আমলাদের বিশেষ সুবিধা ও সরকারের গোপন অভিলাষ

বাংলাদেশের সংবিধানে ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ নামে কোনো বিশেষ শ্রেণীর অস্তিত্ব নেই। সরকারি চাকরির বিধানেও এমন কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। এটি মূলত প্রশাসনিক নীতিমালার মাধ্যমে তৈরি করা একটি আলাদা বর্গ। সরকার নিজেই নির্ধারণ করে দেয় কোন পদগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে এবং কোনগুলো পাবে না। এখানেই চলে আসে নীতিগত প্রশ্ন। কারণ সরকার যখন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণী, পেশা বা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে তখন তা আর কোনো মামুলি বিষয় থাকে না।

কিছুদিন আগে সরকার প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা অর্ধেক করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। রাষ্ট্রের ব্যয় সংকোচন, অপ্রয়োজনীয় সুবিধাদি হ্রাস এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণের উদ্দেশ্যে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারকে তা প্রত্যাহার করতে হয়। সরকার কেন তা করতে বাধ্য হলো এ লেখা সে বিষয়ে নয়। বরং এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো তথাকথিত ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা’ এবং এর আবশ্যিকতা প্রসঙ্গে।

‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ বলতে কী বোঝায়?

‘প্রাধিকার কর্মকর্তা’ শব্দটি দ্বারা ‘বিশেষ অধিকার ভোগ করেন এমন কর্মকর্তাকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন কোনো কর্মকর্তাকে ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত’ ঘোষণা করে, তখন এ ধরনের কর্মকর্তা অন্য সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় অতিরিক্ত সুবিধা ভোগের অধিকার পান। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ নামে কোনো বিশেষ শ্রেণীর অস্তিত্ব নেই। সরকারি চাকরির বিধানেও এমন কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। এটি মূলত প্রশাসনিক নীতিমালার মাধ্যমে তৈরি করা একটি আলাদা বর্গ। সরকার নিজেই নির্ধারণ করে দেয় কোন পদগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে এবং কোনগুলো পাবে না।

এখানেই চলে আসে নীতিগত প্রশ্ন। কারণ সরকার যখন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণী, পেশা বা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে তখন তা আর কোনো মামুলি বিষয় থাকে না। এর মাধ্যমে সরকারের অগ্রাধিকার যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি প্রকাশ পায় সরকারের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং অভিলাষের বিষয়টিও। যেমন সরকার যদি কৃষি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয় তাহলে বিশেষ অর্থ বহন করে। একইভাবে সরকার যদি শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয় তখন এর মাধ্যমে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন প্রকাশ পায়। একইভাবে সরকার যদি কোনো বিশেষ শ্রেণী বা পেশার কর্মচারীকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে চায়, বা দিয়ে থাকে তখন এটি কোনো নিরীহ কিংবা স্বার্থ-নিরপেক্ষ বিষয় থাকে না। বরং সরকারের নীতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও শাসন-দর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি সুবিধা’র পরিপত্রটি জারি করা হয়েছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে। ২০১৪ সালের কলঙ্কিত নির্বাচনের কিছুদিন পর এ পরিপত্র জারি হয়। সেখানে সরকারের যুগ্ম সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তাদের ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে তাদের জন্য গাড়ি ক্রয়ের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা সুদমুক্ত অগ্রিম ঋণ এবং এ গাড়ি পরিচালনার জন্য মাসিক আরো ৪৫ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে এ নীতিমালায় সংশোধনী আনা হয়। এবার যুগ্ম সচিবের পরিবর্তে উপসচিবদেরও এ সুবিধার আওতায় আনা হয়। গাড়ি ঋণের পরিমাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা বাড়ানো হয়।

উপসচিব আমলাতন্ত্রের পঞ্চম গ্রেডের একটি পদ। প্রশাসনের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ডিসি হিসেবে পদায়ন দেয়া হয় এবং নির্বাচনের সময় এরাই বিদ্যমান রীতি অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করে থাকে। ধারণা করা হয়, নির্বাচনকে সামনে রেখে ডিসিদের এমন সুবিধা দেয়ার জন্যই পরিপত্রে সংশোধনী আনা হয়। ডিসিরাও এ ‘প্রাধিকার’-এর ‘মর্যাদা’ দিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত একটি নির্বাচনের আয়োজন করে। এ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মধ্যরাতের নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০২২ সালে এ প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকায় সশস্ত্র বাহিনীর মেজর ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ২০২৪ সালে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ও একই বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

যদিও প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের এ গাড়ি ঋণ সুবিধা প্রদানেরও একটি ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি গাড়ি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই অপচয় ও দুর্নীতির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। সরকারি কাজে বরাদ্দকৃত গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, জ্বালানির অতিরিক্ত বিল, কাল্পনিক মেরামত ব্যয়, অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং সরকারি সম্পদের ব্যক্তিগত ভোগ—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ২০০০ সালে এক অভিনব সুপারিশ দেয়। তাদের সুপারিশ ছিল সরকার নিজে হাজার হাজার গাড়ি কিনে, চালক নিয়োগ দিয়ে, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল ব্যয় বহন করার পরিবর্তে যেসব কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক পরিবহন সুবিধার অধিকারী, তাদের ব্যক্তিগতভাবে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দিতে পারে। পাশাপাশি গাড়ি পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা দেয়া যেতে পারে। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের বিশাল গাড়িবহর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন কমবে, জ্বালানি ও মেরামতের নামে দুর্নীতির সুযোগ হ্রাস পাবে এবং সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। অর্থাৎ কমিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত মালিকানার গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি কমানো এবং ব্যয় সাশ্রয় করা। এটি ছিল প্রশাসনিক সংস্কারের একটি অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রস্তাব। কিন্তু সংস্কার কমিশনের এ সুপারিশকে একপাশে সরিয়ে রেখে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের জন্য সরকারি গাড়ির সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি ঋণ সুবিধা ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা নেয়ার এ অনৈতিক পরিপত্র জারি করে। অর্থাৎ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা একদিকে সরকারি পরিবহন সুবিধা ভোগ করছেন, অন্যদিকে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়ি পরিচালনার জন্য মাসিক নগদ ভাতাও নিচ্ছেন। ফলে যে সংস্কার দুর্নীতি কমানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটিই তাদের কাছে নতুন ধরনের আর্থিক সুবিধার উৎসে পরিণত হয়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি চাকরির অভিন্ন কাঠামোর ভেতরে কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার এ প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ এ বিশেষ সুবিধা দেয়ার নীতিগত কোনো ভিত্তি নেই এবং এ সুবিধা প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতেও দেয়া হয় না। বরং এর পেছনে সরকারের গোপন অভিলাষই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার পেছনে প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাই যে অনেকাংশে দায়ী এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন নীতি নিয়েছে। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারপ্রধানের সঙ্গে বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে সফরসঙ্গীর সংখ্যা কমানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি প্রটোকল কমানো হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর আপ্যায়ন ব্যয়ও অনেকাংশে কমানো হয়েছে। সরকারপ্রধানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সৎ ইচ্ছায়ই এমনটি সম্ভব হয়েছে। একই লক্ষ্য নিয়ে প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিপত্রও বাতিল হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, আমলাদের অসহযোগিতার কারণেই শেষ পর্যন্ত গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা কমানো যায়নি।

পরিপত্র বাতিলের কারণ হিসেবে যে বিষয়টিকে সামনে আনা হয়েছে তাকে অনেকে দেখছেন ‘আমলাতান্ত্রিক প্যাঁচ’ হিসেবে। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যে চিঠি দেয়া হয়েছিল তাতে ‘প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা’ শব্দগুচ্ছ যুক্ত করা হয়েছিল। এ শব্দগুচ্ছকে সচিবালয় নির্দেশিকার পরিপন্থী বলে তা বাতিল করা হয় বলে অনেকে মনে করেন। অনেকের ধারণা, এটি একটি আমলাতান্ত্রিক কূটচাল এবং এ কূটচালের মাধ্যমে পরিপত্রটি বাতিল করা হয়েছে।

সরকারের জন্য আমলাতান্ত্রিক এ কূটচাল বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারপ্রধান বা কোনো মন্ত্রী যখন নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেন তখন তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে সচিবের ওপর। কারণ সচিবই হলেন মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এ ব্যয় সংকোচন নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্বও সচিবালয়েরই। কাজেই অনেকে মনে করেন, আমলাতন্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবে পরিপত্রের মধ্যে এমন শব্দগুচ্ছ জুড়ে দিয়েছে যাতে পরিপত্রটি বাতিল করা যায়। আমলাতন্ত্রের এ কূটচালে শেষ পর্যন্ত সরকারের পিছু হটতে হলো।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের করণীয় কী?

গাড়ি সুবিধা সম্পূর্ণ বাতিল করা সরকারের পক্ষে আর সম্ভব নয়। কোনো সুবিধা দিয়ে তা বাতিল করতে গেলে তাতে অসন্তোষ বাড়তে পারে। তাছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবহন সুবিধা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন পূরণের পদ্ধতি অবশ্যই স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং বৈষম্যহীন হতে হবে। ফলে সরকারকে তথাকথিত ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ নামে অস্পষ্ট ও নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ শ্রেণীবিন্যাসের পরিবর্তে দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও গ্রেডভিত্তিক একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং গ্রেডভিত্তিক সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একই পরিবহন ব্যয়ের জন্য একাধিক উৎস থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। সবশেষে ‘প্রাধিকার’ বা বিশেষ সুবিধা নয়, প্রয়োজন ন্যায়সংগত নীতি। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যায় নয়; বরং তার প্রশাসনিক ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের আস্থায়।

সফিক ইসলাম: শিক্ষক ও লেখক

আরও