জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারকে কেবল জোড়াতালি দিয়ে চলা বন্ধ করতে হবে

গোটা বিশ্বে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দুর্বল সংরক্ষণ, সার্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নাজুক এবং রিজার্ভ সংকট বাদেও নানা কারণে দেশ অর্থনৈতিক জটিলতার মুখে পড়েছে। কিন্তু এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা। জ্বালানি কেবল একটি পণ্য নয়, এটি যেকোনো দেশের অর্থনীতির জীবনীশক্তি। কৃষি থেকে শিল্প—সবখানেই এর ব্যবহার ও প্রভাব অপরিসীম। এ সংকট কাটাতে সরকারকে গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে কিছু সাহসী এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রিয় হলেও জরুরি কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও করুণ চিত্র ফুটে উঠছে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন হাজারো মানুষ। বিশেষ করে রাইডশেয়ারিংয়ে যুক্ত কয়েক লাখ বাইকার আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। তাদের উপার্জনের পুরোটাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পগুলোতে তেল দেয়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু করে ভাংচুর ও সহিংসতার খবরও পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার পর তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ চালকদের সঙ্গে পাম্প কর্মীদের সংঘর্ষ বাধছে। এ বিশৃঙ্খল অবস্থা প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। সরকার যদি দ্রুত নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এ ছোট ছোট ক্ষোভের ঘটনা বড় আকারে আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে রূপ নিতে পারে। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়?

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় জরুরি। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী। সরকারকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তেলের দামের নিয়মিত সমন্বয় করতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে একটি অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এটিই এখন সবচেয়ে জরুরি ও সাহসী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় ডিজেলের প্রায় ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে। এদিকে সরকার এখন ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম কম রাখলেও এর সুফল সাধারণ মানুষ কতটুকু পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আমাদের তেলের দামের পার্থক্য রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে লিটারপ্রতি ডিজেলের যে দাম তার সঙ্গে দেশে মার্চ-এপ্রিলে নির্ধারিত ডিজেলের দামের ব্যবধান ৩৫ টাকা। পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে এ ব্যবধান ১৫-২০ টাকা। এমন দামের হেরফের থাকলে সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে তেল পাচার হওয়া অনিবার্য। এজন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করলে মজুদদারি কমবে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট দূর হবে।

দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকট বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে বিলাসিতা পরিহার করতে হবে। সংকটকালে কৃচ্ছ্র সাধন কেবল স্লোগান নয়, বরং চর্চার বিষয় হতে হবে। সরকারি কাজে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় এসি এবং আলোকসজ্জা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তথ্যমতে, বাংলাদেশের সরকারি খাতে (মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান) ৫০-৬০ হাজার যানবাহন ব্যবহৃত হয়। এসব যানের জন্য প্রতি বছর শুধু জ্বালানি (তেল ও সিএনজি) বাবদ বরাদ্দ থাকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা। এ ব্যয় সংকোচন করতে পারলে অন্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রায় মিতব্যয়িতা আনা জরুরি। আর এমনটি করলে জনসাধারণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। সংকটকালে বেসরকারি বিলাস নিরুৎসাহিত করাও সরকারের কর্তব্য। বিলাসবহুল যানের বদলে গণপরিবহন খাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথম দুটো উদ্যোগ আমাদের আশু সমাধানের পথ হতে পারে। এছাড়া মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের বাজারের ওপর নির্ভর করা কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক ‘রক্তচক্ষু’কে উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থকে এখন প্রাধান্য দিতে হবে। এ মুহূর্তে রাশিয়া, ইরান কিংবা বিকল্প উৎসগুলো থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির বিষয়ে জোর দিতে হবে। আমদানির সব পথ খোলা রাখার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। অর্থাৎ জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একটি আমূল পরিবর্তন জরুরি। তেল আমদানি ও বিতরণকে শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের (বিপিসি) একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে না রেখে দক্ষ বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। বাজারে একাধিক সরবরাহকারী থাকলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তখন জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসবে এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবও অনেকাংশে কমানো যাবে।

শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বর্তমানে গ্রিড-সংযুক্ত এবং অফ-গ্রিড (সোলার হোম সিস্টেমসহ) মিলিয়ে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনক্ষমতা মাত্র ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশের আশপাশে। অথচ অতীতে বিভিন্ন মেয়াদে সরকারের পরিকল্পনা ছিল, ২০২০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা। সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি নানা কারণে। এর কিছু কারণও রয়েছে। যদি নবায়নযোগ্য উৎসকে মূলধারায় আনতে হয় তাহলে সোলার প্যানেল, বায়ুবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে। কিস্তি সুবিধা ও বিশেষ ইনসেনটিভ দিয়ে কলকারখানা ও গৃহস্থালিতে সোলার সিস্টেম প্রমোট করা গেলেও এর প্রসার ঘটবে। মনোযোগ বাড়াতে হবে আমাদের নিজস্ব সম্পদের ওপরও। বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর সমুদ্রে মোট ২৬টি ব্লক থাকলেও হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো পড়ে আছে। আমরা যদি দ্রুত উত্তোলনে না যাই, তবে একই বেসিনের প্রতিবেশী দেশগুলো আমাদের সম্পদ আহরণ করে নিয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। নিজের সম্পদ মাটির নিচে রেখে চড়া দামে বিদেশ থেকে জ্বালানি কেনার নীতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

সর্বশেষ যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া দরকার তা হলো গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং যাত্রী ভোগান্তি নিরসনে পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন। জ্বালানি সাশ্রয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থা। ঢাকা শহরে প্রতিদিন কয়েক লাখ ব্যক্তিগত গাড়ি চলে, যার বিশাল একটি অংশ শুধু একজন যাত্রী বহন করে। বর্তমানে আমাদের গণপরিবহন খাতটি একপ্রকার সিন্ডিকেট ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এ খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারত্বের আওতায় আনতে হবে। গণপরিবহন উন্নত হলে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজন কমবে এবং তেলের চাহিদা কয়েক গুণ কমে আসবে।

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারকে কেবল জোড়াতালি দিয়ে চলা বন্ধ করতে হবে। ফিলিং স্টেশনে সাধারণ মানুষের যে হাহাকার এবং রাইডারদের যে দুর্ভোগ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভবিষ্যতে বড় আকারের মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ। এসব নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা না করে জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সাহসী সংস্কারই পারে বাংলাদেশকে একটি জ্বালানি নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

দিদার ভূঁইয়া: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

আরও