আলোকপাত

পুঁজি পাচার দমনে যত্নশীল হলে অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা রুখে দেয়া যাবে

গত দেড় বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি বহু ধরনের সংকটে নিমজ্জমান। সংকটগুলোর প্রায় প্রতিটিই গুরুতর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিপজ্জনক পতনের ধারা, টাকার হিসাবে ডলারের অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স প্রেরণে গেড়ে বসা হুন্ডি ব্যবসার ক্রমবর্ধমান প্রভাবে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে স্থবিরতা কিংবা পতন, ব্যাপক ডলার সংকটের কারণে আমদানি এলসি খুলতে

গত দেড় বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি বহু ধরনের সংকটে নিমজ্জমান। সংকটগুলোর প্রায় প্রতিটিই গুরুতর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিপজ্জনক পতনের ধারা, টাকার হিসাবে ডলারের অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স প্রেরণে গেড়ে বসা হুন্ডি ব্যবসার ক্রমবর্ধমান প্রভাবে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে স্থবিরতা কিংবা পতন, ব্যাপক ডলার সংকটের কারণে আমদানি এলসি খুলতে অপারগতা, কার্ব মার্কেটে হু হু করে ডলারের দাম বেড়ে ২০২১ সালের ৮৭ টাকা থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ১২৫ টাকায় উল্লম্ফন ও বাংলাদেশী টাকার বৈদেশিক মানের প্রায় ২৭ শতাংশ অবচয়ন, আমদানিতে ওভারইনভয়েসিং ও রফতানিতে আন্ডারইনভয়েসিং পদ্ধতিতে দেশ থেকে বিদেশে ব্যাপক পুঁজি পাচার, হুন্ডি পদ্ধতিতে দেশ থেকে বিদেশে ক্রমবর্ধমান ব্যাংক ঋণ পাচার, খেলাপি ব্যাংক ঋণ সমস্যার বিপজ্জনক অবনতি, রফতানি আয় দেশে ফেরত না এনে সেগুলো দিয়ে বিদেশে ঘরবাড়ি-ব্যবসাপাতি ক্রয়, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বেলাগাম মূল্যস্ফীতির প্রকোপ, দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন সম্পর্কে সরকারের অব্যাহত নিষ্ক্রিয়তা, দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টে গত চার বছর ধারাবাহিক ঘাটতি পরিস্থিতি, ব্যালান্স অব পেমেন্টসের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে বহুদিন পর সৃষ্ট বিপজ্জনক ঘাটতি পরিস্থিতি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, ২০২৩ সালে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি স্তিমিত হওয়ার লক্ষণ—এ সমস্যাগুলোর প্রতিটিই যেকোনো দেশের অর্থমন্ত্রীর ঘুম হারাম করার জন্য বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাছে এ সমস্যাগুলো সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে কুসুমাস্তীর্ণ মনে হচ্ছে! বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এসব সমস্যার অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন, কিন্তু তার বক্তব্যে সমাধানের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো কী হবে তার হদিস পাইনি।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অর্থনীতিকে আবারো স্বস্তিকর অবস্থায় নিয়ে যেতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন এবং পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করতে হবে। এজন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অবিলম্বে কঠোরভাবে হুন্ডি ব্যবস্থাকে দমন। কারণ হুন্ডি পদ্ধতিতে বিদেশে থেকে যাওয়া ডলার বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ক্ষেত্রে চাহিদার প্রধান অংশটাই আসছে দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদ এবং ব্যাংক ঋণ লুটেরাদের পক্ষ থেকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করলেও গত পৌনে পাঁচ বছরে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম একেবারেই ‘বাত কা বাতে’ পর্যবসিত হয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচ বছর দুর্নীতি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্ব র‍্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা অর্জন করেছিল। ওই পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম বছর ক্ষমতাসীন ছিল আওয়ামী লীগ, পরের চার বছর ক্ষমতাসীন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। এরপর সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের শাসনামলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড দমন নীতি বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশ ওই ‘ন্যক্কারজনক চ্যাম্পিয়নশিপ’ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে গত নয় বছর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা অর্জন করে চলেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২২ সালের বিশ্ব র‍্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১২ নম্বর দেশের অবস্থানে রয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ সরকারের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) বরাত দিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল শুধু হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে গড়ে বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। (সিআইডির দাবি ৭৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই আসছে না। অথচ এই পরিমাণ টাকা হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা হয়ে যাচ্ছে)। এর সঙ্গে আমদানির ওভারইনভয়েসিং, রফতানির আন্ডারইনভয়েসিং এবং রফতানি আয় দেশে ফেরত না আনার মতো মূল সমস্যাগুলো যোগ করলে দেখা যাবে প্রতি বছর এখন কমপক্ষে দেড় লাখ কোটি টাকা সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। এর অর্থ বাংলাদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে ১৫/১৬ বিলিয়ন ডলার পুঁজি এখন বিদেশে পাচার হচ্ছে, যার বড় অংশই পাচার হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফের হিসাব মোতবেক ১৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলারেরও কম। এ পতনের ধারা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

