তুলনামূলকভাবে দেশভাগের কারণে পূর্ব বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তানে) আসা শরণার্থী সমসংখ্যক হলেও তাদের অধিক বৈচিত্র্য ছিল। শুধু পশ্চিম বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরাই নয়, কলকাতা ও বিহার থেকে বিপুলসংখ্যক অবাঙালি মুসলমানও এসেছিল। এই বিচিত্রতার কারণেই সম্ভবত পশ্চিমের মতো সামষ্টিক স্মৃতি (পূর্ব বাংলার) সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়নি। অনিন্দিতা ঘোষালের দি ইনভিজিবল রিফিউজিস গবেষণা নিবন্ধে আরো জানা যায় যে উর্দু ও হিন্দি ভাষাভাষী অবাঙালি বিহারি অথবা মুহাজির শরণার্থীরা পশ্চিম পাকিস্তান (পাঞ্জাব) শাসিত পূর্ব বাংলায় (১৯৫৬ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানে) অধিক সমাদৃত হয়েছিল। সামষ্টিক দুঃস্মৃতি না থাকায় যেমন পরবর্তী সময়ে ভাষাকেন্দ্রিক আন্দোলন স্বকীয় গতিতে এগোতে পেরেছে, একইভাবে ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন অবধি পথপরিক্রমায় পুরনো খণ্ডিত স্মৃতি সামাজিক শক্তিতে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়। অবশ্য পশ্চিমের বেদনাবহুল স্মৃতির বিপরীতে পূর্ব বাংলায় হীন কর্মের পাপবোধ অথবা তাকে ঢেকে রাখার উদ্দেশ্যে ইতিহাস লোপাট করার ঘটনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আঞ্চলিক রূপ দেখে মনে হয়েছে যে সে-জাতীয় পাপবোধ দুই পর্বের দেশভাগেই ঘটেছে, যার মনন-শৃঙ্খল থেকে আজো পূর্ব বাংলার বাংলা ভাষাভাষীরা বেরোতে পারেনি। জানতে ইচ্ছা করে, একই ধরনের পাপবোধ থেকে উদ্ভূত ধর্মান্ধতা ভারতের কোন কোন এলাকায়, বিশেষত পশ্চিমে ও উত্তরে আছে কিনা।
সার্বিক বিচারে বললে অত্যুক্তি হবে না যে বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে বিভাজনের মাত্রা সর্বাধিক, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহিঃশক্তির দ্বারা প্ররোচিত অথবা তাদের গৃহীত কৌশলের ফসল। এই বিভাজন যে চরম বৈরিতায় রূপ নিতে পারে, তার দৃষ্টান্ত অঢেল। বাংলাদেশে ভারত-বিরোধিতা কতখানি দেশভাগের সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে, আর কতখানি ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর প্রতিক্রিয়া, তা নিরূপণ বেশ কঠিন। তবে স্বভূমি থেকে বিতাড়িত বা চলে যাওয়া কলকাতা, বেনারস ও দিল্লির বাঙালদের সঙ্গে আলাপে বুঝেছি যে অতীতের ক্ষত আজও যন্ত্রণা দেয় এবং সে কারণে সুযোগ ঘটলেও অনেকেই পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরতে দ্বিধান্বিত। সেই ক্ষতের সুযোগ নিয়ে, দেশভাগকালের তিক্ত অভিজ্ঞতা একপেশেভাবে তুলে ধরে আজকের তরুণ মনকে বিষিয়ে দিয়ে বিভাজন দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা অনেকের মাঝে লক্ষ করা যায়। তবে
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অথবা প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পথশোভায় অথবা ঋতুব্রত ব্যানার্জির রাজ্যসভায় বাঙালিবিষয়ক বক্তব্য এবং অটল বিহারি বাজপেয়ির পোর্ট্রেট উদ্বোধনে পশ্চিম বাংলার রাজ্যপাল আহূত অনুষ্ঠানে রাজ্যসরকারের প্রতিনিধিদের যোগদান থেকে বিরত থাকা—এসবই বাঙালিকেন্দ্রিক নতুন জাগরণের ইঙ্গিত দেয়। সে জাগরণ সম্ভবত ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পশ্চিম বাংলায় বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষীদের টিকে থাকার আন্দোলন হিসেবে গণ্য করাই সমীচীন। এ বিরোধের পরিণতি কোথায় গড়াবে তা পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। তবে রাজার মিথ্যাচারের লাভ-লোকসানের বিষয়টি এ বিরোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই আলোচনা দিয়েই নিবন্ধটি শেষ করব।
অনেকের মতে, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে বাঙালি মনন অনেক উত্কর্ষ, যা সম্ভব হয়েছে জল-বাতাস, মাছ ও ভাতের সহজলভ্যতার কারণে। সম্ভবত একই সূত্রে গড়ে উঠেছে বহু নৃগোষ্ঠীর সম্মিলনে বাঙালি নামক আজকের সংকর জাতি। পার্সি প্রভাবিত পশ্চিমা ভারত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়েছিল বাঙালি। অনেকে তার সঙ্গে ইংরেজদের কাছে প্রথম শিকার হওয়ার নেতিবাচক দিকগুলোকেও তুলে ধরেন। যাই হোক না কেন, গুজরাটসহ উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে গড়ে ওঠা পুঁজি রাজনৈতিক অঙ্গনে মুখ্য চালিকা শক্তির ভূমিকা রেখেছে এবং ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে দরকষাকষি করে পূর্বাঞ্চলের দেশভাগের প্রকৃতি নির্ধারণ করেছে। ভিন্ন নিবন্ধে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছি (‘যোগাযোগের
রাজনীতি-অর্থনীতি’)। তবে এক পাড়ে নেতাজি নিয়ে অন্ধত্ব এবং অন্য পাড়ে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মাঝে উন্নয়ন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়ায় বাঙালি ব্যর্থতার কারণ খোঁজার বা সেই পরিচিতির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রয়াস দেখা যায় না (অথবা তা দমিত রাখা হয়েছিল?)।
উপমহাদেশে আঞ্চলিকভাবে বৈষম্যমূলক পুঁজি বিকাশের কারণে পূর্বাঞ্চলকে সবসময় সম্পদ ও শ্রম জোগানের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি (পূর্ব পাকিস্তানও) বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসেও দেখা যায় যে প্রতিনিয়ত স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা পুঁজির বৃদ্ধি একটি মাত্রার অধিক যেতে দেয়া হয়নি। সম্ভবত এই উক্তি পশ্চিম বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও আসামের জন্যও প্রযোজ্য। সে কারণেই আজ অরুণাচলে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করে এসি/ডিসি হাই ভোল্টেজ লাইন বসিয়ে পশ্চিমের রাজ্যগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে; উত্তর-পূর্বের সম্পদ নৌপথে পাড়ি জমাবে গুজরাটের বন্দরে এবং আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর বা মেঘালয়ের (এবং মিয়ানমারের) সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগ বা বাণিজ্য ব্যবস্থা না গড়ে সেসব রাজ্যের সম্পদ বাংলাদেশের জল-মাটি ব্যবহার করে স্থানান্তর করা হবে। এসব (বিশাল) আর্থিক অর্জন নিশ্চিত করতে চাইলে আশপাশের সব রাজ্যে সহযোগী রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আবশ্যিক, যে কর্তৃত্ব রাজ্যে বিভাজনের রাজনীতি ছড়িয়ে সম্পদ আহরণ ও পাচারের পথকে সুগম করবে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে রাজনৈতিক মিথ্যাচারের নেতিবাচক দিক এই বিশাল লাভের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য।
পরিশেষে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
প্রথমত, জাতি ও ধর্মের মিশ্রণে নাগরিকত্ব সংজ্ঞায়িত করা এক ধরনের বিভাজন নীতি, যা রাষ্ট্র কাঠামোয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা স্বল্পসংখ্যক দেশী-বিদেশী স্বার্থান্বেষীর কর্তৃত্ব দীর্ঘায়িত করতে সহায়তা করে। এ ফাঁদে পড়া থেকে যেমন বিরত থাকা প্রয়োজন, তেমনি অন্যকে সে ধরনের ফাঁদে ফেলা অনুচিত।
দ্বিতীয়ত, যে জনগোষ্ঠীর মাঝে বাংলা ভাষাভাষীরা বসতি নিয়েছে, তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থতা সম্ভবত বাঙালি-বৈরিতার মুখ্য কারণ। হয়তো অতি ইংরেজির বাহার দেখিয়ে পার্শ্ববর্তী রাজ্যে বাঙালি ঔপনিবেশিকরা (সেটলারস) মিথ্যা অহমবোধে ইংরেজদের সেবা করতে গিয়ে স্থানীয়দের বিরাগভাজন হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাইরের শক্তির কাছে সেটাই হয়ে উঠেছে অনাদি (বাঙালি) ও আদির মাঝে বিভক্তি আনার চরম হাতিয়ার। বাঙালি সত্তা জাগরণের যদি কোনো যৌক্তিকতা থাকে, সে জাগরণে অগ্রজদের অবশ্যই পার্শ্ববর্তী জাতিসত্তা ও ছোট-বড় নৃগোষ্ঠীর প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে এবং পুরনো বৈরিতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। তারও আগে প্রয়োজন নিজেদের মধ্যকার বৈরিতা নিরসন।
তৃতীয় বিষয়টি উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম দুটো ধারা লক্ষণীয়: ১. বিভিন্ন জাতিসত্তার স্বাধীন অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও প্রতিটির মাঝে নানা শ্রেণীর বিভক্তি এনে ক্ষমতা (নির্দিষ্ট গোত্রের স্বার্থে) এক কেন্দ্রে কুক্ষিগত করা; ২. বিভিন্ন জাতিসত্তাকে স্বকীয়ভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে তাদের সম্মিলিত কেন্দ্র গড়ে তোলা। প্রথম পথটি দ্রুত পরিবর্তন আনতে সক্ষম, তবে তা হবে ভঙ্গুর এবং তাই পরাশক্তির কাছে এ উপমহাদেশের অতীত ও বর্তমান ঐতিহ্য জলাঞ্জলি হওয়ার সম্ভাবনা এ পথে অধিক। দ্বিতীয় পথটি কষ্টসাপেক্ষ, তবে টেকসই।
অবাক লাগে ভাবতে যে জাতিসত্তা ও ধর্মের টানাপড়েনে দুই পাড়ের মূলধারার বাঙালিদের একই ধরনের দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। তাদের স্থির করতে হবে যে উভয় স্বদেশের মাটিতে এবং বিশ্বপরিসরে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য নিজ নিজ ধর্ম বিসর্জন না দিয়ে বাঙালি সত্তার পুনর্জাগরণ কি আবশ্যিক (ও সম্ভব)? নাকি
জাতিসত্তাকে বিপর্যস্ত করে শুধু ধর্মের আড়ালে বৃহত্তর অদৃশ্য সত্তাকে তারা লালন করবেন, যা একদিন তাদেরই বধ করবে? (শেষ)
[নিবন্ধের বক্তব্য লেখকের ব্যক্তি বিশ্লেষণ, যার সঙ্গে ইআরজির সংশ্লিষ্টতা নেই]
ড. সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ; ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক