জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ অন্যান্য দেশও যখন মার্কিন আগ্রাসনের ঝুঁকিতে

আর সে আগ্রাসনের ঝুঁকিতে শুধু জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোই নয়, বাংলাদেশের মতো জ্বালানি তেলবিহীন দেশও রয়েছে বৈকি!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসংখ্য 'গুণে'র মধ্যে একটি এই যে নিজের আগ্রাসী চিন্তাভাবনার প্রায় কোনোটিই তিনি গোপন করেন না—অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে ও স্থুলতম ভাষায় অকপটে তিনি তা প্রকাশ করে ফেলেন। আর তাতে সুবিধা এই যে ইসরায়েলকে দিয়ে ইরানে আক্রমণ ঘটানোর পর ভেনিজুয়েলাই যে তার প্রাকারান্তরিক লক্ষ্য হবে, সেটি সহজেই বুঝা যাচ্ছিল। এবং এই মুহূর্তে তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বললেও তার শ্যেন দৃষ্টি এখনো কলম্বিয়াসহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিই অধিক নিবদ্ধ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রকাশ্যে ইরানের বিক্ষোভ-প্রতিবাদকে উসকে দেয়ার সর্বসাম্প্রতিক ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর প্রতি সৃষ্ট আদিলোভ ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তার দেশ কখনই পরিত্যাগ করেনি। এমনি প্রেক্ষাপটে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোও এখন ক্রমান্বয়ে অনুরূপ মার্কিন আক্রমণ ও আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আনুষঙ্গিক ঘটনা ও যুক্তির আলোকে বিষয়টিকে খানিকটা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন গত বছরের ৪ জানুয়ারি; এবং দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৪ মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ জুন ইসরায়েলের মাধ্যমে ইরানে এবং দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তির দিনে গত ৪ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ পরিচালনা করে। ট্রাম্পের কার্যকালের এখনো আরো তিন বছর বাকি। ফলে দ্বিতীয় দফা রাজত্বের প্রথম এক বছরের মধ্যেই তিনি যা যা ঘটালেন, তাতে আশঙ্কা যায় যে, তার উম্মত্ততায় আগামী তিন বছর ধরে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের জীবনই হয়তো চরম অশান্তিতে কাটবে। এর মধ্যে হয়তো সবচেয়ে বেশি অশান্তিতে ভুগবে জ্বালানি তেল মজুদ থাকা দেশগুলো। সেদিক থেকে সম্পদবিহীন পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলো এই প্রথমবারের মতো হলেও দীর্ঘকালীন সম্পদহীনতার কারণে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতে পারে। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে সম্পদ-সামর্থ্যে প্রচণ্ডভাবে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ঠিকই অভিন্ন সূত্রের নানা গোপন ও প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ সয়ে যেতে হচ্ছে, যার মধ্যে অপ্রকাশযোগ্য শর্তের আওতাধীন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ অ্যাগ্রিমেন্ট (আরটিএ) অন্যতম। এর বাইরে সামান্য ক'ফোটা লুক্কায়িত গ্যাস ও এক চিলতে বন্দরের জন্যও বাংলাদেশকে নিরন্তর নানা চাপ ও অশান্তি ভোগ করে যেতে হচ্ছে।

জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত অন্যদের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, রাশিয়া, কানাডা, চীন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলানোর মাধ্যমে ইরাকের তেলক্ষেত্র ২০০৬ সালে এবং মুয়ামের গাদ্দাফিকে উৎখাতের মাধ্যমে লিবিয়ার তেলক্ষেত্র ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের করায়ত্তে চলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রবিহীন শেখশাসিত দেশগুলোর রাজা-বাদশারা নিজেদের মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য আরো বহু আগেই নিজেদের তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমি তেলগ্যাস কোম্পানিগুলোর কাছে সোপর্দ করে দিয়েছে।

তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিরকালীন ঘনিষ্ঠ মিত্র ও একান্ত অনুগত ইরানের এককালীন বাদশাহ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীও ১৯৭৯-পূর্ব সময়ে সাভাক নামের গুপ্তবাহিনী ব্যবহার করে মানুষ হত্যার মাধ্যমে সৃষ্ট ভীতিকর পরিবেশের আড়ালে দেশের তেলক্ষেত্রগুলো পশ্চিমিদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনির নেতৃত্বাধীন ইসলামী বিপ্লবের পর এসব তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ করা হয়। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়ার তেলের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে বা নিকট ভবিষ্যতে কখনো মার্কিনি বা পশ্চিমি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ বা সুযোগ নেই।