বাংলাদেশে কার্ব মার্কেটের ডলারের দামের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক স্বীকৃত হারের ব্যবধান এখনো ৫-৬ টাকা রয়ে গেছে। এই দুই দামের এত বড় পার্থক্য শুধু হুন্ডি ব্যবস্থাকেই চাঙা করছে, ফলে ফর্মাল চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হতে বাধ্য। অর্থমন্ত্রীর মতে, প্রায় অর্ধেক রেমিট্যান্স হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশে আসে। আমার মতে, অধিকাংশ রেমিট্যান্স হুন্ডি ব্যবস্থায় দেশে আসছে। এর মানে, ফরমাল চ্যানেলে প্রতি বছর ২১/২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলেও আরো ২১/২২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বা আরো বেশি অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে! এর বেশির ভাগই ব্যাংকের ঋণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে টালমাটাল অবস্থায় পৌঁছে গেছে সেটার জন্য দায়ী চারটি প্রধান পুঁজি পাচার প্রক্রিয়া: ১. আমদানিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধির আড়ালে ওভারইনভয়েসিং পদ্ধতিতে পুঁজি পাচার, ২. রফতানিতে ব্যাপক আন্ডারইনভয়েসিং পদ্ধতিতে পুঁজি পাচার, ৩. রফতানি আয় দেশে ফেরত না এনে বিদেশে রেখে দিয়ে ওই অর্থ দিয়ে বিদেশে ঘরবাড়ি-ব্যবসাপাতি কেনার হিড়িক এবং ৪. দেশের ব্যাংক ঋণ নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক হুন্ডিওয়ালাদের ব্যাংক ঋণের টাকা প্রদানের মাধ্যমে এর সমপরিমাণ ডলার হুন্ডি প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার। তাই পুঁজি পাচারকে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারে নিয়ে আসতেই হবে। সরকারকে মেনে নিতেই হবে পুঁজি পাচার বর্তমান পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রধানত পুঁজি পাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনের ধারা থামাতে না পারলে ডলারের কার্ব মার্কেটের দামের উল্লম্ফন এবং টাকার বৈদেশিক মানের দ্রুত অবচয়নকে থামানো যাবে না। আর এজন্য প্রয়োজন পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে সরকারের বিশ্বাসযোগ্য কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা। পুঁজি পাচারের চাহিদার প্রধান গ্রাহক হলো দুর্নীতিবাজ আমলা, প্রকৌশলী, লুটেরা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক ঋণ গ্রহীতারা। হুন্ডি প্রক্রিয়ায় যে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার দাবি করছে সরকারের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) তার সিংহভাগ চাহিদাকারী ওপর উল্লিখিত গোষ্ঠীগুলো। অতএব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে ‘বাত্ কা বাত্’ বানিয়ে রেখে পুঁজি পাচার সমস্যার সমাধান পাওয়া অসম্ভব মনে করি। 

