বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পণ্য রফতানি সংক্রান্ত তথ্যে ব্যাপক ভুল থাকার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়ার পর এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছিল যত দ্রুত সম্ভব আনুষঙ্গিক তথ্য-উপাত্তাদি সংশোধন করে তদজাত পরিসংখ্যানগুলো হালনাগাদ করা। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগত পর্যায়ে একই অভিমত ব্যক্ত করেন। আর পাটিগণিতের ন্যূনতম জ্ঞানধারী ব্যক্তিমাত্রই বোঝেন যে, একাধিক মানের সমন্বয়ে গড়া যোগসমষ্টির আওতায় কোনো একটি মান পরিবর্তিত হলে এর যোগসমষ্টিও পরিবর্তিত হতে বাধ্য এবং এটি বোঝার জন্য বিশিষ্ট গণিতবিদ কিংবা অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও অর্থ মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে রফতানি হিসাবের গরমিল ধরা পড়লেও এতে জিডিপি বা জনগণের মাথাপিছু আয় কমবে না এবং সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, রফতানি আয়ের তথ্যে ভুল থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় তা সংশোধনপূর্বক আনুষঙ্গিক পরিসংখ্যানগুলো সংশোধন করতে রাজি নয়।
কি ভয়ংকর কথা! স্থানীয় ও বৈদেশিক উভয় সূত্রের বিভিন্ন আয় মিলে গড়া যে মোট দেশজ উপাদান (জিডিপি), তার কোনো একটি সূত্রের আয় যদি কমে যায় তাহলে জিডিপির পরিমাণ কিংবা মাথাপিছু আয় কমবে না? তাহলে প্রশ্ন করাই যায়, এসবের মধ্যকার কোনো একটি আয় যদি বৃদ্ধি পায় তাহলে জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বাড়বে নাকি অপরিবর্তিত থাকবে? যদি বাড়ে, তাহলে আয় কমার কারণে জিডিপি কিংবা মাথাপিছু আয় কমবে না কেন? এ অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় যদি এটি সংশোধন করতে সম্মত না হয়, তাহলে তো অর্থনীতি শাস্ত্রের শত শত বছরের মূল সূত্রকেই পাল্টে দিতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় কি তাহলে তেমনটিই সুপারিশ করছে? নাকি নিজেদের অদক্ষতা ঢাকা দেয়া কিংবা হীন উদ্দেশ্যে করা তথ্য বিকৃতির বিষয়টিকে আড়াল করার জন্যই তারা সেটি করতে চাচ্ছে না? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) করা ভুলের দায় অর্থ মন্ত্রণালয় কেন নিতে চাচ্ছে? যতটুকু জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্দেশনা ও পরামর্শেই অর্থ মন্ত্রণালয় এ অবস্থান গ্রহণ করছে। বিষয়টির সত্য-অসত্যের বিষয়টি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারেন।
পণ্য রফতানির তথ্যে ইপিবি যেসব ভুল করেছে, সেসব চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গত ৪ জুলাই ইপিবি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একটি চিঠিও লেখা হয়েছিল। আর এ-সংক্রান্ত খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৬ জুলাই জারীকৃত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নাগরিকদের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ কমবে না মর্মে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা একটি লিখিত অসত্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় দলিলে এ ধরনের অসত্যাচার যে কত বড় গর্হিত ও অপরাধমূলক কাজ, তা কি অর্থ মন্ত্রণালয় বুঝতে পারছে? বিষয়টি অবশ্যই তাদের না বোঝার কথা নয়। কিন্তু বুঝেও এভাবে অসত্যাচার করার নামই কি তাহলে জ্ঞানপাপিত্ব? আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এরূপ জ্ঞানপাপী মানুষের সংখ্যা দিন দিনই এত দ্রুত হারে বাড়ছে যে, বিবেকবান জ্ঞানীদের খুঁজে পাওয়াটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে যা-ই হোক, রফতানি আয়ের তথ্যে পরিদৃষ্ট ভুলগুলো সংশোধনের পরও জিডিপি সংশোধনের প্রয়োজন হবে না মর্মে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত তাদের নির্বাহী বক্তব্যে ‘রাজনৈতিক বক্তব্যে’র মতো করে যা বলা হলো, তা যে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলবে, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। তার চেয়েও বড় কথা, এ ধরনের ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাজেট ও অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলতে থাকলে সেসবের মধ্য দিয়ে কোনোদিনই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন-লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না এবং বর্তমানে সেটি হচ্ছেও না। বস্তুত এ ধরনের ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলেই বিভিন্ন খাতওয়ারি কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিভ্রান্তিকর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের কথাই ধরা যাক। বিশেষ উদ্দেশ্যে দেশের মোট জনসংখ্যা কমিয়ে দেখানোর কারণে জনগণের গড় মাথাপিছু আয় বেশি দেখানো যাচ্ছে বটে। কিন্তু তাতে করে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যে হারে কমছে বলে অংকের হিসাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, প্রকৃত বৃদ্ধি তো তারচেয়ে অনেক বেশি। ফলে অংকের হিসাবকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে একসময় যখন দেখা যাবে যে, বাংলাদেশের প্রকৃত মোট জনসংখ্যা বর্তমানের কাগুজে সংখ্যার চেয়ে অন্তত ১০-১৫ শতাংশ বেশি, তখন বিষয়টি কেমন অস্বস্তিকর হয়ে পড়বে না কি?
এটি তো গেল একদিক। অন্যদিকে ভবিষ্যতে এসব পরিসংখ্যান সংশোধন ও ব্যবহারের দায়িত্ব যখন কোনো প্রকৃত দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত হবে, তখন এ জটিল কাজটি তারা করবেন কেমন করে? এ নিয়ে তো তখন তাদের রীতিমতো বিপাকে পড়তে হবে। ভবিষ্যতের সে অস্বস্তিকর সময় ও মোকাবেলা-অযোগ্য পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে রীতিমতো শিহরিত হয়ে উঠতে হয়। আসলে তথ্য সংশোধনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে দৃষ্টিভঙ্গি তা বস্তুতই চরম অপেশাদারত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। তাছাড়া ভ্রান্তিপূর্ণ তথ্য পরিবেশনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ও তার নাগরিকদের দেয়া তথ্যের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে ধরনের অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা তৈরি হবে, সেটি দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সমস্যায় ফেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক পরিসরে এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, অনিবার্যভাবেই যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), পণ্য ও জনশক্তি রফতানি এবং সর্বোপরি কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
রফতানি আয়ের হিসাব দেখানোর ক্ষেত্রে ইপিবি কর্তৃক একই তথ্য একাধিকবার অন্তর্ভুক্তীকরণ, নমুনা পণ্যকেও রফতানি হিসেবে দেখানো, স্থানীয় বাজারে বিক্রীত কোনো কোনো পণ্যকে রফতানি হিসেবে গণ্য করা প্রভৃতি যেসব ভুল করেছে, সেগুলো যদি এখনই সংশোধন করা না হয়, তাহলে সেটি তাদের চলমান পেশাদারত্বের ঘাটতিকে যেমনি টিকিয়ে রাখবে, অন্যদিকে তেমনি দেশের প্রকৃত রফতানি আয়কেও ভুলভাবে উপস্থাপন করবে। তাছাড়া এতে করে রফতানি আয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির হিসাবের মধ্যে একটি বড় ধরনের পার্থক্য তো থেকেই যাবে, যেটিকে গোঁজামিল ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। অনেকেরই সন্দেহ, রফতানি আয়ের স্ফীতকায় তথ্য দেখিয়ে অসৎ উদ্যোক্তাদের (সবাই অসৎ নন) বাড়তি নগদ প্রণোদনা দেয়ার জন্যই ইপিবি এমনটি করছে এবং একই কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ও এ তথ্য সংশোধন করতে চাচ্ছে না। আর এ সন্দেহ সঠিক হলে বস্তুত এটি হবে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষতায় সম্পূর্ণ অনৈতিক পন্থায় জনগণের সম্পদকে গোষ্ঠী বিশেষের হাতে তুলে দেয়ার শামিল, যে ধরনের লুটপাটের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে অন্য আরো বহু খাত ঘিরেও রয়েছে।
সব মিলিয়ে তাই বলব, রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, অর্থনীতির দৈনন্দিন লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ, দৈনন্দিন আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সর্বোপরি দেশে একটি দক্ষ ও দায়িত্বশীল পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিবিএস, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইপিবি ও এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে যেকোনো ভুল তথ্য প্রদান, সংরক্ষণ ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকা। আর সেই ধারাবাহিকতায় অর্থ মন্ত্রণালয়েরও উচিত হবে তথ্য ব্যবস্থায় কোনো ভুলত্রুটি ধরা পড়লে সে আলোকে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানগুলো সংশোধন করা। কিন্তু সেটি না করে উল্টো যদি সে ভুলকে টিকিয়ে রাখা ও প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটি শুধু দুর্ভাগ্যজনকই হবে না, একই সঙ্গে তা অন্যায়কে প্রশ্রয় ও সমর্থনদানের শামিল বলেও গণ্য হবে। অতএব আশা করব, রফতানি আয়ের তথ্য হিসাব করার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় যেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতের আলোকে ইপিবির ভুল তথ্যগুলো সংশোধন করে দেশের জিডিপির আকার, প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঘাটতি, দারিদ্র্যের স্তর, বৈশ্বিক আয়শ্রেণী ইত্যাদি সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলো সমন্বয় ও পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে তাদের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে। বিষয়টির প্রতি নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়