পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সফল পারিবারিক ব্যবসার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রশ্নটি অন্য জায়গায়, বাংলাদেশের পারিবারিক ব্যবসাগুলো কতটা সময়ের সঙ্গে নিজেদের বদলাতে পারছে? উত্তরাধিকার, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য তারা কতটা প্রস্তুত?
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিজনেস স্কুলে পড়ান এমন এক বন্ধুর সঙ্গে একবার আলাপ হচ্ছিল। বাংলাদেশের পারিবারিক ব্যবসা নিয়ে কথা উঠতেই তিনি একের পর এক প্রশ্ন করলেন। দ্বিতীয় প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কী ধরনের বিনিয়োগ করা হয়? উপযুক্ত ব্যক্তিকে সঠিক পদে বসানোর ক্ষেত্রে পরিবারের বাইরে তাকানোর মানসিকতা কতটা আছে? প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কীভাবে যুক্ত করা হয়? উত্তরাধিকার নির্ধারণে লিখিত বা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা কী রয়েছে? অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কতটা আধুনিক? কতগুলো প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত?
প্রশ্নগুলো শুনে মনে হলো দেশের পারিবারিক উদ্যোগে পরিচালিত ব্যবসা নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়া উচিত, ততটা হয়নি। বাংলাদেশে পরিবারভিত্তিক উদ্যোগ থেকেই বহু বড় শিল্পগোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। আবুল খায়ের, আকিজ, প্রাণ, পিএইচপি, টিকে, মেঘনা, সিটি, স্কয়ার, ট্রান্সকম, এসিআই, অ্যাপেক্সসহ অনেক প্রতিষ্ঠান দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও ভোক্তা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এসব গোষ্ঠীর কোনো কোনোটি দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। অর্থাৎ উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের ব্যবসায়ী পরিবারের মধ্যে আছে—এ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
ব্যবসার পরিধি আরো বড় হয়ে ওঠার পর পরিচালনার ধরনও বদলাতে হয়। যে ব্যবস্থাপনা দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান শুরুতে সফল হয়, তা সবসময় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট নয়। একটি ছোট বা মাঝারি পারিবারিক ব্যবসায় মালিকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই হয়তো কার্যকর। কিন্তু ব্যবসা যখন হাজার কোটি টাকার লেনদেন, বিপুলসংখ্যক কর্মী, বহু ব্যাংকের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানেই আসে পেশাদার ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ। পারিবারিক ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মালিকের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা। কিন্তু এ শক্তিকে টেকসই করার জন্য প্রয়োজন যোগ্য পেশাজীবী। পরিবারের সদস্য হলেই যে তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে পরিবারের বাইরের কেউ হলেই তিনি অবিশ্বস্ত, এমন প্রথাগত ধারণাও টেকসই ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের কিছু পারিবারিক ব্যবসায় এখনো পরিবারের বাইরে দক্ষ ব্যবস্থাপক নিয়োগে একধরনের দ্বিধা দেখা যায়। অথচ প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার তরুণ উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের অনেকেই দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছেন। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ তরুণদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে পারিবারিক ব্যবসারই লাভ। মালিকানা পরিবারের হাতে থাকা আর ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তর পরিবারের হাতে রাখা, এ দুটি বিষয় এক নয়, বরং আলাদা।
ব্যবসার উত্তরাধিকার আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন উদ্যোক্তা হয়তো কয়েক দশকের শ্রম, মেধা ও ঝুঁকি নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু তার এ সাফল্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তিনি নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু সম্পদের উত্তরাধিকারী নয়, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল উত্তরসূরি হিসেবেও গড়তে পারবেন।
প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল যোগ্য উত্তরসূরি নির্বাচনে শুধু বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পর্যালোচনাই পর্যাপ্ত নয়। ব্যবসার উত্তরাধিকার মানে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস জানা, কর্মীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা, গ্রাহকের প্রয়োজন বোঝা, ঝুঁকি নেয়া, ব্যর্থতা থেকে শেখা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দায় নেয়া। অনেক পরিবার সন্তানদের ভালো শিক্ষা দেন, কিন্তু ব্যবসার বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত করে তোলেন। ফলে ডিগ্রি থাকলেও বাস্তব ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না।
তৃতীয় প্রজন্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কেউ কেউ বিদেশে উন্নত শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে আধুনিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের ধারণা নিয়ে আসছেন। তারা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন। আবার কোথাও কোথাও দেখা যায়, উত্তরসূরি পূর্বসূরির সম্পদের উত্তরাধিকার পেলেও তার পরিশ্রম, মিতব্যয়িতা, নৈতিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরাধিকার পাননি। অথচ একটি ব্যবসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকে মূলত মূল্যবোধের ধারাবাহিকতায়।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমাদের পারিবারিক ব্যবসার সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি এনেছে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ, মানবসম্পদ, সরবরাহ ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সর্বত্র সমান নয়। আগামী দিনের ব্যবসায় প্রযুক্তি কোনো আলাদা বিভাগ নয়; এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সংস্কৃতির অংশ। তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতাই প্রতিযোগিতায় বড় পার্থক্য তৈরি করবে।
আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও একই ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্যাংক ঋণ ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির সঙ্গে স্বচ্ছ হিসাব, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি বাড়ে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রেও শুধু তালিকাভুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীর অধিকার রক্ষা, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ এবং জবাবদিহি—এগুলোই একটি আধুনিক কোম্পানির পরিচয়।
কর স্বচ্ছতার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক চিত্র এবং কর কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপিত হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে তা শুধু সরকারের রাজস্ব কমায় না, সৎ ব্যবসায়ীদের জন্যও অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে। আইন মেনে কর দেয়া কেবল রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুনামেরও অংশ। ধর্মীয় বা সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি আইনগত দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায় আর সেটি হলো কর্মীদের ভূমিকা। একটি পরিবার ব্যবসার মালিক হতে পারে, কিন্তু একটি বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন বহু মানুষ। তাদের দক্ষতা, নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতার ওপরই প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের সাফল্য নির্ভর করে। তাই কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নেতৃত্ব বিকাশ, মুনাফায় অংশীদারত্ব কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এতে কর্মীরা শুধু চাকরি করবেন না; প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবেও ভাববেন।
বিশ্ববাজারের বাস্তবতাও দ্রুত বদলাচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হতে হলে এখন শুধু কম খরচে পণ্য উৎপাদন করলেই হয় না। শ্রমমান, পরিবেশ, করপোরেট সুশাসন, হিসাবের স্বচ্ছতা, তথ্যনিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও আন্তর্জাতিক ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বাংলাদেশের পারিবারিক ব্যবসাগুলো যদি বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চায়, তবে এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জন ছাড়া বিকল্প নেই। অবশ্যই পরিবর্তনের উদাহরণ আমাদের দেশে আছে। অনেক পারিবারিক ব্যবসা এরই মধ্যে পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিয়েছে, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে, নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছে। এসব উদ্যোগ সংগতই প্রত্যাশা জাগায়। কারণ এগুলো দেখায়, পারিবারিক মালিকানা এবং আধুনিক করপোরেট ব্যবস্থাপনা পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং সঠিকভাবে সমন্বয় করা গেলে একে অন্যকে শক্তিশালী করতে পারে।
বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করার কাজ কখনই সহজ ছিল না। ব্রিটিশ আমল তো বটেই, পাকিস্তান আমলেও এ দেশে শক্তিশালী দেশীয় শিল্পভিত্তি ছিল সীমিত। স্বাধীনতার পর যারা নিজ উদ্যোগ, শ্রম, মেধা ও ঝুঁকি নিয়ে শিল্প গড়ে তুলেছেন, তারা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পথিকৃৎ। এখন তাদের সামনে নতুন দায়িত্বও আছে। সেটি হলো নিজেদের চেয়েও যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করা, প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং ব্যবসার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ককে আরো দায়িত্বশীল করে তোলা।
মুনাফা ব্যবসার প্রাণ, কিন্তু মুনাফাই ব্যবসার একমাত্র পরিচালক নয়। একটি পারিবারিক ব্যবসা তখনই সত্যিকার অর্থে সফল, যখন তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে, যোগ্য মানুষকে সুযোগ দেয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় এবং সমাজের আস্থা অর্জন করতে পারে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক ব্যবসাগুলোর কাছে এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক