অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল রাখতে এর চালিকাশক্তি হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা বলেছেন, ‘আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে ৭০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে। তবে রমজান মাস লোডশেডিংমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হবে।’ বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ লোডশেডিংয়ের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কলকারখানায় উৎপাদন কমে যায়। ফলে উৎপাদিত সামগ্রীর মূল্য বেড়ে যায়। বাজারে সরবরাহ কম হওয়ায় সংকট দেখা দেয়। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিভিন্ন দোকানপাট, মার্কেট, শপিংমলে ক্রেতার পরিমাণ কমে যায়। যে কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমে আসতে পারে। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসাসেবায়ও চরম অব্যবস্থা দেখা দেয়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে গেলে মুঠোফোনসেবা বিঘ্নিত হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা সম্ভব হয় না। ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। সেখানে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বিকল্প উপায়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রচেষ্টাও একটানা অব্যাহত রাখা যায় না। বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা অর্জনে প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের প্রাথমিক উৎস গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংস্থান করা হয়নি। স্থলভাগ ও সমুদ্র উপকূলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের চেষ্টা না করে এনএনজি আমদানিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। জ্বালানি খাতে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও যদি লোডশেডিং করতে হয়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? ঘন ঘন লোডশেডিং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষত সৃষ্টি করে। তাই অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা দরকার।
দুই বছর ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন শুরু হওয়ায় এ সংকট দেখা দেয়। রমজান শুরু হতে বাকি এক মাসেরও কম। এ সময় সেচ মৌসুমের ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধে বিলম্বের কারণে আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মকালে সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি আমদানি স্বাভাবিক রেখে ও বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা দরকার।
শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি লোডশেডিং হয়। গত বছর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ খুব বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা, তাঁত শিল্প, পোলট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প বন্ধ হওয়ার পথে দাঁড়িয়েছিল। যার সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, সাধারণ কৃষক, খামারি, তাঁতি প্রমুখ ভয়াবহ সংকটে পড়েছিলেন। কারণ এখন বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, জনজীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে বিদ্যুতের সার্বক্ষণিক ব্যবহার, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যুৎনির্ভরতাকে কিছুতেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ প্রাপ্তিকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যাচ্ছে, নয়তো ধীরগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। চলমান লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বাড়ছে দিনে দিনে। দ্রুত এ সংকটের অবসান হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে বিরাজমান সংকটের উত্তরণ ঘটানোর সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। আগামী দিনগুলোয় সংকট আরো ঘনীভূত হলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে ধারণা করা যায়।
গত দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমদানি করা জ্বালানিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা বিদ্যুৎ খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যখন আমদানি কমাতে হয়েছে তখন উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। জ্বালানির জন্য দেশীয় উৎস গ্যাসের অনুসন্ধান ও গ্যাস উত্তোলনে যথাযথ মনোযোগ না দেয়ার বিষয়টি স্পষ্টতই বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনার বড় ত্রুটি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে ভারসাম্য থাকাটা একান্ত জরুরি হলেও এটা রক্ষা করা হয়নি নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে যতটা মাতামাতি হয়েছে, সে তুলনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণে মনোযোগ দেয়া হয়নি। আধুনিকায়নও করা হয়নি, বিদ্যুৎ লাইনের প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা হয়নি। যে কারণে মারাত্মক বিদ্যুৎ সংকটের কবলে পড়তে হবে গোটা দেশকে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নবিষয়ক সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্যানুযায়ী সরকার দেশের সব মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে হবে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এলএনজি, জ্বালানি তেল প্রভৃতির বাজার অস্থিতিশীল। এর দাম দ্রুত ওঠানামা করে। কোনো কারণে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন উদ্যোক্তারা। যদিও বর্তমানে সরকারকে জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করা উচিত ছিল। সেটি না করায় এখন প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাস সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আসায় স্বল্প মূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এটি দেয়া গেছে। এতে স্বল্প মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। অর্থ সংকটসহ নানা কারণে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলএনজি আমদানি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। এ সংকট শিগগিরই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। চাহিদা অনুপাতে এলএনজি আমদানি সম্ভব না হলে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করাও কঠিন হবে। যেহেতু আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান থাকে তাই কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমদানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে যেসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানো উচিত। প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করা গেলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন সময় দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করেছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়নি। জ্বালানি খাতে বিভিন্ন সময়ে উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এসব প্রক্ষেপণ ও পরিকল্পনার বড় অংশজুড়েই ছিল আমদানিনির্ভর জ্বালানি। প্রাথমিক জ্বালানির বিষয়টি নিয়ে একটা পরিপূর্ণ সমাধানে আসা যায়নি। অথচ এর সমাধানও রয়েছে। কিন্তু গোষ্ঠীস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানের পথগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি, যার খেসারত জনগণকে দিতে হচ্ছে।
জ্বালানির আমদানিনির্ভর মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে দেশীয় উৎসনির্ভর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লাসহ অন্যান্য সম্পদ ব্যবহারে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উত্তোলন, উদ্ভাবনের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। প্রচণ্ড দাবদাহের দিনে জনজীবন ও শিল্প-কারখানাকে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি পরিহার করে গ্যাসসম্পদ আহরণের মাধ্যমে এ খাতকে স্বাবলম্বী করতে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেবে সরকার—সেই প্রত্যাশা।