একটা খবর আমাদের জন্য পথনির্দেশিকা হতে পারে। গত দেড় বছর বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার একদা সমৃদ্ধ অর্থনীতি শ্রীলংকার ‘মেল্টডাউন’। দেশটির এ দেউলিয়াত্ব ডেকে এনেছে করোনা ভাইরাস মহামারী, উল্টাপাল্টা নানা প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের হিড়িক, হঠাৎ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ করহারকে ১৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামানো এবং রাতারাতি কৃষি খাতে ‘অর্গানিক ফার্মিং’ চালুর জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের দুটো হঠকারী সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সভরেন বন্ডের মাধ্যমে শ্রীলংকা প্রচুর বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ করেছিল, যেগুলোর ম্যাচিউরিটি শুরু হয়েছে ২০২২ সাল থেকে। কিন্তু এখন সুদাসলে ওই বন্ডের অর্থ ফেরত দেয়ার সামর্থ্য শ্রীলংকার নেই। এর পাশাপাশি করোনা মহামারীর কারণে শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত পর্যটন খাতে ধসসহ রফতানি খাতের বিপর্যয় এবং ফর্মাল চ্যানেলে রেমিট্যান্সের ধস শ্রীলংকার অর্থনীতিকে দেউলিয়া করে দিয়েছিল। সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্প্রতি শ্রীলংকার অর্থনীতি বেশ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এই ‘মেল্টডাউন’ থেকে শ্রীলংকা পুরোপুরি নিষ্কৃতি পেতে কত বছর লাগে সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ২০১৯ সালে শ্রীলংকার জনগণের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু চলমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে ২০২০ সাল থেকে প্রায় চার/পাঁচ বছর শ্রীলংকার মাথাপিছু জিডিপি হয়তো আর বেশি বাড়ানো যাবে না। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে টাকার অবচয়নের মতো চলমান সংকট মোকাবেলা করতে হলেও বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপি ও জিএনআইয়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে। বর্তমান ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬-৬ ম দশমিক ৫ শতাংশের মাঝামাঝি থাকবে বলে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রাক্কলন করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি-ব্যয় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, যার প্রধান কারণ ছিল এলএনজি ও তেলসহ পেট্রোলিয়াম প্রডাক্টস, ভোজ্যতেল, চিনি, গম ও সারের নাটকীয় আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি। একই সঙ্গে আমদানি এলসি ওভারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পুঁজি পাচারও এর জন্য দায়ী ছিল। সরকার ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করায় গত এক বছরে এলসি খোলার হার প্রায় ১৬ শতাংশ কমে এসেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ‘এলসি ওভারইনভয়েসিং মনিটরিং’ ব্যবস্থা জোরদার করায় ওভারইনভয়েসিংও খানিকটা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সরকার যদি এ পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন ও পুঁজি পাচারের অন্যান্য পদ্ধতির বিরুদ্ধে কঠোর দমন কার্যক্রম শুরু করে তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যালাপন্স অব পেমেন্টসের সংকট নিরসনের পথে এগিয়ে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কিন্তু দুঃখজনক ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনের ধারাকে থামানো যায়নি। এর প্রধান কারণ হুন্ডি পদ্ধতিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ রেমিট্যান্স প্রেরণের ধারা চাঙা থেকে যাওয়া। ৩০ জুন ২০২৩ শেষ হওয়া ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ফর্মাল চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। নভেম্বর মাসে ফর্মাল চ্যানেলের রেমিট্যান্স আশাপ্রদ বাড়লেও এই ইতিবাচক ধারা টেকসই করা যাবে কিনা সেটা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার বাংলাদেশ পেয়ে গেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনকে শ্লথ করলেও থামাতে পারেনি। ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতেও পারে। আমি মনে করি, শুধু প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে প্রণোদনাকে ৫ শতাংশে উন্নীত করে হুন্ডি ব্যবসাকে দমানো যাবে না। আমার মনে হয়, এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ করার মতো কঠোর দমন ব্যবস্থা নিলে আগামী মাসগুলোয় ফর্মাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করবে। এর পাশাপাশি দেশের শহরগুলোয় কিংবা গ্রামে যেখানেই প্রবাসীদের পরিবার পাকা বাড়ি নির্মাণ করবে তাদের বাড়ির নির্মাণ ব্যয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ ফরমাল চ্যানেলে দেশে আনার ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যাংক-স্টেটমেন্ট’ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে গৃহনির্মাণের পূর্বানুমতির জন্য জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করতে হবে। তাহলে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো বেড়ে যাবে এবং আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার পতনের ধারাও থেমে যাবে ইনশাআল্লাহ। পাশাপাশি আগামী দুই বছর যদি বাংলাদেশ ৬-৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে তাহলে দেশের জনগণের মাথাপিছু জিএনআই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্রীলংকাকে ছুঁয়েও যেতে পারে।         

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও