পর্যালোচনা

২৫০ বছরে অ্যাডাম স্মিথের ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশন্স’

আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদনের ২৫০তম বার্ষিকী পালিত হবে। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রন্থ, যা অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ার ভিত্তি, সেটিও একই মাইলফলক স্পর্শ করবে ২০২৬ সালে।

আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদনের ২৫০তম বার্ষিকী পালিত হবে। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রন্থ, যা অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ার ভিত্তি, সেটিও একই মাইলফলক স্পর্শ করবে ২০২৬ সালে। সে আলোচিত গ্রন্থটি হচ্ছে অ্যাডাম স্মিথের ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশন্স’। দ্রুত অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের এ সময়ে এর অন্তর্দৃষ্টিগুলো আবার পর্যালোচনা করা জরুরি।

স্মিথের দুটি প্রধান অন্তর্দৃষ্টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি হলো বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’ (ইনভিজিবল হ্যান্ড) দক্ষতার সঙ্গে সম্পদ বণ্টন করে। এজন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়, যেমন একটি স্থিতিশীল মুদ্রা, অর্থনৈতিক প্রভাবকদের মধ্যে আস্থা ও নৈতিকতা এবং বিশ্বাসযোগ্য সম্পত্তির অধিকার। বাহ্যিকতা বা কোনো সত্তার কার্যকলাপের অমূল্যায়িত প্রভাব এবং তথ্যগত ঘাটতি ও অসামঞ্জস্যতা অদৃশ্য হাতের দক্ষতা ও কার্যকারিতা হ্রাস করে।

তার লেখার দ্বিতীয় এবং সম্ভবত আরো গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টিটি হলো কোনো অর্থনীতির দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা ‘শ্রম বিভাজন’ দ্বারা বাড়ে। বর্তমানে তা ‘বিশেষায়ন’ (স্পেশালাইজেশন) নামে পরিচিত। একটি বিশেষায়িত অর্থনীতি বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল, যা অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং উদ্ভাবনের জন্য বর্ধিত প্রণোদনার সুবিধা নেয়। যেহেতু বিনিময়ের একটি যুক্তিসংগত দক্ষ পদ্ধতি ছাড়া বিশেষায়ন কাজ করে না, তাই এটি স্মিথের অদৃশ্য হাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষায়নের অগ্রগতি যত বাড়ে, অর্থনীতির জটিলতাও তত বাড়ে।

স্মিথ যেমন উল্লেখ করেছেন, বিশেষায়ন ‘বাজারের বিস্তৃতি’ দ্বারা সীমিত। একটি ছোট বাজার বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট চাহিদা তৈরি করতে পারে না। এ কারণেই পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, যা বিস্তৃত বাজারে প্রবেশের ব্যয় কমায় আরো বেশি বিশেষায়নকে সক্ষম করেছে।

বিশেষায়নের ওপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা হলো এর অনিবার্য ঝুঁকি। যেহেতু একটি অর্থনীতির বিশেষায়নের ধরনগুলো কাঠামোগত, তাই সেগুলো পরিবর্তন হতে সময় লাগে। সুতরাং যদি বাণিজ্য ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয় অথবা নির্দিষ্ট দক্ষতা বা শিল্পগুলো অপ্রচলিত হয়ে পড়ে (যেমন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা চাহিদার ধরনে পরিবর্তন দ্বারা), তখন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি পুরো অর্থনীতিকে একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে যখন অর্থনীতিগুলো আরো বিশেষায়িত হচ্ছিল, তখন এর সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিগুলো কমানোর জন্য বিভিন্ন নীতি, প্রতিষ্ঠান ও শর্ত, যেমন একচেটিয়া বিরোধী আইন থেকে সামাজিক নিরাপত্তা জাল এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। তবে এগুলো মূলত জাতীয় পর্যায়ের সমাধান ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশেষায়ন বৈশ্বিক রূপ নেয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি উপায় হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত একটি ব্যাপক রূপান্তরে পরিণত হয়। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো তাদের অপ্রতিসম অর্থনৈতিক কাঠামোসহ পরিত্যক্ত হয় এবং মার্কেন্টাইলবাদ মুক্ত বাণিজ্যের পথ করে দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় পরিবহন ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রগতি, যা ডিজিটাল বিপ্লব দ্বারা ত্বরান্বিত হয়েছে এবং বিশেষায়নের ওপর প্রথম সীমাবদ্ধতা—‘বাজারের বিস্তৃতি’ আমূলভাবে শিথিল হয়।

উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি ছিল একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। তাদের মাথাপিছু জিডিপি কম হওয়ায় তারা বিশেষায়নের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সুবিধা নিতে যথেষ্ট অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি করতে পারছিল না। কিন্তু যখন তারা বিদেশী বাজার ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার পেল, তখন তারা তাদের তুলনামূলক সুবিধাগুলো কাজে লাগিয়ে দ্রুত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এভাবে ক্রমবর্ধমান বিশেষায়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর ঘটে।

ফলে উদ্ভূত কাঠামোগত ব্যাঘাতগুলো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিগুলো হ্রাস করতে সক্ষম শাসন কাঠামোর বিবর্তনকে ছাড়িয়ে যায়। কিছু সময়ের জন্য এটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি: উন্নত অর্থনীতিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—তখনো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থাকে সমর্থন করত, নিয়ম তৈরি করত এবং সে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত, যা এ ব্যবস্থাকে সচল রেখেছিল। কিন্তু অবশেষে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন একটি টার্নিং পয়েন্টে পৌঁছায়: বিশেষায়নের ওপর চাহিদার সীমাবদ্ধতা এতটাই শিথিল হয় যে ঝুঁকির সীমাবদ্ধতা কার্যকর হতে শুরু করে। কাঠামোগত ব্যাঘাতগুলো আরো প্রকট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত অর্থনীতিগুলো জুড়ে জনগণের হতাশা গভীর হয়, যা একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এরপর ক্রমবর্ধমান জলবায়ু প্রভাব, কভিড-১৯ মহামারী, ইউক্রেন ও গাজার যুদ্ধ এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো ধারাবাহিক ধাক্কা এ পরিবর্তনকে আরো জোরদার করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তন, তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রতি তার আগ্রহ এ পরিবর্তনকে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

এতে অনেক দেশ এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত বলে মনে করে: যদিও বিশেষায়ন অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অক্ষত রয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি আংশিকভাবে উল্টে যাচ্ছে। প্রক্রিয়াটি ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে তা জানা অসম্ভব হলেও উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে বর্ধিত স্থিতিস্থাপকতা ও হ্রাসকৃত ঝুঁকির মূল্য। যেসব দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরির ক্ষমতা কম, মাথাপিছু জিডিপি কম বা জনসংখ্যার আকার ছোট হওয়ার কারণে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে তারা বৈশ্বিক বাজারে কতটা প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে পারে তার ওপর।

তবে স্মিথের বিশেষায়নের মডেলটি সম্ভবত আরো মৌলিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে এটি নির্দিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতার পকেট তৈরির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, যা সহজে অর্জন বা স্থানান্তর করা যায় না। কিন্তু জেনারেটিভ এআই মডেলগুলো তাদের অন্যান্য অনেক প্রভাবের মধ্যে, এখন প্রায় যেকোনো ক্ষেত্রে যে কেউ চাইলে খুব কম খরচে দক্ষতা সরবরাহ করার পথে রয়েছে।

এর সম্ভাব্য পরিণতি সুদূরপ্রসারী। যদি দক্ষতা কম দুর্লভ হয়ে যায়, তবে তার মূল্য কমে যাবে। কেবল সে জ্ঞান ও দক্ষতাগুলোর মূল্য বাড়বে, যা স্থানান্তর করা কঠিন, যেমন যা সহজে বর্ণনা বা নথিভুক্ত করা যায় না। অন্য কথায় মানব পুঁজির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মূল্য ভবিষ্যতে এক পর্যায়ে গত ২৫০ বছরের তুলনায় খুব বেশি নাও থাকতে পারে, কিন্তু অন্য একটি অংশের মূল্য অনেক বেশি হতে পারে। এখন যে প্রশ্নটি তদন্ত করা প্রয়োজন তা হলো এ প্রতিটি অংশের আকার কত বড় হবে।

স্মিথ বিশেষায়নের ধারণাটি প্রবর্তনের প্রায় ২৫০ বছর পর এটি আমাদের অর্থনীতির একটি মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে। কিন্তু এটিও গভীরভাবে পরিবর্তন হয়েছে। আন্তঃনির্ভরতার অনুভূত ঝুঁকি বাড়ার কারণে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আংশিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্ভবত বিশেষায়নকে কমাবে না, তবে জ্ঞান স্থানান্তর সমীকরণ পরিবর্তন করে এটি বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত মানব পুঁজির আপেক্ষিক মূল্য পরিবর্তন করতে পারে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

মাইকেল স্পেন্স: অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্নাতক স্কুল অব বিজনেসের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সাবেক ডিন। ‘পার্মাক্রাইসিস: আ প্ল্যান টু ফিক্স আ ফ্র্যাকচার্ড ওয়ার্ল্ড’ (সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, ২০২৩) বইটির সহলেখক (মোহাম্মদ এ এল-এরিয়ান, গর্ডন ব্রাউন এবং রিড লিডোসহ)

আরও