রাষ্ট্রের পক্ষে
মানে সবার
পক্ষে। যেহেতু
দেশ জনতা
নিয়েই রাষ্ট্র।
রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব
করা মানে
সবাইকে প্রতিনিধিত্ব
করা। কিন্তু
আইরনি হচ্ছে
রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব
করতে গেলে
সেই রাষ্ট্রেরই
ইনডিভিজ্যুয়ালের (ব্যক্তি)
বিপক্ষে বা
বিরুদ্ধে দাঁড়াতে
হয়। কারণ রাষ্ট্র
কখনো কখনো
ব্যক্তির সংক্ষুব্ধতার
কারণ হয়ে
দেখা দেয়।
রাষ্ট্র না
হলেও রাষ্ট্রের
প্রতিনিধি হিসেবে
প্রতিষ্ঠান। আর
রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব
করতে গিয়ে
রাষ্ট্রের প্রধান
আইন কর্মকর্তা
অনেক সময়েই
আদালতে সমষ্টির
বিপক্ষে দাঁড়িয়ে
যান। সওয়াল
করেন রাষ্ট্রের
হয়ে। সেই
অর্থে রাষ্ট্রের
আইন কর্মকর্তা
অনেক আইনজীবীর
ক্ষণিক বিপক্ষালম্বনকারী
কিন্তু আইন
পেশার অন্তর্গত
সৌন্দর্য মেনে
কোর্ট রুমের
বাইরে সেই
তারাই আবার
বিজ্ঞ বন্ধু
সমুদয়। মাহবুবে
আলম রাষ্ট্রের
পক্ষে মানে
সবার পক্ষে
ছিলেন বলেই
তার মৃত্যু
পুরো রাষ্ট্রের
জন্যই এক
ধরনের শূন্যতা।
আওয়ামী লীগ
সরকার দায়িত্ব
নেয়ার পর
২০০৯ সালের
১৩ জানুয়ারি
অ্যাডভোকেট মাহবুবে
আলম রাষ্ট্রের
প্রধান আইন
কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি
জেনারেল) হিসেবে
নিয়োগ পান।
এ পদে
থাকা অবস্থায়
তিনি মৃত্যুবরণ
করেন, ছিলেন
টানা ১১
বছর। এত
দীর্ঘ সময়
এমন গুরুত্বপূর্ণ
পদে থাকার
নজির বাংলাদেশে
বেশ বিরল।
তিনি সুপ্রিম
কোর্ট আইনজীবী
সমিতির সম্পাদক,
সভাপতি ও
বাংলাদেশ বার
কাউন্সিলের নির্বাচিত
প্রতিনিধি হিসেবে
দায়িত্ব পালন
করেছেন। সন্দেহাতীত দক্ষতার
করাণেই একাদিক্রমে
তিন মেয়াদে
বর্তমান সরকার
এ পদে
তাকে রেখেছিল।
তার দীর্ঘ
দায়িত্ব পালনকালে
সংবিধানের পঞ্চম,
সপ্তম, ত্রয়োদশ
ও ষোড়শ
সংশোধনী চ্যালেঞ্জ
করে দাখিল
করা মামলায়
তিনি সরকারের
প্রতিনিধিত্ব করেন।
সুপ্রিম কোর্টে
জাতির জনক
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের
হত্যা মামলার
বিচার প্রক্রিয়ায়
যুক্ত ছিলেন
তিনি। যুদ্ধাপরাধ
মামলায় আপিল
বিভাগে সুচারুভাবে
তার ওপর
অর্পিত দায়িত্ব
পালন করেছেন।
মামলা পরিচালনার
ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের
স্বার্থকে সর্বোচ্চ
নিষ্ঠার সঙ্গে
রক্ষা করতেন।
বিচারসেবা প্রাপ্তিতে
দুর্নীতি ও
অনিয়মের বিষয়ে
ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।
সততা ও
নিষ্ঠার ঘটতির
বিষয়ে তিনি
দল ও
মতের ঊর্ধ্বে
তার অবস্থানের
কথা বলতে
দ্বিধা করতেন
না। তিনি
নিজে জ্ঞানানুরাগী
ছিলেন এবং
জুনিয়র আইনজীবীদের
সবসময় আইন
অনুরাগী হতে
উৎসাহ দিতেন,
এমনকি অ্যাটর্নি
জেনারেল অফিসে
যোগ দেয়া
নতুন সহকারী
অ্যাটর্নি জেনারেল
ছাড়াও ডেপুটি
অ্যাটর্নি জেনারেলদেরও
নতুন আইন
জানতে প্রণোদনা
দিতেন। তিনি
তার অফিসের
সব সহকর্মীর
গুণমান বাড়াতে
সদাতত্পর ছিলেন।
সুপ্রিম কোর্ট
বার অ্যাসোসিয়েশনের
সভাপতি এএম
আমীন উদ্দীন
মাহবুবে আলমের
মৃত্যুতে অভিভাবক
হারানোর বেদনায়
যেমন ন্যুব্জ,
অ্যাটর্নি জেনারেল
নয়, ব্যক্তি
ও আইনজীবী
মাহবুবে আলমের
প্রয়াণে তেমন
বেদনাহত অনেকেই।
বাবু হয়ে
বসে গদিতে/
ভুলে গেছেন
ভুঁয়ে পা
দিতে—কবি
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের
এ পঙিক্তর
বিপরীতে বরং
উজ্জ্বল অবস্থান
ছিল মাহবুবে
আলমের। সর্বোচ্চ
আইন কর্মকর্তা
হয়েও সাধারণের
জন্য তিনি
উন্মুক্ত ছিলেন
জীবনের শেষ
পর্যন্ত। বিভিন্ন
প্রয়োজনে তার
অফিসকক্ষে গিয়ে
এই অভিজ্ঞতা
হয়েছে যে
তার সৌজন্যবোধ
সে সহকর্মী
হোক কিংবা
সাক্ষাত্প্রার্থী হোক,
সবার প্রতিই
ছিল আন্তরিক;
যান্ত্রিক নয়
মোটেই। রাজনৈতিকভাবে
ভিন্নমতাবলম্বী আইনজীবীদের
সঙ্গেও ছিল
প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক।
যখন খটোমটো
আইনবেত্তা সাহিত্যানুরাগী
হয়ে ওঠেন
তখন আপাত
বৈপরীত্যময় এক
মেটামরফোসিস দেখতে
পাই তার
রবীন্দ্রকলার প্রতি
অনুরাগ দেখে।
ওয়াটারগেট ও
নিক্সন প্রায়
সমার্থক। কিন্তু
অনেকেই ভুলে
যান এ
মামলায় অ্যাটর্নি
জেনারেলের ভূমিকার
কথা। এই
বিচার প্রক্রিয়ায়
অ্যাটর্নি জেনারেল
এলিয়ট রিচার্ডসন
প্রসিকিউটর হিসেবে
আর্চিবাল্ড কক্সকে
নিয়োগ দেন।
মামলার তদন্তকাজের
অংশ হিসেবে
নিক্সনের কাছে
১৯৭২ সালের
নির্বাচন-পূর্ববর্তী
সব টেপ
চান কক্স।
নিক্সন টেপ
দিতে বাধ্য
হন, সেই
সঙ্গে প্রতিশোধপরায়ণ
হয়ে কক্সের
বরখাস্তের নির্দেশ
জারি করেন।
কিন্তু এর
প্রতিবাদে ওই
রাতেই অ্যাটর্নি
জেনারেল এলিয়ট
রিচার্ডসন স্বেচ্ছায়
পদত্যাগ করেন।
আমেরিকান মিডিয়া
অ্যাটর্নি জেনারেলসহ
বেশ কয়েকজনের
পদত্যাগের ঘটনাটিকে
নাম দেয়
‘Saturday
Night Massacre’
হিসেবে। পদ
রক্ষার ওজরে
শাসনতন্ত্র রক্ষার
পবিত্র দায়িত্ব
পালনে সূচ্যগ্র
ছাড় না
দেয়ার নজির
যেমন আছে,
এর অন্যতর
উদাহরণও আছে।
সংসৃ্কতিগত কারণে
আমাদের দেশের
ক্ষেত্রে এমন
ঘটনা খুব
দেখা যায়
না।
The job of the Attorney General is very specific. My roll, as the
legal adviser, is to defend the constitutionality of the laws as they’re
passed. Jeffrey Chiesa
অনেকে মনে
করেন, নিউজার্সির
অ্যাটর্নি জেনারেল
জেফ্রি চেইসা
যেভাবে বলেছেন,
অনেকটা তেমনই
ছকে বাধা
দায়িত্ব পালন
করেছেন মাহবুবে
আলম। আদালত
নির্বিশেষে অ্যাটর্নি
জেনারেল মাহবুবে
আলমের সার্বত্রিক
অতন্দ্র উপস্থিতি
তাকে অধিষ্ঠিত
করেছিল ট্রাস্টেড
অ্যাটর্নি জেনারেল
হিসেবে। তবে
সেটাই শেষ
কথা নয়,
সংবিধানের অভিপ্রায়
অনুযায়ী বিচার
বিভাগ জনগণের
স্বাধীনতা, সংবিধানের
সার্বভৌমত্ব ও
মর্যাদা সমুন্নত
রাখার দায়িত্ব
পালন করে। রাষ্ট্রের
সব পক্ষ
যার যার
অবস্থান থেকে
যেন শাসনতন্ত্রের
অনুশাসন মেনে
চলে, তা
দেখার দায়িত্ব
শাসনতন্ত্র বিচার
বিভাগকে দিয়েছে।
এটাই দস্তুর
যে নির্বাহী
বিভাগ যেসব
অন্যায় বা
অবিচারমূলক পদক্ষেপ
নেয়, তার
প্রতিবিধান করে
বিচার বিভাগ
এবং এ
প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ
অংশীজন অ্যাটর্নি
জেনারেল। সেই
বিবেচনায় মাহমুদুল
ইসলামকেই আদর্শ
অ্যাটর্নি জেনারেলের
শেষ প্রতিভূ
মানেন অনেকে।
সদর্থক অর্থে
অ্যাটর্নি অ্যাট
লার্জ হয়ে
ওঠার রাজনৈতিক
ও সাংসৃ্কতিক
বাতাবরণ সৃষ্টি
করাই বরং
কঠিন এক
চ্যালেঞ্জ।
এম এম খালেকুজ্জামান
আইনজীবী,
বাংলাদেশ সুপ্রিম
কোর্ট