ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে (২০০৭-০৮) উপদেষ্টা হিসেবে বাণিজ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকাসহ বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থার পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘ সময়। আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি ও বিনিয়োগ কৌশল বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
সরকার ১১ জুন বাজেট পেশ করবে। এ বাজেট নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। কোন বিষয়গুলো এবার অগ্রাধিকার পেতে পারে?
বাজেট প্রণয়নে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ—কোন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার, আর কোন কোন বাধ্যবাধকতা বাজেট তৈরিকে প্রভাবিত করছে। করোনা মহামারীর সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি একটা দীর্ঘ সংকটকাল পার করছে। অনেক কষ্টার্জিত অর্জন থেকে আমরা নানাভাবে পিছিয়ে পড়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সে অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
এবারে বাজেট প্রণয়নে প্রথম বাধ্যবাধকতাটি হলো শুরু থেকেই দুর্বল সূচক নিয়ে সরকারকে এগোতে হচ্ছে। রাজস্বের ঘাটতি এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এ সংকট মোকাবেলায় বাজেটে কী পরিমাণ ভর্তুকি রাখতে হবে, সেটি দ্বিতীয় বাধ্যবাধকতা। আর তৃতীয় বাধ্যবাধকতা হলো নতুন সরকারের নিজস্ব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, যা পূরণের একটি চাপ সবসময়ই থাকে। এ তিনটি বাধ্যবাধকতাকে একত্রে সামলে নতুন সরকারকে এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
আমাদের বাজেটের একটি ধারাবাহিক ব্যর্থতা হলো এটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। বড় সংখ্যার বাজেট দেখানোর একটা প্রবণতা বরাবরই কাজ করে, যেন সেটা না করলে জনগণকে আশ্বস্ত করা যাবে না। অথচ সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের আকার কোনো বিষয় নয়। তারা দেখতে চায় আয় বাড়ছে কিনা, মজুরি বাড়ছে কিনা, মূল্যস্ফীতির চাপ কতটুকু কমছে, বিভিন্ন খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা ইত্যাদি। আমার প্রত্যাশা হলো এবার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হবে।
চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি এখন প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ ঘাটতির পরও যদি বড় বাজেট দেয়া হয়, তাহলে সেটি যে অনেকাংশে কাগুজে ও কাল্পনিক হবে সেটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। এবার দেখতে চাই, বাজেট কতটা কাগুজে হয়, আর কতটা সত্যিকারের কার্যকরী হয়।
বাজেটের একটি বড় অংশ সরকারের পরিচালন ব্যয়ে চলে যায়। অনেকে সরকারের পরিসর ছোট রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেটি হয়নি। আবার বাজেটের বড় অংশের অর্থায়ন আসে বৈদেশিক ঋণ থেকে। সম্প্রতি আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বাজেটের অর্থায়নে সরকার কী ধরনের জটিলতায় পড়তে পারে?
ঋণ পরিশোধ, সরকার পরিচালন ব্যয় এবং উন্নয়ন খাত—এ তিনটিই আমাদের বাজেট ব্যয়ের বড় অংশ দখল করে থাকে। ঋণ পরিশোধের বোঝা প্রতি বছরই ভারী হচ্ছে। এবার ঋণ ও সুদের পরিমাণ আরো বাড়বে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণে সরকার এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে, আগামীতে আরো নিতে হবে।
পরিচালন ব্যয়ের ভেতরে আরেকটি গল্প লুকিয়ে আছে, সেটি হলো ব্যয়ের অদক্ষতার গল্প। কোথায় আসলে ব্যয় করা দরকার, সেটা বোঝা জরুরি। উদাহরণ দিই—প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতে ৫০ শতাংশ পদ এখনো শূন্য। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলে জনবল নেই, শূন্যপদ পূরণ করা হচ্ছে না অথচ এসব জায়গায় যথাযথ ব্যয় নেই। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব এলেই টাকা বরাদ্দ হয়।
রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন পরিচালনার নিয়মকানুন এতটাই জটিল যে নিয়ম মেনে চলতে গেলে কাজ এগোয় না। পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হয়ে পড়ে। ধামরাইয়ের একটি হেলথ সেন্টারে একবার গিয়েছিলাম, ভবন দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু জনবল সংকটে সেটি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত। একই ছবি সারা দেশের অনেক স্থাপনার ক্ষেত্রে সত্য। পরিচালন ব্যয় কমানো মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য হলো দক্ষ ব্যয়। অনেক ব্যয় আছে যা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, আবার অনেক অপরিহার্য ব্যয় হচ্ছেই না। এ বৈপরীত্য থেকে বেরিয়ে আসাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
জ্বালানি খাতে আমরা আমদানিনির্ভরতার জন্য নিয়মিত ভূরাজনৈতিক সংকটে পড়ছি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এ চাপ আরো বাড়িয়েছে। নতুন সরকারের কাছে এক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রত্যাশা কতটুকু?
এখানে রাতারাতি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এ মুহূর্তে জ্বালানি সংকট একটি বাস্তবতা। এখন মুখ্য করণীয় হলো সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং দেশের অভ্যন্তরে বিতরণ ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা। সংকটের মধ্যেও প্যানিক ও অবৈধ মজুদের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে, এগুলো সামলানোও সমান জরুরি।
এ সংকটকে আমরা সুযোগ হিসেবেও দেখতে পারি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এখনই জোর দেয়া দরকার। আমরা ২০২১-২২ সালে ৪ বিলিয়ন এবং ২০২২-২৩ সালে ৮ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জ্বালানি আমদানি করেছি। এভাবে রিজার্ভের একটি বড় অংশ প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে। আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বার্তা থাকা উচিত।
সৌরশক্তি কীভাবে ব্যবহার হবে, ভূমি ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হবে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য বেসরকারি খাত মুখিয়ে আছে। তারা বিনিয়োগ করতে চায়, কিন্তু নীতির অনিশ্চয়তা তাদের থামিয়ে রেখেছে। বাজেটের একটি অংশ সংখ্যা, আরেকটি অংশ কৌশল। বাজেটের মাধ্যমে সরকার ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে, সেই কৌশলের ইঙ্গিত দেয়া হয়। অভ্যন্তরীণ সব শক্তিকে সেই সংকেত দেয়া হয়। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বাজেটে একটি দৃঢ় ও স্পষ্ট বার্তা থাকা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে জ্বালানি খাতে আমরা নতুন এক দিকে যাত্রা করেছি।
জনমিতিক লভ্যাংশ ব্যবহারের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে। শিক্ষায় জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ এখনো ২ শতাংশের নিচে। এবার কি ভিন্ন কিছু দেখার সুযোগ আছে?
জনমিতিক লভ্যাংশ শুধু বাজেটের ওপর নির্ভরশীল নয়। শিক্ষার গুণগত প্রশ্নটি আরো মৌলিক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোয় ৪০ লাখ বা তারও বেশি শিক্ষার্থী পড়ছেন—তাদের জন্য কতটা মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেছে? সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই।
আমরা অর্থনীতিবিদরাও এক ধরনের সস্তা বয়ানের বাইরে আসতে পারিনি। প্রতিবার বলা হয় বাজেট বাড়াও, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াও, স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়াও। কিন্তু সেই বাড়তি বরাদ্দের পর কী হয়? হাসপাতালে শুধু অবকাঠামো বাড়ে, সেবার মান বাড়ে না। কলেজে ভবন হয়, লাইব্রেরি থাকে শোচনীয় অবস্থায়। কিছুদিন আগে রংপুরের কারমাইকেল কলেজে গিয়েছিলাম। শতবর্ষী এ ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরির যে দুর্দশা দেখলাম, তা হতাশাজনক। সেখান থেকেই একটি প্রস্তাব তৈরি করেছিলাম, পুরনো কলেজগুলোর লাইব্রেরিকে আধুনিকায়ন করা হোক।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাজেটের আকারের পরিবর্তে ব্যয়ের দক্ষতায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। বাজেট ব্যবস্থাপনাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনাও জরুরি। ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তার বাইরে না গেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বলা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের একটি বড় অংশ অব্যয়িত থেকে ফেরত আসছে। এ বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানোর বিষয়ে অনেক পরামর্শ অনেকবার দেয়া হয়েছে। পিপিআরসি ও ইউএইচসি ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা বিস্তারিত প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার অভাব থেকে যাচ্ছে। টিকাদানের অভাবে আমরা এখন হামের উচ্চঝুঁকিতে আছি। করোনা মহামারীর পর নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতে উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় কর্মপরিকল্পনাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের একটি কার্যকর পদ্ধতি ছিল। ২০২৫ সালের পর সেই পদ্ধতি কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে, নতুন পদ্ধতির কাজও এগোয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি। ফলে টিকা কর্মসূচিকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
আমার মূল বক্তব্য হলো স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি। দেশে পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স—অবকাঠামো আছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবা নেই। জনবল ঘাটতি আছে, শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেই। নতুন বরাদ্দ না এনে পূর্ববর্তী বাজেট থেকে অব্যয়িত যে অর্থ ফেরত যাচ্ছে, সেটি দিয়েই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে পুনর্গঠন করা সম্ভব।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানে শুধু প্যারাসিটামল বিতরণ নয়, এখানে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো দরকার—শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা একটি আইনের খসড়া তৈরি করে দিয়েছিলাম। বিদ্যমান অবকাঠামো ঠিক রেখে কিছু গুণগত পরিবর্তন আনলে সামান্য বাজেটেই স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানো সম্ভব। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিবর্তিত হলো, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এল—তার পরও এ সচেতনতার পথে বাধাটা কোথায়? এ প্রশ্ন করা জরুরি।
বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় অপরিহার্য। কিন্তু প্রতি বছরই রাজস্ব ঘাটতি থাকে। এনবিআরের সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু অগ্রগতি সীমিত। কর-জিডিপির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ কী হতে পারে?
সরকার এনবিআর সংস্কারের প্রশ্নে পিছু হটছে—এটি একটি উদ্বেগজনক লক্ষণ। আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে। অথচ সাধারণ মানুষ বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি কর দিচ্ছেন। সেই অর্থ রাজস্ব হিসেবে খাতায় জমা হচ্ছে না। কর ব্যবস্থাপনায় একটি চরম স্বেচ্ছাচারিতার চর্চা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেকের মধ্যেই নিয়মবহির্ভূতভাবে ক্ষমতার চর্চা রয়েছে। পরিচিত ব্যবসায়ীদের নানাভাবে করছাড় দেয়া হয়, বিভিন্ন সুযোগ করে দেয়া হয়। আইন সব করদাতার জন্য সমান বলা হলেও বাস্তবটা উল্টো। নতুন সংসদে এনবিআর বিভাজনের বিল পাস হয়নি। পরিবর্তে নতুন কোনো প্রস্তাব আসবে কিনা, সেটা দেখার অপেক্ষায় রয়েছি। তবে এটুকু স্পষ্ট, রাজস্ব আহরণের এ ঘাটতি সরকারের সব ধরনের উচ্চাভিলাষকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। টাকা না থাকলে কাজ হয় কীভাবে?
নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে কর্মসংস্থান বাড়ানো বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী বাজেট কীভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে?
বিনিয়োগকারীদের হাতে পুঁজি আছে, কিন্তু তারা বিনিয়োগ করছেন না। এর প্রধান কারণ হলো আইনকানুনের জটিলতা এবং নীতির অনিশ্চয়তা। প্রতিটি সরকারেরই নিজস্ব পছন্দের প্রকল্পের দিকে ঝুঁকে থাকার একটি প্রবণতা থাকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনায় বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করেছিল—ফলাফল কী হয়েছে, তা সবার জানা। বড়জোর চার-পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হয়েছে।
কর্মসংস্থানের সংকট ক্রমেই মহাসংকটে রূপ নিচ্ছে। সরকার সম্প্রতি এক কোটি লোককে চাকরি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রশ্ন হলো কোথায়, কোন ক্ষেত্রে? এখানে ‘চাকরি’ শব্দটি যথেষ্ট নয়; বলতে হবে ‘অর্থবহ কর্মসংস্থান’। বেকার কাউকে অর্থবহ কাজ না দিয়ে শুধু ‘চাকরি’ দিলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো লাভ হবে না। এর আগে জাতীয় সেবার নামে যে কর্মসূচি চালানো হয়েছিল, সেটা মূলত দলীয় লোকদের মাসিক ভাতার ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। এ ধরনের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়েই পড়ে।
কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে একটু ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। খাতভিত্তিক নিয়োগের পরিকল্পনা জরুরি। কৃষি খাতেই অনেক শূন্যস্থান রয়েছে, সেবা খাতেও সম্ভাবনা প্রচুর। কিন্তু এ খাতগুলোয় এখন নিম্নমানের ও কম সৃষ্টিশীল কাজ হচ্ছে। উৎপাদনশীল ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। শুধু মুদির দোকানের সংখ্যা বাড়লে অর্থনীতির কী লাভ? পরিসংখ্যানই বলছে, দেশে কম উৎপাদনশীল কর্মক্ষেত্রের অংশ বেড়েছে।
এক্ষেত্রে সরকারকে কোন খাতগুলোয় জোর দেয়া উচিত বলে মনে করেন?
সার্বিকভাবে নতুন পুনর্চিন্তা দরকার। বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব সম্ভাবনার মানচিত্র তৈরি করতে হবে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার। প্রতিটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করে সেখানে কোন কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেয়া যায় তা নির্ধারণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। এখানে জোরালো নজর দেয়া জরুরি।
দক্ষতার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ডিগ্রির কাগজ দিয়ে কর্মসংস্থান হয় না। অথচ এ বিষয়কে আমরা দীর্ঘদিন অবহেলা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে একটি সংস্থা আছে, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনকালে সম্ভবত একবারই সেখানে বৈঠক হয়েছে। এর চেয়ে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান আর হয় না।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—এ চারটি প্রতিষ্ঠান পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এদের একটি ক্লাস্টারভিত্তিক সমন্বিত চিন্তার আওতায় আনা যায়। বিদেশের শ্রমবাজারের চরিত্র বিশ্লেষণ করে কর্মীর দক্ষতা বাড়িয়ে সঠিক গন্তব্যে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির বিষয়টাও এখানে অনিবার্য। তাই সব প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।
কর্মসংস্থানের বিষয়ে আমাদের একটি নতুন ও সৃজনশীল চিন্তা হাজির করতে হবে। এর পরিবর্তে লাখ লাখ লোককে কর্মসংস্থান দেয়ার ফাঁকা ঘোষণা শেষ পর্যন্ত কাগুজে বিষয় হয়েই থাকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি মানে চাকরির সংখ্যা বাড়ানো নয়, অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করাই হলো আসল পথ।