ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের আহ্বানে বাংলা প্রদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম লীগের পক্ষে রায় দেয়। নির্বাচনে ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৪টি লাভ করে মুসলিম লীগ। এ নির্বাচনের ফলাফলকে পাকিস্তানের পক্ষে বঙ্গীয় মুসলমানদের ঐতিহাসিক রায় হিসেবে ধরা হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পূর্ব বাংলার জনগণের অবদান বেশি থাকা সত্ত্বেও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসনক্ষমতা চলে যায় প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। পূর্ব পাকিস্তান থেকেও যারা রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার ছিলেন তারাও বাঙালির স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী ছিলেন না। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রগতিশীল যুব ও ছাত্রনেতারা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ১৯৪৮ সাল থেকেই তত্পর ছিলেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই ছিল প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রথম সোপান। বায়ান্নর পথ ধরে চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, আটান্নর সামরিক শাসন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বাঙালি ঐক্যবদ্ধভাবে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের একচ্ছত্র শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তারই আহ্বানে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলার জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রায় দেয়। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে বিজয়ী হয়। পাকিস্তানের ৩১৫ আসনের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠনের দাবিদার হয়।
কিন্তু কতিপয় পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদের প্ররোচনায় সামরিক সরকার আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয়নি। এর প্রতিবাদে বাঙালি আন্দোলনে নামলে পাকিস্তানি শাসকরা বলপ্রয়োগে তা দমনের চেষ্টা করে। ১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে বহু বাঙালির রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে গণহত্যা শুরু করে। এরই প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র প্রচারিত হয়। তারই আহ্বানে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ।
পাকিস্তানি সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখের নেতৃত্বে ১০ এপ্রিল ভারতের কলকাতায় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার ভবের পাড়ায় (বৈদ্যনাথতলা) আমবাগানে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। শপথ গ্রহণের ওই স্থানটির নাম রাখা হয় মুজিবনগর। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষণা দেন, অস্থায়ী রাজধানী মুজিবনগর থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করা হবে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য ছিলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এএইচএম কামারুজ্জামান। কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সর্বতোভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। ভারতের নিয়মিত সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে আসা ছাত্র-যুবক-জনতাকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞের কারণে ভীত হয়ে প্রায় এক কোটি বাঙালি ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়।
২৬ মার্চ থেকেই সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাঙালি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী অফিসার ও জওয়ান, ইপিআরের সদস্য ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যুদ্ধে অংশ নেন। তারা প্রাথমিক অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও সংগঠিত ও সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে পেরে ওঠা সম্ভব ছিল না। সেজন্য এপ্রিলের মধ্যে তারা ভারতে আশ্রয় নেন এবং ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যান। উপরন্তু দলে দলে বাঙালি ছাত্র, যুবক ও জনতা ভারতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে অংশ নেন। শুধু তা-ই নয়, সর্বস্তরের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা এবং (মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামী ব্যতীত) অন্যান্য দল যেমন—মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), মস্কোপন্থী ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টিও ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে অংশ নেয়।
অস্থায়ী সরকার গঠনের পর কর্নেল (অব.) আতাউল গনি ওসমানীকে জেনারেল পদে উন্নীত করে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয় এবং তার অধীনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যদের ন্যস্ত করা হয়। সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশের রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সেক্টর কমান্ডারদের এলাকা ভাগ করে দেয়া ছাড়াও তিনজন সেক্টর কমান্ডারের নেতৃত্বে তিনটি বাহিনী গঠন করা হয়। যেমন—মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে এস-ফোর্স (৩ নং সেক্টর), মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জেড-ফোর্স (১ নং সেক্টর) এবং মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে কে-ফোর্স (২ নং সেক্টর)। অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডর ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত (সিলেট, হবিগঞ্জ, ৪ নং সেক্টর), মেজর মীর শওকত আলী (৫ নং সেক্টর), উইং কমান্ডার এমকে বাসার (রংপুর ও দিনাজপুরের একাংশ, ৬ নং সেক্টর), কর্নেল নুরুজ্জামান (দিনাজপুরের একাংশ, রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া, ৭ নং সেক্টর), মেজর উসমান চৌধুরী ও পরে মেজর মঞ্জুর (কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনার একাংশ, ৮ নং সেক্টর), মেজর এমএ জলিল (খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ফরিদপুরের একাংশ, ৯ নং সেক্টর), নৌবাহিনীর নৌ-কমান্ডো সমগ্র বাংলাদেশের নদী ও সমুদ্র মেজর আবু তাহের (১১ নং সেক্টর), উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ১১ নং সেক্টর)।
এসব সেক্টর কমান্ডারের অধীনে নিয়মিত প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ ছাত্র, তরুণ, কৃষক, শ্রমিক সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। তাদের বলা হতো মুক্তিবাহিনী। কখনো কখনো মুক্তিবাহিনী দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি, পাহারারত স্থান বা রণাঙ্গনে নিয়োজিত পাকিস্তানি সৈন্যদের গেরিলা কায়দায় আক্রমণ ও হতাহত করে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেত। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেতু, স্থাপনা ইত্যাদি বোমা মেরে ধ্বংস করে দিত। সরকারি নেতাদের ভাষণ, যুদ্ধের খবর প্রচার ও গণসংগীতের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী ও দেশবাসীকে উজ্জীবিত রাখার জন্য ছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। বাংলাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেনি তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, আহার ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করত। গ্রামের পর গ্রামে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সবার সহায়তায় যুদ্ধ করতেন। পাকিস্তানি সরকার বা বাহিনীকে সহায়তাকারীরা ‘দালাল’রূপে চিহ্নিত হয়। তারা ‘শান্তি কমিটি’ ও ‘রাজাকার বাহিনী’ গঠন করে। তবে এদের সংখ্যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের জনগণের তুলনায় অতি নগণ্য। তাদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা কখনো কখনো বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মুক্তি সেনাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের এবং নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা ও ক্ষতি করত এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিত। যাকে সন্দেহ করত, তাকেই হত্যা করত। পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গণহত্যার পাশাপাশি বাঙালি মা-বোনদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করত।
বিদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি দূতাবাসের অনেক বাঙালি অফিসার বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে পাকিস্তানের চাকরি ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক কার্য চালিয়ে যান। তাছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং আমেরিকা ও কানাডায় অবস্থানরত বহু বাঙালি ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী, গবেষক ও অন্যান্য পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু সংসদ সদস্য ও সিনেটর, বুদ্ধিজীবী ও জনগণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেন। এ যুদ্ধ ছিল প্রকৃতই একটি জনযুদ্ধ।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ আরো জোরদার হয় এবং বিপর্যস্ত হতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। নিয়মিত বাহিনীর কর্মকর্তা ও জওয়ানদের নিয়ে ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী গঠিত হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী ২২ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের বিষয়ে একটি বিস্তারিত নির্দেশনাবলি জারি করেন। ২৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধ পরিস্থিতি বর্ণনা করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড সৃষ্টি হয়। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে যৌথ বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়।
২১ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বরের মধ্যে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও বিএসএফের সহায়তায় সীমান্ত অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়টি শক্ত ঘাঁটি দখল করে নেয়। নভেম্বরের শেষার্ধে মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ও দেশের অভ্যন্তরে তাদের আক্রমণ জোরদার করে। এখানে উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, বাতেন বাহিনী প্রমুখ বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনী সক্রিয় হলে উপায়ান্তর না দেখে ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পাকিস্তানের বিমান বাহিনী ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি শহরে বোমা বর্ষণ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেন। ওইদিনই ভারতীয় মিত্রবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই ভারতীয় বিমান বাহিনীর আক্রমণে বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বিমান ও ঘাঁটি অকার্যকর হয়ে যায়। মিত্রবাহিনী দেশের চারদিক থেকে ঢাকা অভিমুখে অভিযান শুরু করে। