বিশ্ব জ্বালানি সংকট

যখন জ্বালানি অবকাঠামোর মেগা প্রকল্প অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়

একটি মেগা অবকাঠামো প্রকল্প সফল হওয়ার জন্য ধারাবাহিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির প্রয়োজন হয়।

কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে যখন অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তখন প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। সেন্ট্রাল এশিয়া-সাউথ এশিয়া ইলেকট্রিসিটি ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ট্রেড প্রজেক্টের (কাসা-১০০০) ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটেছে বলে মনে হয়।

ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইবিআরডি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের যৌথ অর্থায়নে ২০০৬ সালে কাসা-১০০০ প্রকল্পের সূচনা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সরবরাহ করে সেখানকার বিদ্যুৎ সংকট দূর করা। প্রায় এক দশক পর ১ হাজার ৩৮৭ কিলোমিটার (৮৬২ মাইল) দীর্ঘ এবং ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ শুরু হয়।

কাসা-১০০০ প্রকল্পটিকে একটি জ্বালানি-বাণিজ্য উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও এর পেছনে ছিল আরো ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্য। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি এটি ২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঘোষিত স্বল্পস্থায়ী ‘নিউ সিল্ক রোড’ কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক সংহতি জোরদার করা এবং রাশিয়ার বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কের ওপর মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়াই ছিল এর লক্ষ্য।

এই বিশাল রূপকল্প সত্ত্বেও কাসা-১০০০ প্রকল্প দফায় দফায় বিলম্বিত হয়েছে। ২০২০ সালে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি। ফলে এটি ২০২৭ সালের আগে শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই কিরগিজস্তান এ প্রকল্পে প্রায় ২১ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার সিংহভাগই ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, আইডিবি এবং বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া সহজ শর্তের ঋণ। অন্যদিকে তাজিকিস্তানের ব্যয় ২৫ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দুই দেশকেই আগামী বহু বছর ধরে এ ঋণের বোঝা টেনে যেতে হবে।

অথচ এই বিশাল বিনিয়োগের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি অর্থাৎ রফতানি করার মতো পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ মধ্য এশিয়ায় থাকবে এ ধারণাই এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গত দুই দশকে মধ্য এশিয়া বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের আয়বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর প্রসারের ফলে এই অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

২০০৬ সালে যে উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের হিসাব করা হয়েছিল, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্রাহকরা তা বহু আগেই ভোগ করে ফেলেছেন। বর্তমানে মধ্য এশিয়া প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ অঞ্চলের সরকারগুলোর ধারণা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা আরো ৪০ শতাংশ বাড়বে। ফলে কেবল অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতেই দেশগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।

বিষয়টি মধ্য এশিয়ার সরকারগুলোর নজর এড়ায়নি। তারা এরই মধ্যে তাদের জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশব্যাপী গণভোটের পর কাজাখস্তান তাদের প্রথম বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু করেছে। উজবেকিস্তানও তাদের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মধ্যে দুটি ১ হাজার মেগাওয়াটের রিয়্যাক্টর এবং দুটি স্মল মডিউলার রিয়্যাক্টর থাকবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিরগিজস্তানও তাদের মধ্যমেয়াদি জ্বালানি কৌশলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এগুলোকে ভীষণ আশাবাদী পূর্বাভাস ধরলেও এ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুফল পেতে বহু বছর সময় লেগে যাবে। ফলে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সংকটের কালো ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে, যে অবকাঠামোর একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদেশে রফতানি করা, সেখানে আরো অর্থ ঢালার মতো পরিস্থিতি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর নেই।

বরং কিরগিজস্তান সম্প্রতি কাসা-১০০০ ব্যবস্থাকে বিপরীতভাবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দিয়েছে। শীতের মৌসুমে পাকিস্তান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো সমাধান মিলবে না। পাকিস্তান মূলত আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি ও জ্বালানি তেলনির্ভর তাপবিদ্যুতের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। সেখানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ৮-১০ মার্কিন সেন্ট, যা মধ্য এশিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক বেশি। ভারী ভর্তুকি ছাড়া পাকিস্তান থেকে মধ্য এশিয়ায় বিদ্যুৎ আমদানি করার এ চিন্তা অর্থনৈতিকভাবে একেবারেই অকার্যকর।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং এক ওয়াট বিদ্যুৎও সঞ্চালনের আগেই কাসা-১০০০ প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থ হয়ে গেছে। যে আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করেছে, অর্থায়ন করেছে এবং তদারকি করেছে তাদেরই এখন এর জবাবদিহি করতে হবে।

প্রতিটি বড় বহুপক্ষীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা রয়েছে, যা অসম্পূর্ণ বা সফল-ব্যর্থ যেকোনো প্রকল্প পর্যালোচনার জন্য গঠিত। কাসা-১০০০ প্রকল্পের সেই মূল্যায়ন প্রতিবেদন পুরোপুরি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। চাহিদা সংক্রান্ত কোন পূর্বাভাসগুলো ভুল ছিল, কোন অর্থনৈতিক অনুমানগুলো ব্যর্থ হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনা কীভাবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে এবং এ থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেল এসব বিষয় ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন এটা নয় যে কাসা-১০০০ তার মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে কিনা; উত্তরটি হলো তারা এটি পারেনি এবং পারবেও না। মূল প্রশ্ন হলো, বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প যার অর্থনৈতিক ব্যর্থতা সমাপ্তির বহু আগেই সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট ছিল, তার দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে? যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো এটি স্বীকার করবে যে ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনই অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না, ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকেই এর খেসারত দিয়ে যেতে হবে।

[প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৬ থেকে অনূদিত]

জুমার্ট ওতোর্বায়েভ: কিরগিজস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং সেন্ট্রাল এশিয়া’স ইকোনমিক রিবার্থ ইন দ্য শ্যাডো অব দ্য নিউ গ্রেট গেম গ্রন্থের লেখক

আরও