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে করব। আমরা এটা আগেও করেছি এবারো করব। আমি যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম তখন ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট (ইউসি) লাগত। আপনি কাঁচামাল আমদানি করছেন আবার মাল রফতানি করবেন এটার জন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) একটা সার্টিফিকেট দিত। এটা এখনো আছে। তখন এটা নিতে গেলে পয়সা দিতে হতো, ভোগান্তির শিকার হতে হতো। সার্টিফিকেট ঠিক সময়ে না হওয়ার ফলে শিপমেন্ট বিলম্বিত হতো। তখন ব্যবসায়ীরা আমার কাছে সমস্যা নিয়ে এল এবং বলল এটা ফিক্স করেন। আমি বললাম ইউসি সার্টিফিকেট ইপিবির হাতে রাখব না। ইপিবির বাইরে গিয়ে এটা আপনাদের হাতে দেব যদি নিজেরা পরিচালনা করতে পারেন। তখন তা ইপিবি থেকে বের করে বিজিএমইএকে দিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত এ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কিন্তু এটা ভালো চলছে। অনেক কিছুই সরকারি পরিচালনার বাইরে নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের অনেক কাজ আমরা তাদের দিয়ে দেব তারা যদি নিজেরা ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন।

বাংলাদেশের ‘‌ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ এখন তলানিতে! বিদেশী বিনিয়োগ দূরের কথা, দেশী বিনিয়োগকারীদের অবস্থাই শোচনীয়! প্রাত্যহিক নানা সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়েই দিনের অর্ধেক সময় চলে যায়। আর বাকি দিন ব্যবসা করতে পারে কিনা আমাদের সন্দেহ আছে। আমরা এ দুঃখ থেকে মুক্ত করে ডিরেগুলেট করতে চাই। ডিরেগুলেশন বলতে বোঝাচ্ছি, যত ধরনের অনুমতি লাগুক সেটাকে এক জায়গায় আনব এবং সব সিঙ্গেল উইন্ডোতে নিয়ে আসব। এটা পরিচালনা করা হবে ডিজিটাল পরিচালনার মাধ্যমে। আপনি কিন্তু কাগজ দিয়ে এগুলো করতে পারবেন না। এক অফিস থেকে অন্য অফিস ঘোরাঘুরি করে ব্যবসা করার সময় কোনো ব্যবসায়ীরই নেই। এমন ব্যবস্থা বাংলাদেশেই আছে, পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না! এটা থেকে আমরা মুক্ত করতে চাই।

আমরা সরকারি পরিষেবায় ই-গভর্ন্যান্স নিয়ে আসতে চাই। অনেক জায়গা আছে সমস্যাজনক, যেমন আমাদের বন্দর ব্যবস্থা। এনবিআর আরো বড় আকারের সমস্যায় নিপতিত। এনবিআর সংস্কারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হয়নি। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সমস্যা কাটেনি। আমরা ডিজিটাল অর্থনীতির কথা চিন্তা করছি, সেক্ষেত্রে বিটিআরসির সংস্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকট, এসইসির সমস্যা, রেজিস্ট্রার অব জয়েন স্টক কোম্পানির মতো ছয়-সাতটা প্রধান সমস্যা রয়েছে। সেগুলোকে আমরা এক ছাদের নিচে নিয়ে আসব। এগুলো প্রচলিত পরিচালনা কাঠামোর মতো থাকবে না। এখানে কিন্তু ভালো লোকদের থাকতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনা তো নয়ই, তাদেরকে পরিপূর্ণ পেশাদার হতে হবে। ওই এলাকায় দায়িত্বরত ব্যক্তির দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা থাকতে হবে। এসইসির চেয়ারম্যানের যদি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকে, সে যদি ওয়াল স্ট্রিট না বোঝে, সে যদি বিশ্ববাজার না বোঝে ওই এসইসির চেয়ারম্যানের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। ইমার্জিং ফান্ড আনতে গেলে ওটা বুঝতে হবে।

আমরা এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছি জাতির কাছে। আমরা ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই। এটা স্রেফ একটা রাজনৈতিক বয়ান নয়, আমরা তা নিয়ে কাজ করেছি। কোন খাতে কত কর্মসংস্থান হবে, বিপরীতে বিনিয়োগ কী করতে হবে সেটা নিয়েও আমরা কাজ করেছি। এ বিনিয়োগে আমরা সরকার থেকে কতটুকু করব, ট্যাক্সেশনের মাধ্যমে কতটুকু করব পুঁজিবাজার থেকে কতটুকু করব সবকিছু নিয়েই কাজ করেছি।

সবকিছুর জন্যই কেন আমাদের ব্যাংকে যেতে হবে? পুঁজিবাজার ছাড়া বিনিয়োগ চাঙ্গা করার কোনো উপায় নেই।

ভারতের জিডিপির আকারের বিপরীতে পুঁজিবাজারের বাজার মূলধন ১২৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে তা প্রায় দ্বিগুণ! বাংলাদেশের জিডিপির বিপরীতে পুঁজিবাজারের অবদান মাত্র ৫-৬ শতাংশ। এ রকম পুঁজিবাজার দিয়ে আমরা যেখানে যেতে চাচ্ছি—যাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করতে হবে। পুঁজিবাজার থেকে কেবল যে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আসবে এমন নয়, সরকারও অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। সরকারকে কেন মাত্র ৪ বিলিয়ন ডলারের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পেছনে ছুটতে হবে? এতগুলো শর্ত মেনে আইএমএফের পেছনে একটা সরকারকে ঘুরতে হচ্ছে আইএমএফের পেছনে, এটা কত লজ্জার। আমরা কেন ক্যাপিটাল মার্কেট বিকাশে মনোযোগ দিলাম না? সারা দুনিয়ায় মানুষ ইকুইটি নিচ্ছে, বন্ড নিচ্ছে। সরকার অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বাংলাদেশ বিমানের কথাই ধরি, সেখানে কেন সরকার টাকা দেবে? এটা একটা ব্যবসায়িক উদ্যোগ, তাকে প্রতিযোগিতা করে বাজারে টিকে থাকতে হবে, উপার্জন করতে হবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উপার্জন করতে হবে, যদি ওরা থাকতে চায়।

অর্থনীতির কাঠামোটাকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চাই এবার। যেখানে সরকারের সব জায়গায় বিনিয়োগ করার দরকার নেই। বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ করবে দারিদ্র্য দূরীকরণে, সামাজিক নিরাপত্তায়, অবকাঠামোতে। আমাদের অন্য বিনিয়োগগুলো পুঁজিবাজারের মাধ্যমে করতে হবে। সেখানে অনেক সুবিধা আছে। এমনকি সিটি করপোরেশন যেগুলো আছে তারাও উপার্জনের অনেক বিকল্প খুঁজতে পারে। সারা বিশ্বেই এমনটা হচ্ছে, অনেক নগর কর্তৃপক্ষ মিউনিসিপ্যাল বন্ড ছেড়ে টাকা সংগ্রহ করছে।

যেখানে বিনিয়োগের ফলে আয় আসবে না, যেখানে চাকরির সুযোগ থাকবে না, যেখানে পরিবেশের ইস্যু থাকবে না ওই বিনিয়োগ কখনো ভালো হতে পারে না। ওই বিনিয়োগ করে আজকে আমরা বড় বিপদে আছি। টাকা ছাপিয়ে, ঋণ নিয়ে কোনো অর্থনীতি টেকসই হয় না। এজন্য আমাদের পুরো ফোকাস থাকছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের ওপর। এর ভেতর দিয়ে এক কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। আমাদের যুবকদের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো কর্মসংস্থান। আমি কর্মসংস্থান বলতে কেবল চাকরি বোঝাচ্ছি না, আত্মকর্মসংস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। এটার ওপরই বেশি জোর দিচ্ছি। আমাদের যুবকদের বিশাল সম্ভাবনা আছে, তারা যেন আত্মকর্মসংস্থানে যেতে পারে। বিদেশে যারা যায় তারা যেন কর্মদক্ষ হয়, এজন্য প্রতিটি জেলায় স্কিল সেন্টার খুলব। যার মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান দেশেই নয়, বিদেশেও পরিবর্তন হবে। বাইরে গিয়েও যেন তারা আজকের বেতনের তিন চার গুণ বেশি পায়। পণ্যের মান বৃদ্ধি করতে হবে। এটাকে রফতানি উপযোগী করতে হবে। বিপণনে সহায়তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আগামী দিনের জন্য এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা ভাবছি।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ’ শিরোনামে দ্বিতীয় অধিবেশনে সম্মানিত আলোচক হিসেবে দেয়া বক্তৃতায়]

আরও