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানায়। ৪ ডিসেম্বর ভুটান এবং ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারে, যুদ্ধ শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রায় পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তারা সর্বত্র পিছু হটতে থাকে। ৫ ডিসেম্বরের পর থেকে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা মুক্ত হতে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে থাকে। ১২ ডিসেম্বর থেকে বেতারে ও টিভিতে ভারতের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মানেকশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার ঘোষণা দিতে থাকেন। ভারতীয় বিমান বাহিনীর উপর্যুপরি আক্রমণে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তান আর্মি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জেনারেল নিয়াজিকে পাকিস্তানিদের প্রাণ রক্ষার্থে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। ওইদিনই ভারতীয় বিমান বাহিনী ঢাকার গভর্নর হাউজে বোমা বর্ষণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মালেক পদত্যাগ করে রেড ক্রসের নির্ধারিত এলাকায় আশ্রয় নেন। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানি বেসামরিক সরকার ও সামরিক কর্তৃপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয়। ভারতীয় বাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য ১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা থেকে পরের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। মিত্রবাহিনী ১২ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকার চারদিকে উপস্থিত হয়ে ঢাকা অবরোধ করে। পূর্ব থেকে ঢাকায় ও আশপাশে অবস্থানরত গেরিলারা মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। ১৬ ডিসেম্বর সকালে জেনারেল নিয়াজি তার অধীনস্থদের যুদ্ধবিরতির নির্দেশ দেন।
১৪ ডিসেম্বর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্মরণকালের এক নৃশংসতম ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানি সেনাদের মদদপুষ্ট রাজাকার, আলবদর, আল শামস প্রভৃতি বাহিনী দেশের বুদ্ধিজীবী তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাহিত্যিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তারদের ধরে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার প্রয়াস নেয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে হায়েনাদের এমন অপকর্ম তাদের প্রতিহিংসা ও হীনম্মন্যতার চূড়ান্ত প্রকাশ বলে মনে করা হয়।
মিত্রবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও আত্মসমর্পণের সমঝোতার পর ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজিকে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকাল ৪টায় হেলিকপ্টারে করে মিত্রবাহিনীর অধিনায়ক ও ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ঢাকায় পৌঁছালে জেনারেল নিয়াজি ও জেনারেল জ্যাকব তাকে স্বাগত জানান। এস-ফোর্সের অধিনায়ক ও ৩ নং সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিউল্লাহও বিমানবন্দরে জেনারেল আরোরাকে অভ্যর্থনায় উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টায় রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সমরাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজি কয়েক হাজার সেনা অফিসার ও সৈনিকসহ বাংলাদেশে নিয়োজিত সব পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর (প্রায় ৯৩ হাজার) পক্ষে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। মিত্রবাহিনীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আব্দুল করিম খন্দকার, বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর দুটি ইউনিটসহ চার ব্যাটালিয়ন সৈন্য, কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা এবং এক বিশাল হর্সোত্ফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘আমার দেশ, তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ প্রভৃতি স্লোগানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ স্থলে নিয়ে যাওয়ার সময় তার ডান ও বাম পাশে ছিলেন যথাক্রমে জেনারেল অরোরা ও মুক্তিবাহিনীর ২ নং সেক্টরের উপ-কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দার। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের মধ্যেই কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী ঢাকায় পৌঁছেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। তবে সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিউল্লাহ রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন বলে অনেকের মত। যদিও আত্মসমর্পণের ছবিতে তাকে দেখা যায় না। জেনারেল ওসমানী ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমান সিলেটে অবস্থান করছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা বিভিন্ন সময়ে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ঢাকা সেনানিবাসের সৈন্য ও অফিসাররা আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করেন ১৯ ডিসেম্বর।
মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি এবং বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলেও তখনো বাঙালি বিজয়ের আনন্দ পূর্ণরূপে উদযাপন করতে পারছিল না। বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানে কেমন আছেন, কবে ফিরবেন তা নিয়ে সবার মধ্যেই ছিল উত্কণ্ঠা। অবশেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে সেদিন বাঙালি উদযাপন করে প্রকৃত বিজয়ের আনন্দ। সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় এসে বিজয়োল্লাস করে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেয়।
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান; বর্তমানে জার্মানিতে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত