এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে নিয়ে বাংলাদেশ কতটুকু সুবিধা পেল?

তিন বছর সময়ের অর্থনৈতিক মূল্য কত? প্রশ্নটি এখন আর তাত্ত্বিক নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে পিছিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করেছে। সময় পাওয়া গেছে। আসল প্রশ্ন হলো এ সময় আমাদের প্রস্তুতির সুযোগ দেবে, নাকি কেবল অস্বস্তিকর সিদ্ধান্তগুলো তিন বছর পিছিয়ে দেবে।

প্রস্তাব থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

পথটা দীর্ঘ। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকায় ঢোকে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক—তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে দেশটি। ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) উত্তরণের সুপারিশ করে; ফলে উত্তরণের তারিখ দাঁড়ায় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর।

এরপর প্রক্রিয়াটি কয়েকটি আলাদা ধাপে এগিয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়। সিডিপি অনুকূল বিবেচনার সুপারিশ করে, আর ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠায়। সবশেষে জি-৭৭ ও চীনের সমর্থনে বাংলাদেশ ও নেপালের পক্ষে উরুগুয়ের আনা প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। অর্থাৎ এটি এখন আর প্রস্তাব বা সুপারিশ নয়, কার্যকর সিদ্ধান্ত।

তবে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ করার মতো। সিডিপি বলেছে, বিদ্যমান কাঠামোয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদল সময় বাড়ানোর স্বীকৃত কারণ নয়; তবু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের জটিলতাকে তারা বিবেচনাযোগ্য মনে করেছে। সিদ্ধান্তের সঙ্গে শর্তও এসেছে। জাতিসংঘ ব্যবস্থা ও উন্নয়ন-বাণিজ্য অংশীদারদের সহযোগিতায় জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল (ন্যাশনাল স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি বা এনএসটিএস) বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে।

প্রবৃদ্ধির সংখ্যা, জীবনের হিসাব

সময় চাওয়ার যুক্তি বুঝতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব নিয়ে সংখ্যাগুলোর মধ্যেই অস্বস্তি আছে। জুনে বিবিএসের বার্ষিক সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ; কিন্তু অক্টোবরে প্রকাশিত ত্রৈমাসিকভিত্তিক সাময়িক হিসাবে তা ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

আর বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হারে থাকবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা বাস্তবে ঘটলে প্রায় চার দশকের সর্বনিম্ন হবে। সংস্থাটি গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেছে। এগুলো পূর্বাভাস, ঘটে যাওয়া ফল নয়; তবু সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য তা দুশ্চিন্তার কারণ।

বিনিয়োগেও ভাটা পড়েছে। বিবিএসের হিসাবে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ২৮ দশমিক ৫৪ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে। রফতানিও অনেকটা স্থবির। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকে এসেছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার, যা মোট পণ্য রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি।

অবশ্য ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিতও আছে—ইপিবির হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। বহিঃখাতেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে সেপ্টেম্বরের শুরুতে মোট রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৬৩৮ কোটি ডলার, আইএমএফের বিপিএম৬ হিসাবে ৩ হাজার ১৪৭ কোটি ডলার।

তবে মানুষের পকেটের হিসাব ভিন্ন গল্প বলে। ২০১৯ সালে মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) ১ হাজার ৮২৭ ডলার নিয়েই বাংলাদেশ ১ হাজার ২২২ ডলারের সীমা পেরিয়ে গিয়েছিল; ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় তা ২ হাজার ৬৮৪ ডলার। অথচ বিবিএসের হিসাবে গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, মজুরি বৃদ্ধি ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির নিচে। সূচকে উত্তীর্ণ হওয়া আর জীবনমানের নিরাপত্তা যে এক জিনিস নয়, এটাই তার প্রমাণ।

এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার টানা যায়। বাংলাদেশ এখনো সব মানদণ্ড পূরণ করছে; সমস্যাটা উত্তরণের ব্যবস্থাপনায়। তাই দুর্বল প্রবৃদ্ধি উত্তরণের যোগ্যতা হারানোর প্রমাণ নয়; এটি প্রস্তুতির ঘাটতির প্রমাণ।

সুবিধা কতটা, কত দিন

সবচেয়ে বড় লাভ ইউরোপের বাজারে। ইপিবির তথ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে পোশাক রফতানি আয়ের ৪৯ শতাংশের বেশি এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে। উত্তরণ ২০২৯ সালে হলে ইইউর স্বাভাবিক তিন বছরের রূপান্তরকাল প্রয়োগ হওয়ার কথা; সেক্ষেত্রে এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) সুবিধা ২০৩২ সাল পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে ইইউর নতুন জিএসপি বিধিমালা কী শর্ত আনে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মনে রাখা দরকার, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ এমনিতেই এলডিসি-সুবিধা পায় না।

দ্বিতীয় লাভ ওষুধ শিল্পে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির আওতায় এলডিসিদের জন্য ওষুধে পেটেন্ট-ছাড় ২০৩৩ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল, কিন্তু কোনো দেশ উত্তরণ করলে সেই ছাড় তখনই শেষ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশ তিন বছর বাড়তি সুরক্ষা পেল, তবে ২০৩৩ পর্যন্ত নয়। ওষুধের কাঁচামাল বা এপিআই উৎপাদন ও গবেষণায় এ সময়টুকুই কাজে লাগাতে হবে।

ঝুঁকির মাত্রা বুঝতে প্রক্ষেপণের দিকেও তাকানো দরকার। ডব্লিউটিওর এক সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছিল, এলডিসি-সুবিধা হারালে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমতে পারে। এটি অনুমিত ঝুঁকি, বাস্তবে ঘটে যাওয়া ক্ষতি নয়; চূড়ান্ত ক্ষতি নির্ভর করবে আমাদের প্রস্তুতির ওপর। এলডিসিদের মধ্যে বাণিজ্য সুবিধার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী বাংলাদেশ। তাই ঝুঁকি যেমন সবচেয়ে বড়, অভ্যস্ততার ফাঁদও তেমনি সবচেয়ে গভীর।

অসুবিধার দিক

সময় পেছানোর একটা দামও আছে। ইইউর পক্ষে আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে সতর্ক করেছেন যে যোগ্য দেশের বারবার সময় পেছানো জাতিসংঘ কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করতে পারে। তার মতে, উত্তরণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেয়। এ বক্তব্যের মর্ম হলো উন্নয়ন সহযোগীরা ধৈর্য দেখাচ্ছে, কিন্তু সেই ধৈর্য অসীম নয়।

আরেকটি ঝুঁকি মনস্তাত্ত্বিক। সুরক্ষার আরাম সংস্কারের তাড়না কমিয়ে দেয়। শুল্কমুক্ত সুবিধা আরো কয়েক বছর থাকবে—এ স্বস্তিতে জিএসপি প্লাসের শর্ত পূরণ, শ্রম ও পরিবেশগত সংস্কার আবার পিছিয়ে পড়লে বাড়তি সময়ের পুরো মূল্যই হারিয়ে যাবে।

প্রতিবেশীরা কী শেখায়

ভুটান কোনো বাড়তি সময় না চেয়েই ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তরণ করেছে। তবে তাদের সঙ্গে আমাদের তুলনা সীমিত। ভুটানের রফতানির সিংহভাগ যায় ভারতে, ফলে এলডিসি-সুবিধা হারানোর ধাক্কা সেখানে তুলনামূলক কম। বাংলাদেশের মতো ইউরোপনির্ভর, একক পণ্যনির্ভর অর্থনীতির হিসাব আলাদা।

উত্তরণের প্রস্তুতিকালে লাওসে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ার চিত্রও আছে; জাতিসংঘের হিসাবে ২০২৩ সালে দেশটিতে বিদেশী বিনিয়োগ ১৬২ শতাংশ বেড়ে ১৬৭ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অন্যদিকে নেপালও বাংলাদেশের মতো তিন বছর সময় পেয়েছে। শিক্ষাটা পরিষ্কার: উত্তরণের প্রভাব নির্ভর করে রফতানির কাঠামোর ওপর, আর বাংলাদেশের কাঠামোই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

বাড়তি সময়ের অগ্রাধিকার

প্রথমত, জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশলটিকে সরকার সময়ভিত্তিক মাইলফলকসহ প্রকাশ্য দলিলে পরিণত করুক; প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতির হিসাব জনসমক্ষে আসুক। প্রয়োজনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করে সরকারি-বেসরকারি যৌথ একটি তদারক কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ২০২৭ সালের মধ্যেই জিএসপি প্লাসের শর্ত অনুযায়ী শ্রম ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। পাশাপাশি জাপান, যুক্তরাজ্য ও আসিয়ানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে ভিয়েতনাম যে সুবিধা নিয়েছে, তা আমাদের জন্য সতর্কসংকেত।

তৃতীয়ত, ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক হিসেবে বলি, শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা শুরু হয় ঋণের ব্যয় থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে দুর্বল ব্যাংক স্থিতিপত্র ও ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ দায়ভারকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। খেলাপি ঋণের স্বচ্ছ সমাধান, ব্যাংক একীভূতকরণে সুশাসন এবং রফতানি বহুমুখীকরণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ছাড়া বিনিয়োগ ফিরবে না।

চতুর্থত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) শুল্কনির্ভর রাজস্ব থেকে ক্রমান্বয়ে আয়কর ও মূসকনির্ভর কাঠামোয় যেতে হবে। কারণ উত্তরণের পর আমদানি শুল্ক কমানোর চাপ আসবেই।

পঞ্চমত, রফতানিকারকদের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ এখনই শুরু করতে হবে। চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবাকে পরবর্তী রফতানি স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সাফল্য নয়; এটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতার সূচনা, যেখানে ছাড় নয়, দক্ষতাই হবে বাজারে টিকে থাকার মূলধন। এবারের তিন বছর কোনো উপহার নয়, এটি মূলত একটি ঋণ। এর সুদ শোধ করতে হবে সংস্কার, উৎপাদনশীলতা, রফতানি সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা দিয়ে। ২০২৯ সালের নভেম্বরে আবার যদি একই প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে দাঁড়াই, সেদিন প্রশ্ন উঠবে না আমরা কত সময় পেয়েছিলাম; প্রশ্ন উঠবে, সময়টা দিয়ে আসলে আমরা কী করেছিলাম।

এমএম মাহবুব হাসান ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক

আরও