কিছুদিন আগে আমি পাকিস্তানে একটি কর্মশালায় অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে তাদের বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ—এ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সরকারি বা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় পুরো প্রবৃদ্ধিই এসেছে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগে।
এটি কেন ঘটেছে? কারণ আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে পাকিস্তান বিদ্যুতের ট্যারিফ এমনভাবে বাড়িয়েছে যে মানুষ নিজেরাই বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে। এখানেই ট্যারিফের গুরুত্ব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে তাকালে, বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এটি চালু হলে আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্পিনিং রিজার্ভ বজায় রাখা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কিংবা পিজিসিবির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করলেই জানতে পারবেন, এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতা হলো, পর্যাপ্ত গ্যাস নেই। ফলে প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো বা কমানো খুব সহজ নয়। এ কারণেই আমি বলছি, সরকার যে নীতিই গ্রহণ করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত ‘মানি টকস’। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় যেভাবে কমছে, তাতে সরকার চাক বা না চাক, আজ হোক কিংবা কাল—নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। হয়তো ট্যাক্স দিলে এর গতি কিছুটা কমবে, না দিলে আরো দ্রুত বাড়বে। কিন্তু এটিকে থামানো যাবে না।
সৌরবিদ্যুতের অংশ যত বাড়বে, ততই নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। প্রথমত, এটি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, রাতের বেলায় বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে? তখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যমান জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমিকা কী হবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অথচ দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৩০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। একটি উন্নয়নশীল দেশে কিছু অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু প্রায় ১৮০ শতাংশ অধিক সক্ষমতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এটি মূলত পরিকল্পনাহীন সক্ষমতা বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এখন যদি সৌরবিদ্যুৎ আরো বাড়ে, তাহলে এ অতিরিক্ত সক্ষমতা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—সেটি এখনই ভাবতে হবে।
এখানে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে চাই। বর্তমানে শিল্প-কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে এবং ইডকলের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া গেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৫-৬ টাকা। বাসাবাড়িতে ছোট আকারের রুফটপ সোলার করলে খরচ হয় ৭-৮ টাকা। কিন্তু বড় আকারের জমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০ টাকা। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার কোন ধরনের সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহ দেবে? সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহ দিতে গেলে নীতিনির্ধারকদের সামনে এ প্রশ্ন আসবে রাতের বেলা কী হবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেট মিটারিং। যদি আমরা দ্রুত সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে চাই, তাহলে নেট মিটারিংকে আরো সহজ করতে হবে। বর্তমানে বলা হয়, নেট মিটারিংয়ের জন্য অনুমতি নিতে হবে। অনেকে বলেন, নিয়ম এখন অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যারা এ সেবা নিতে যান, তারা জানেন—এখনো অনেক জটিলতা রয়েছে। আমার মতে, নেট মিটারিং হওয়া উচিত ডিফল্ট ব্যবস্থা। একজন গ্রাহকের দুটি মিটার থাকবে—একটি দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, অন্যটি দিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করবেন। নিজের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসাতে চাইলে তার আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছতে পারিনি।
এখন আসি এনার্জি স্টোরেজ, অর্থাৎ ব্যাটারি প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য ব্যাটারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মেঘলা দিন বা রাতের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। আবার রূপপুর চালু হলে স্পিনিং রিজার্ভের প্রয়োজনও আরো বাড়বে। এ দুই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। আমাদের যদি সুপরিকল্পনা না থাকে তাহলে বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি মনে করছি ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমকে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর স্থাপন ব্যয় কমে আসবে। বর্তমানে ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপনে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৯ টাকা ব্যয় হয়। এর সঙ্গে গ্রিড থেকে চার্জ দেয়ার খরচ যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ২১ টাকা প্রতি ইউনিট। অথচ বর্তমানে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ টাকা ৪০ পয়সা। তাহলে কেউ কেন ব্যাটারি ব্যবহার করবে? এ কারণেই আমি বলছি, ট্যারিফ স্ট্রাকচার পুনর্বিন্যাস এখন অত্যন্ত জরুরি।
যারা শিল্প-কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেন তারা তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন। তারা যদি ৯ টাকার ব্যাটারি বসান এবং ব্যয় হয় ৬ টাকা তাহলে ১৫-১৬ টাকায় ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। ফলে তারা চাইলে ব্যাটারি বসাতে পারেন। কিন্তু তাদের মনে এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—তারা কেন ব্যাটারি বসাবেন? যদি পিকটাইমে ১৬ টাকার চেয়ে কম খরচে তারা বিদ্যুৎ পান তাহলে ওই বিনিয়োগে যাবেন না। সরকারের উচিত, এক্ষেত্রে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পলিসি নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হলে সঠিক মূল্য কাঠামো প্রয়োজন। বৃহৎ আবাসিক ও শিল্প এলাকায় প্রত্যেকেরই ডিজেল জেনারেটর রয়েছে। আমরা কেন সঠিক পলিসি গ্রহণের দিকে যাব না যেখানে ডিজেল জেনারেটরের জায়গায় ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম দাঁড় করানো হবে?
আমার মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুতের ট্যারিফ তিন স্তরের হওয়া উচিত। প্রথমত, পিক আওয়ার—সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা। দ্বিতীয়ত, অফ-পিক—সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। তৃতীয়ত, সুপার অফ-পিক—রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা। ধরুন, পিক আওয়ারে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ২২ টাকা করা হলো, কিন্তু দিনের অন্য সময়ে প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা কমিয়ে দেয়া হলো। এতে গড় ট্যারিফ প্রায় একই থাকবে। এর ফলে কী হবে?
যারা এখন ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করেন, তারা ব্যাটারি ব্যবহারে আগ্রহী হবেন। রাতের সুপার অফ-পিক সময়ে তারা কম দামে ব্যাটারি চার্জ করবেন এবং সন্ধ্যার পিক আওয়ারে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন। এর ফলে দুটি বড় সুবিধা হবে। প্রথমত, রাতের অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে এবং সার্বিক লোড কার্ভ অনেক বেশি সমতল হবে। দ্বিতীয়ত, সন্ধ্যার পিক সময়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এতে সরকারও লাভবান হবে। কারণ পিক আওয়ারে ২৩-২৫ টাকা ব্যয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন কমে যাবে।
ভবিষ্যতে যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যাটারি স্টোরেজ গড়ে তুলবে, তখন বিপিডিবি চাইলে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে জরুরি মুহূর্তে কয়েক মিনিটের জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিনতে পারবে। এতে সরকারকে নিজে বিপুল বিনিয়োগ করে নতুন স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে না; সেই বিনিয়োগ করবে বেসরকারি খাত।
সর্বশেষে একটি বিষয় বলতে চাই। বিভিন্ন প্রযুক্তির উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব শিল্প-কারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে। বাসাবাড়ির রুফটপ সোলারও তুলনামূলক সাশ্রয়ী। বিপরীতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হচ্ছে বড় আকারের জমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, কারণ সেখানে জমি অধিগ্রহণই সবচেয়ে বড় ব্যয়। তাই এখনই নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কোন ধরনের সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিতে চাই। আমার বিশ্বাস, সঠিক ট্যারিফ কাঠামো, সহজ নেট মিটারিং ব্যবস্থা এবং ব্যাটারি স্টোরেজে উপযুক্ত প্রণোদনা দিতে পারলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে আরো স্থিতিশীল, টেকসই এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী করা সম্ভব।
ড. এম রিজওয়ান খান: সাবেক উপাচার্য, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) ও সাবেক চেয়ারম্যান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]