অভিমত

কেবল নাম লিখতে জানলেই সাক্ষর?

গ্রামের এক সরলা বধূ, দিন কয়েক পর পরই স্বামীর নামে চিঠি আসে। নিরক্ষর হওয়ায় ওই নারী নিজে তা পড়তে পারেন না। স্বামী সেই চিঠি পড়ে স্ত্রীর কাছেই নির্ভয়ে রেখে দেন। জানতে চাইলে স্বামী বলেন, ‘মালিকের মামলা-মোকদ্দমাসংক্রান্ত উকিলের চিঠি। মালিক লেখাপড়া জানে না বলেই তার চিঠি আমার কাছে আসে!’ কথাটি স্ত্রীর মনে ঠিক সত্যি বলে মনে হয় না, সন্দেহ জাগে। পণ করেন পড়ালেখা শিখে চিঠির সত্য-মিথ্যা জানবেন। স্বামীর অজান্তে

গ্রামের এক সরলা বধূ, দিন কয়েক পর পরই স্বামীর নামে চিঠি আসে। নিরক্ষর হওয়ায় ওই নারী নিজে তা পড়তে পারেন না। স্বামী সেই চিঠি পড়ে স্ত্রীর কাছেই নির্ভয়ে রেখে দেন। জানতে চাইলে স্বামী বলেন, ‘মালিকের মামলা-মোকদ্দমাসংক্রান্ত উকিলের চিঠি। মালিক লেখাপড়া জানে না বলেই তার চিঠি আমার কাছে আসে!’ কথাটি স্ত্রীর মনে ঠিক সত্যি বলে মনে হয় না, সন্দেহ জাগে। পণ করেন পড়ালেখা শিখে চিঠির সত্য-মিথ্যা জানবেন। স্বামীর অজান্তে গ্রামের স্কুল শিক্ষিকার কাছে লেখাপড়া শিখে জানতে পারেন, চিঠির সবই প্রেমপত্র, স্বামীর প্রেমিকার লেখা!

মোরাল অব দ্য স্টোরি—নিরক্ষর মানুষকে পদে পদেই ঠকতে হয়; হোক সে ঘর, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র। একটি দেশ তথা রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে তার জনগণের বিচার-বিশ্লেষণক্ষমতা ও দক্ষতার ওপর। তবে শিক্ষিত না হলে বিচার-বিশ্লেষণক্ষমতা গড়ে ওঠে না। কথায় আছে, নিরক্ষর মানুষ চোখ থাকতেও অন্ধ। সমাজ কিংবা দেশের কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে তারা সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম। বিশ্বের অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর তিন-চতুর্থাংশেরই বাস জনবহুল ১৫টি দেশে। আফ্রিকার অনেক দেশে আমরা অনবরত সংঘাত, অস্থিতিশীলতা দেখতে পাই। ওসব দেশে সাক্ষরতার হারও কিন্তু অনেক কম। 

‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব’—দিগ্বিজয়ী নেপোলিয়ন বোনাপার্টের একটি উক্তিই দেশ গঠনে শিক্ষার গুরুত্বটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। নীতিনিষ্ঠ সুস্থ সমাজ গড়ার পাশাপাশি উন্নয়নকে অর্থবহ করতে এর কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষিত মানুষই কেবল জানেন তার সামাজিক-রাজনৈতিক মৌলিক অধিকার কী কী এবং কীভাবে তা রক্ষা করা সম্ভব। জবাবদিহির শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও চাই শিক্ষা। 

এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে সাক্ষরতার কী অবস্থা? ও সেটা? ভালো ভালো! দেশী-বিদেশী কিছু প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশে সাক্ষরতাকে শিক্ষার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেই আমরা বেশ খুশি! আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে হিসাব করতেও বসে যাই বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান। আগের বছরের তুলনায় এক কী দুই ধাপ এগোলেই পরিতৃপ্তির ঢেকুর। অথচ কাগজে-কলমে যাদেরকে সাক্ষর বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের সিংহভাগেরই এখনো সেই টিপসই ভরসা! অনেকে আবার নিজের নামটা কোনো রকমে লিখতে পারলেও, ‘অ’ ‘আ’ ‘ক’ ‘খ’—যেন কেবলই ছবি। অর্থাৎ অক্ষর পড়ার ক্ষেত্রে তারা ‘চোখ থাকিতেও অন্ধ’।

একসময় কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে এর জন্য অন্তত তিনটি শর্ত মানতে হয়—নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে, লিখতে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ কষতে পারা। প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত এ সংজ্ঞা ব্যবহার করলে দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি লোকই বাদ পড়বে সাক্ষরতার তালিকা থেকে। যদিও সরকারের হিসাবে এ দেশে সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর সঙ্গে অবশ্য সম্পৃক্ত দ্বিবিধ ছলনা—ইউনেস্কো নির্ধারিত সংজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া এবং পরিসংখ্যানে পানি মেশানো, মানে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো। কালে কালে যা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রচার কার্যক্রম। ক্ষমতায় যারা থাকেন, তারা ‘নিরক্ষর’দের অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন করে তোলায় বিপুল সাফল্যের কথা জোর গলায় বলেন। আরেক পক্ষের চোখে কেবল অজ্ঞানতার অন্ধকার। ৮ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এলেই উঠে আসে বিষয়টি। প্রতি বছর ১-২ শতাংশ হার বাড়িয়ে সরকারি প্রচারণাকে অন্তঃসারশূন্য দাবি করেন কেউ কেউ। কারোবা দাবি—বিষয়টিতে শুভঙ্করের ফাঁকি থাকে বিস্তর। অনেকে আবার এর মধ্যে খুঁজে পান ‘শিক্ষা-বাণিজ্য’, বয়স্কদের শিক্ষাদানের নামে বিশেষ মহলের দেশ-বিদেশের অর্থ সংগ্রহের ধুম। তাতে কাজের কাজ তেমন না হলেও ঠিকই কপাল খুলে যায় সংশ্লিষ্টদের। শিক্ষাবিদরা তাই বলে থাকেন, প্রকৃত নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করতে যে ধরনের কার্যক্রম দরকার, গত দুই দশকে তা নেয়া হয়নি। এর পরও সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির পেছনে নিরক্ষরতা দূর করার কর্মসূচির কোনো অবদান নেই। গোটা অবদানই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার। 

যিনি পড়তে পারেন, অনুধাবন করতে পারেন, মৌখিক ও লিখিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা, যোগাযোগ স্থাপন ও গণনা করতে পারেন তাকে প্রায়োগিক সাক্ষরতার আওতায় হিসাব করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, এ মানদণ্ডে দেশে ১১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা ২০১১ সালে ছিল ৫৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। অবশ্য ১৫ বছরের ঊর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রায়োগিক সাক্ষরতার হার মাত্র ৬০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

সাক্ষরতা ও শিক্ষার হার নিয়ে আছে আবার তাত্ত্বিকতার প্যাঁচ। শিক্ষিত কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়—দেশে শিক্ষার হার কত? সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাক্ষরতার হারকেই তুলে ধরবেন। প্রকৃতপক্ষে বেশির ভাগ মানুষই এ দুইয়ের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন নয়। অথচ শিক্ষা ও সাক্ষরতায় রয়েছে মৌলিক ব্যবধান, অর্থাৎ শিক্ষার পথে সাক্ষরতা একটা ধাপ মাত্র। এডুকেশন ওয়াচের এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, যারা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছে, কিন্তু কোনো কারণে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হতে পারেনি, তাদের ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশই পরবর্তী সময়ে সাক্ষরতার পরীক্ষায় ফেল করে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সাক্ষর হয়েও বাস্তবে তারা নিরক্ষর। সমীক্ষায় এটাও দেখা গেছে যে যাদের অন্ততপক্ষে ছয় থেকে সাত বছর বিদ্যালয়ে পড়ালেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের ৮০ শতাংশই একটি নির্দিষ্ট সময় পর চর্চার অভাবে সাক্ষরতার অবস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। তার মানে, পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করা একজন নির্দিষ্ট একটি সময় পর পড়ালেখা পুরোপুরি ভুলে যাচ্ছে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে সাক্ষরতার যে হার দাবি করা হচ্ছে, সেটির নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু—সে প্রশ্নও তুলেছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ। 

সাক্ষরতার হার নিয়ে বিবিএসের তথ্যে অবশ্য বিভ্রান্তি রয়েছে। মূলত সরকারের এ সংস্থা কোনো লোকের কাছে জানতে চায়—আপনি লিখতে পারেন? ওই ব্যক্তি বলেন, ‘পারি।’ কিন্তু তাকে যদি এক পৃষ্ঠা লিখতে দেয়া হয়, হয়তো পারবেন না। কেবল নিজের নামটাই লিখতে জানেন। অথচ বিবিএস তাকেও সাক্ষরতার আওতায় নিয়ে আসে। আর বেসরকারি জরিপে একজন ব্যক্তি লিখতে ও পড়তে পারে কিনা তা যাচাই করা হয়। এখন প্রশ্ন থেকেই যায়—সরকারিভাবে যাদের সাক্ষর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সবাই কি আসলেই সাক্ষর?

সাক্ষরতার হার বাড়ায় দিন দিন বেড়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও। কিন্তু বাড়েনি শিক্ষার মান। গবেষণা খাতেও রয়ে গেছে ঘাটতি, সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না কারিগরি শিক্ষার। ফলে দেশে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের সংখ্যা কমছে। সেক্ষেত্রে বিদেশ থেকে কর্মী এনে চলছে উন্নয়নযাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টারের’ তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কর্মকর্তারা পারিশ্রমিক হিসেবে ২০০ কোটি ডলারের বেশি নিজেদের দেশে নিয়ে গেছেন। টাকার অংকে হিসাব করলে দাঁড়ায় ১৭ হাজার কোটি টাকার মতো। এসব বিদেশী কর্মকর্তার বেশির ভাগই চীনের। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এবং মেধাবী তরুণদের সম্পৃক্ত করতে আমাদের অদক্ষতা ও সিদ্ধান্তহীনতা, সর্বোপরি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার মাধ্যমেই জাতিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে।’

২০৩০ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। অথচ নিরক্ষরতা দূরের নামে ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নেয়া সব প্রকল্পের ব্যাপারেই আছে নানা অভিযোগ। এমনকি বয়স্ক শিক্ষাকে ঘিরে কোনো প্রকল্পেরই সফলতার ইতিহাস নেই। তাই দাতা সংস্থাগুলোও একসময় মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরপর সরকারই নিজস্ব অর্থে ৪৫ লাখ নিরক্ষরকে মৌলিক সাক্ষরতা ও জীবনদক্ষতা দিতে ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। এটিও শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়ে। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নিরক্ষরতা দূরের কাজ দেয়া হয় ভুঁইফোঁড়, নাম-ঠিকানাবিহীন ও জাল-জালিয়াতির দায়ে চিহ্নিত কিছু এনজিওকে।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, দেশে এখন জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এর মধ্যে সরকারিভাবে সোয়া তিন ও বেসরকারিভাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি লোক নিরক্ষর। এ ব্যাপারে গণসাক্ষরতা অভিযানের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি প্রচেষ্টার বাইরে বিভিন্ন এনজিও দেশে সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে গেলেও তা বেশ ধীরগতিসম্পন্ন, বছরে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। অগ্রগতিটা যদি এ হারে চলতে থাকে তাহলে সাক্ষরতা দক্ষতার প্রাথমিক স্তরে পৌঁছতেই বাংলাদেশের সব নাগরিকের আরো ৪৪ বছর এবং অগ্রসর পর্যায়ে উন্নীত হতে ৭৮ বছর লাগবে।

ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক

আরও