এদিকে অতি উত্তোলনের কারণে শেখশাসিত দেশগুলোর তেলের মজুদ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইরাক ও লিবিয়ার তেলের প্রায় পুরোটাই সেসব দেশে মার্কিন দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠার পর পর সেখান থেকে উত্তোলন করে নেয়া হয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দরকার জ্বালানি তেলের নতুন নতুন উৎস, যে ক্ষেত্রে একেবারে প্রথম বাছাইতেই ওঠে এসেছে ভেনিজুয়েলার নাম।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ৫৫ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে আসবে। কিন্তু সেটাকেই তিনি তার দেশের জন্য যথেষ্ট ভাববেন কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ এ তেল শুধু তার নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্যই নয়, দেশীয় তেলগ্যাস কোম্পানিগুলোর রফতানি বাড়ানোর জন্যও অত্যাবশ্যকীয়। বস্তুত এ বাণিজ্যিক লাভালাভের জন্যই এ তেল তাদের বেশি প্রয়োজন। কারণ চীন, জাপান, রাশিয়া ও ইউরোপীয় পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রফতানি-সংক্রান্ত প্রবৃদ্ধির হার কিছুতেই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না।

এমতাবস্থায় ভেনিজুয়েলা থেকে ৫৫ শতাংশ তেল সংগ্রহের পরও তাদের আরো তেল প্রয়োজন, যা জোগাড়ের জন্য তারা হয়তো একের পর এক তেলক্ষেত্রধারী অন্য দেশের দিকে ধাবিত হবে, এমনকি স্বল্প মজুদদারি দেশের দিকেও তাদের ঝুঁকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা করতে যেয়ে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অন্য দেশগুলোই হয়তো হবে তাদের পরবর্তী নিশানা।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে ইরান ও ভেনিজুয়েলাসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল উৎপাদকারী দেশগুলোতে ট্রাম্পের উল্লিখিত আক্রমণ ও আগ্রাসনের কারণটি বুঝা গেল (উক্ত আক্রমণ-আগ্রাসনকে সমর্থন করা হচ্ছে না)। কিন্তু যেসব দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নেই, বাংলাদেশের মতো সেসব তেলবিহীন দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যও যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া হয়ে ওঠেছে কেন? এটি কি শুধুই ভূকৌশলগত রাজনীতি? মোটেও না। ১৯৯০-পূর্ব স্নায়ুযুদ্ধের কালে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মূলতই ছিল ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ। কিন্তু এখন তা প্রায় পুরোপুরিই বাণিজ্যিক লাভালাভের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর ভেনিজুয়েলা থেকে আহরিত তেলের যে অংশ উদ্ধৃত থাকবে, সেটি বিক্রির জন্য তার দরকার এখন একচ্ছত্র বাজার, যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উচ্চ জনসংখ্যার দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয়াও তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আর তা করতে যেয়ে কোনো ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আনতে হলে তাতেও তাদের আপত্তি নেই। কারণ আদর্শের চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষাই এখন তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। নইলে গাজা, ইরান, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ইত্যাদি দেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে যা যা করেছে বা এখনো করছে, সেসবের নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করলে যুক্তরাষ্ট্রই হবে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী দেশ। কিন্তু স্বার্থের টানে, উচ্ছিষ্টের লোভে ও বিবেকের তাড়নায় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের মধ্যকার প্রায় কেউই তা সাহস করে বলছেন না।

সেইসঙ্গে আবার রয়েছে এম কে মাচাদো ও অং সান সুকির মতো কিছু স্বার্থলোভী চাটুকারও, যারা একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থের বিনিময়ে নিজেদের দেশকেও বিক্রি করে দিতে রাজি। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মাচাদো ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ পরিচালনার জন্য। তদুপরি মার্কিন বাহিনী তার দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি বলেছেন যে, এবারই তার দেশ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হয়েছে। অন্যদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুকি দেশে ফিরে প্রথমেই ঘোষণা দিয়েছিলেন রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় বলে। আর এরূপ চাটুকার বাংলাদেশের জনগণের জানার পরিধিতে আরো খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা মাচাদোর মতোই নিজের দেশকে অন্যের হাতে তুলে দেয়ার ব্যাপারে অকুণ্ঠিত।

সব মিলিয়ে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে এই যে ট্রাম্পের এরূপ নানা ভয়ংকর আগ্রাসনের মুখে সংশ্লিষ্ট দেশ বা ব্যক্তিই শুধু নন, সারা পৃথিবীর মানুষই এখন প্রচণ্ডভাবে ভীত ও আতঙ্কিত। আরো অনেকের মতোই জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার ও জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, তাদের এসব প্রতিবাদের অধিকাংশই লোকদেখানো। তারা এসব আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানালেও শেষ পর্যন্ত তাদের কেউই ট্রাম্প বা তার নীতিকে রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে বিন্দুমাত্র উদ্যোগী হবেন বলে হচ্ছে না। তাহলে এর প্রাকান্তরিক মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে সামনের দিনগুলোয় বিশেষত আগামী বছরতিনেক জুড়ে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী তৎপরতা ক্রমান্বয়ে আরো জোরদার হবে। আর সে আগ্রাসনের ঝুঁকিতে শুধু জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোই নয়, বাংলাদেশের মতো জ্বালানি তেলবিহীন দেশও রয়েছে বৈকি!

আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়।

আরও