বিশ্ব খাদ্য দিবস

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিয়ে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাপনা টেকসই করতে হবে

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবার দিবসটি এমন এক সংকটাপন্ন অথচ সম্ভাবনাময় মুহূর্তে পালন হচ্ছে যখন জলবায়ু সংকট, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োটেকনোলজির উদ্ভাবন বৈশ্বিক কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি।"এর দর্শন হলো গবেষণায় ধারাবাহিক ও অর্থবহ বিনিয়োগই নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, আধুনিক বাজার সুসংহতকরণ এবং উদীয়মান বৈশ্বিক সংকট নিরসনের মূল চাবিকাঠি। ফলে প্রতিপাদ্যটি কেবল কোনো আকর্ষণীয় স্লোগান নয়, বরং খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও বিতরণ ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। এখানে ‘‌উদ্ভাবন’ কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল টাইম ডেটা কিংবা ক্রিসপার জিনোম এডিটিংয়ের মতো উচ্চপ্রযুক্তির গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একদিকে প্রযুক্তির উৎকর্ষ, অন্যদিকে কৃষকের মাঠপর্যায়ের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, সমবায় মডেল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির এক অনন্য মেলবন্ধন।

আজকের এ সময়োপযোগী ও প্রতিরোধমূলক উদ্ভাবনই ভবিষ্যতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস করে একটি স্থিতিশীল, টেকসই ও বৈষম্যহীন কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। তবে এ বৈপ্লবিক রূপান্তর বাস্তবায়নে প্রয়োজন কৃষক, বিজ্ঞানী, তরুণ উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের এক সুদৃঢ় ও সমন্বিত বৈশ্বিক অঙ্গীকার।

বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার বর্তমান চিত্র ও জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক ‘স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদন বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র উন্মোচন করেছে। বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে সামান্য অগ্রগতি দেখা গেলেও দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও খাদ্যাভাব এখনো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নেয়ায় দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোর নিত্যদিনের খাদ্যতালিকা থেকে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দ্রুত বাদ পড়ে যাচ্ছে। এ অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রচ্ছন্ন অথচ তীব্র ধ্বংসাত্মক প্রভাব।

জলবায়ু সংকট ও বৈশ্বিক খাদ্যাভাবের দ্বিমুখী অভিঘাত মোকাবেলায় বৈশ্বিক কৃষি আজ এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত হলো ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বা অগ্রগামী প্রযুক্তির গবেষণায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছেন যে কৃষকদের চিরাচরিত ও প্রথাগত অভিযোজন কৌশল—যেমন সেচের সময়সূচি বা সারের মাত্রা কিছুটা পরিবর্তন করা—দিয়ে এ প্রলয়ংকরী ধাক্কা আর সামাল দেয়া সম্ভব নয়। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের বর্তমান ধারা অপরিবর্তিত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক খাদ্যশস্য উৎপাদন ৮ শতাংশ এবং ২১০০ সালের মধ্যে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়তে পারে। তাছাড়া চরম আবহাওয়ার কারণে একদিকে মাটিতে ফসলের বন্ধু উপকারী অণুজীবের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে ‘‌গমের ব্লাস্ট’-এর মতো বিধ্বংসী ছত্রাক ও ক্ষতিকর বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সামগ্রিক কৃষি বাস্তুতন্ত্রকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপ্লব: স্মার্ট ও ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি

জলবায়ু সংকট ও বৈশ্বিক খাদ্যাভাবের দ্বিমুখী অভিঘাত মোকাবেলায় বৈশ্বিক কৃষি আজ এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত হলো ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বা অগ্রগামী প্রযুক্তির গবেষণায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। ক্রিসপার জিনোম এডিটিং, ন্যানোটেকনোলজি, ইন্টারনেট অব থিংস (আওটি) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগুলোকে বাংলাদেশের জলবায়ু-সংকটময় কৃষি বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দেশীয় গবেষণায় গতি আনতে হবে।

কৃষি ব্যবস্থার সুরক্ষায় এ আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর ভূমিকা বহুমুখী। জমিতে স্থাপিত আইওটি সেন্সর, ড্রোন ও স্যাটেলাইট ডেটা এআই দ্বারা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টির ঘাটতি এবং রোগের নিখুঁত পূর্বাভাস মিলছে রিয়েল টাইমে। এ ‘‌প্রিসিশন ফার্মিং’-এর ফলে সেচের পানি ৫০ শতাংশ এবং সারের ব্যবহার ২০ শতাংশ কমিয়েও ফলন প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ন্যানো-কৃষি; ন্যানো-সার ও ন্যানো-বালাইনাশকের মাধ্যমে উদ্ভিদের কোষে সরাসরি পুষ্টি পৌঁছানো যাচ্ছে, যা পরিবেশের ক্ষতি না করেই ফসলের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বহুগুণ বাড়ায়। পাশাপাশি আণবিক বিজ্ঞানের 'ক্রিসপার জিনোম এডিটিং' প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রথাগত ১০-১২ বছরের গবেষণা মাত্র দুই থেকে তিন বছরে নামিয়ে এনে খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল শস্য উদ্ভাবন সম্ভব হচ্ছে। আর সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে ‘উল্লম্ব কৃষি’ ৯০ শতাংশ কম পানিতে বহুগুণ বেশি ফলন নিশ্চিত করছে।

তবে প্রযুক্তি দিয়ে মাঠে সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত করার পরও উদ্ভাবনের সমীকরণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি না উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি হ্রাস এবং এগ্রো-লজিস্টিকসের আমূল আধুনিকায়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়। যথাযথ প্রক্রিয়াজাত, কোল্ড চেইন প্রযুক্তি ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর আমাদের উৎপাদিত ফল, শাকসবজি, মাছ ও দুধের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়, যা কৃষককে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাই মাঠ পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন, ট্র্যাকিং-ভিত্তিক স্মার্ট সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ডিজিটাল বাজার সংযোগে কৌশলগত বিনিয়োগ অত্যন্ত আবশ্যক।

সংক্ষেপে, ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির সমন্বিত গবেষণা, জলবায়ু-সহনশীল শস্য উদ্ভাবন এবং আধুনিক এগ্রো-লজিস্টিকসের সুসংহত প্রয়োগই পারে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও লাভজনক কৃষি ব্যবস্থা উপহার দিতে। উচ্চপ্রযুক্তির উদ্ভাবন যখন গবেষণাগার থেকে প্রান্তিক কৃষকের মাঠ হয়ে দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের পাতে পৌঁছাবে, তখনই ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষির সুফল পূর্ণতা পাবে।

খাদ্যনিরাপত্তায় সাফল্য, পুষ্টিতে নতুন চ্যালেঞ্জ ও নতুন পথরেখা

গত পাঁচ দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধান ও সবজি উৎপাদনে অভূতপূর্ব অগ্রগতির পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বমঞ্চে এক মহাকাব্যিক রূপান্তরের গল্প। কিন্তু উৎপাদনে এ বৈপ্লবিক সাফল্য সত্ত্বেও আমাদের দিতে হয়েছে চড়া পরিবেশগত মাশুল। অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ও অতি নিবিড় একমুখী চাষাবাদে মাটির স্বাভাবিক প্রাণশক্তি হ্রাস পেয়েছে, নিচে নেমেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং দানাদার শস্যের ফলন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে স্থবির হয়ে পড়েছে। তার ওপর দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী অভিঘাতে একদিকে উর্বর আবাদি জমি বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতি বছর জাতীয় পরিসংখ্যানে যোগ হওয়া প্রায় ২০ লাখ অতিরিক্ত মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির সংস্থান করতে হচ্ছে।

তবে বর্তমান যুগে আমাদের প্রধান সংকটটি কেবল চাল বা খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মূল বৈশ্বিক ও জাতীয় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে সার্বিক পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনে। কারণ কেবল চালনির্ভর শর্করা বা ক্যালোরি গ্রহণ মানবদেহের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে না; শারীরিক গঠন ও মেধা বিকাশে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন ও অণুপুষ্টির সঠিক উপস্থিতি আবশ্যক। কিন্তু বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের মতো অত্যাবশ্যকীয় উপাদান দরিদ্র পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় শিশু, কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে প্রোটিন ও অণুপুষ্টির ঘাটতি প্রকট রূপ নিচ্ছে।

এ জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের কৃষিভাবনায় এক রূপান্তরকামী পরিবর্তন আনা জরুরি। সাফল্যের মাপকাঠিকে কেবল 'মাঠে কত টন শস্য উৎপাদন হলো'—তাতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। খাদ্যশস্যের অগ্রগতি ধরে রাখার পাশাপাশি প্রোটিন ও প্রাণিজ পুষ্টির বৈশ্বিক মানদণ্ড অর্জনে মৎস্য, পোলট্রি ও গবাদিপশু খাতের টেকসই উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। আধুনিক ক্লাইমেট-স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার, ভাসমান মাছ চাষ, রোগপ্রতিরোধী পোলট্রি ও গবাদিপশুর উচ্চফলনশীল জাত প্রজনন, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত সুষম ফিড এবং বায়ো-সিকিউরিটি নিশ্চিতের মাধ্যমে মাছ, ডিম, দুধ ও মাংসের যৌথ উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে।

একটি ক্ষুধা ও অপুষ্টিমুক্ত টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে শস্যকৃষি, মৎস্যসম্পদ, প্রাণিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে এক সুতোয় গেঁথে এক সমন্বিত নীতি ও পথরেখায় হাঁটতে হবে। গবেষণাগার থেকে শুরু করে খামার ও পুকুরপাড়ের প্রতিটি উদ্ভাবন যেন বিষমুক্ত, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাবার হয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের পাতে পৌঁছায়—তা সুনিশ্চিত করাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।

গবেষণাগার থেকে কৃষকের মাঠে

গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও শস্যের আধুনিক জাত তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সাশ্রয়ী মূল্যে প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছায় এবং কৃষিকে একটি লাভজনক ও টেকসই পেশায় রূপান্তর করে। কৃষি উৎপাদনকে লাভজনক করতে উন্নত বীজ, সুষম সার, সেচ ব্যবস্থা এবং বালাইনাশকের মতো মৌলিক কৃষি উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী সরবরাহ সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি এককভাবে কেনা সম্ভব নয়; তাই কৃষক সমবায়, যন্ত্র ভাড়া কেন্দ্র, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বিআরআরআই, বিএআরআই ও বিনার মতো গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলা দরকার। ল্যাবরেটরির উদ্ভাবন, স্থানোপযোগী প্রযুক্তি ও কৃষি উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, কৃষকের ন্যায্য মুনাফা অর্জিত হবে এবং গবেষণাগার থেকে কৃষকের মাঠের ব্যবধান ঘুচে যাবে।

উৎপাদনের পর খাদ্য সংরক্ষণ ও অপচয় রোধ

বাংলাদেশী কৃষির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো ফসল কাটার পরবর্তী অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি। যথাযথ প্রক্রিয়াজাত, আধুনিক সংরক্ষণ ও সঠিক পরিবহনের অভাবে ফল, শাকসবজি, মাছ ও দুধের মতো পচনশীল খাদ্যের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়; যার মাশুল দেন কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই।

এ অপচয় রোধে যৌথ ব্যবহারের কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক প্যাকেজিং এবং রেফ্রিজারেটেড পরিবহনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি ডিজিটাল বাজার প্লাটফর্ম কৃষকের সঙ্গে ক্রেতার সরাসরি সংযোগ ঘটিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস করবে। উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, শ্রম ও জ্বালানির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে টেকসই অর্থনীতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় মাঠ থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্য অপচয় রোধ করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

প্রযুক্তির সঙ্গে পুষ্টির সংযোগ

বাংলাদেশের কৃষি রূপান্তরের কেন্দ্রে পুষ্টিকে স্থান দেয়া জরুরি। চালের সাফল্য ধরে রেখে ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল, ডিম ও দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষি গবেষণায় 'বায়ো-ফর্টিফিকেশন'কে প্রাধান্য দিয়ে আয়রন, জিংক ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ উচ্চমানের জাত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন।

তবে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। পুষ্টিকর খাদ্যকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি স্কুলের পুষ্টি শিক্ষা ও মাতৃ-শিশু কর্মসূচির সঙ্গে কৃষিনীতির সরাসরি সমন্বয় করা দরকার। সর্বোপরি, খেত থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুমুক্ত নিরাপদ খাদ্য সুনিশ্চিত করতে মান নিয়ন্ত্রণ, ল্যাব নজরদারি ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ আমাদের পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্ষুধা ও অপুষ্টিমুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা কেবল কোনো করুণা বা দয়ার দান নয়; এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুবিচারের মূল স্তম্ভ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এআই ও জিনোম এডিটিংয়ের মতো আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের হাতে নতুন শক্তি জোগালেও এর পূর্ণ সুফল পেতে দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং কৃষক থেকে নীতিনির্ধারকদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী বাস্তবতায় আমাদের এমন এক বৈষম্যহীন কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, ভোক্তা সাশ্রয়ী দামে পুষ্টিকর খাদ্য কিনতে পারবেন এবং উৎপাদন থাকবে নিরবচ্ছিন্ন। বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রকৃত আহ্বান কেবল নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ নয়, বরং বিজ্ঞান ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে ভঙ্গুর খাদ্য ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। বিজ্ঞানাগারের উদ্ভাবন যখন প্রান্তিক কৃষকের মাঠ হয়ে প্রতিটি মানুষের পাতে পৌঁছাবে, তখনই সার্থক হবে 'আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি'। আজ আমরা যে সুদৃঢ় বুনিয়াদ গড়ে তুলব, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী প্রজন্মের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি।

ড. তোফাজ্জল ইসলাম: অধ্যাপক ও ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ; প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও