বাংলাদেশে এ রাজস্ব আহরণের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআর শুধু কর আদায়ের দপ্তর নয়; এটি রাষ্ট্রের করনীতি, করদাতা সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। তাই এনবিআরের চেয়ারম্যান কে হবেন এটি নিছক প্রশাসনিক পদায়নের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রশাসনের দিকনির্দেশনার প্রশ্ন।
এ প্রেক্ষাপটে কর ক্যাডারের কর্মকর্তা আহসান হাবিবকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া একটি ইতিবাচক, সঠিক ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এনবিআরের সরকারি প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি ৩০ জুন ২০২৬ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি এনবিআরের সদস্য কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৯৭২ সালে এনবিআর প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এনবিআরের নিজস্ব কর প্রশাসনের ভেতর থেকে উঠে আসা একজন কর্মকর্তাকে সংস্থাটির শীর্ষ দায়িত্বে আনা হলো। অনেক দেরিতে হলেও এটি নিঃসন্দেহে রাজস্ব প্রশাসনে বিশেষায়িত অভিজ্ঞতার গুরুত্ব সম্পর্কে সরকারের সঠিক উপলব্ধি ও কর ক্যাডারের প্রতি যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
আহসান হাবিব ১৫তম বিসিএস কর ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। সরকারি প্রোফাইল অনুযায়ী তিনি কর ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন কর অঞ্চল, কর আপিল অঞ্চল, কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল, বিসিএস কর একাডেমি, কর পরিদর্শন পরিদপ্তর এবং সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, সিআইসিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা তাকে শুধু একজন কর কর্মকর্তা নয়, বরং কর প্রশাসনের মাঠপর্যায়, গোয়েন্দা অনুসন্ধান, নীতিনির্ধারণ ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ একজন পূর্ণাঙ্গ রাজস্ব প্রশাসক হিসেবে গড়ে তুলেছে।
তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সিআইসির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন। সে সময় অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ অনুসন্ধানে সিআইসি যে তৎপরতা চালায়, সেখানে তার নেতৃত্ব বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। বিদেশে গিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান, সম্পদের অবস্থান ও প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, স্থির ও ভিডিও চিত্রসহ দৃশ্যমান উপাত্ত সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ সরকারের কাছে উপস্থাপনের মতো কাজ রাষ্ট্রের পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকে অনেক দূর এগিয়ে দেয়। অর্থ পাচার, গোপন সম্পদ ও জটিল আর্থিক অনুসন্ধানের এ বাস্তব অভিজ্ঞতা এনবিআরের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। ফলে তাকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার সিদ্ধান্ত নয়; যোগ্যতা ও অনুসন্ধানী দক্ষতার মূল্যায়নও বটে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, এনবিআরের চেয়ারম্যান পদে আয়কর বা কর ক্যাডারের কর্মকর্তাকে কেন অগ্রাধিকার দেয়া উচিত? এর উত্তর খুঁজতে হলে এনবিআরের কাজের প্রকৃতি বুঝতে হবে। এনবিআরের অধীনে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা রয়েছে। কাস্টমস আমদানি-রফতানি, শুল্কায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণের সঙ্গে যুক্ত। ভ্যাট উৎপাদন, সরবরাহ, বিক্রয় ও ভোগভিত্তিক কর ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করে। এ দুই শাখার গুরুত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এনবিআরের সামগ্রিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আয়কর ক্যাডারের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ আয়কর প্রশাসন করদাতার সামগ্রিক অর্থনৈতিক জীবন নিয়ে কাজ করে।
একজন আয়কর কর্মকর্তা নির্দিষ্ট পণ্য, নির্দিষ্ট চালান বা নির্দিষ্ট লেনদেন নয়; একজন করদাতার পুরো বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায়, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসার মুনাফা, বিনিয়োগ, উৎসে কর, অগ্রিম কর এবং কর আইনের প্রয়োগ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করেন। ফলে তার সামনে করদাতার অর্থনৈতিক জীবনের পূর্ণ চিত্রটি উপস্থিত হয়। তিনি জানেন কোন খাতে ব্যবসা বাড়ছে, কোথায় কর ফাঁকির প্রবণতা বেশি, কোথায় আইন জটিল, কোথায় করদাতা অযথা হয়রানির শিকার আর কোথায় করহার বা উৎসে করের বিধান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বাস্তব জ্ঞানই এনবিআরের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি সমন্বয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কর নির্ধারণ, করদাতার হিসাব পরীক্ষা, ব্যবসার প্রকৃত মুনাফা নির্ণয়, সম্পদ-দায় যাচাই, রিফান্ড সমস্যা, অডিট নির্বাচন, উৎসে করের বাস্তব প্রভাব এবং করদাতার মাঠপর্যায়ের ভোগান্তি—এসব বিষয়ে কর ক্যাডারের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাই এনবিআরের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকা শুধু সুবিধাজনক নয়, বরং প্রয়োজনীয়।
এ তুলনা কোনো ক্যাডারকে খাটো করার জন্য নয়; বরং কাজের প্রকৃতি বোঝানোর জন্য। আধুনিক যুগ বিশেষায়ণের যুগ। যেমন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে চিকিৎসা-বাস্তবতা জানা মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, বিচার ব্যবস্থায় আইনজ্ঞের অভিজ্ঞতা অপরিহার্য, তেমনি রাজস্ব প্রশাসনের নেতৃত্বে কর আইন, করদাতা, হিসাব, ব্যবসা ও মাঠপর্যায়ের কর বাস্তবতা জানা ব্যক্তির উপস্থিতি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এনবিআর যেহেতু একটি বিশেষায়িত রাজস্ব প্রতিষ্ঠান, তাই এর চেয়ারম্যান পদে আয়কর ক্যাডারের অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
এ দাবি আজকের নয়। কর প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে বিষয়টি বহু বছর ধরেই আলোচনায় ছিল। ২০১৪ সালের ২০ মে ওই অর্থবছরের বাজেটের কর প্রস্তাব শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত আমার মূল প্রবন্ধেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। ৩৭টি অনুচ্ছেদে ৩৯ পৃষ্ঠার সেই প্রবন্ধে ‘কর প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারমূলক পরামর্শ’ শিরোনামের অধীনে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, সদস্যের নিয়োগ, পদমর্যাদা ইত্যাদি’ নামে পৃথক উপশিরোনামে বলা হয়েছিল এনবিআর আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাটের মতো বিশেষায়িত অনুবিভাগের সমন্বিত প্রতিষ্ঠান; তাই এর চেয়ারম্যান পদে এমন ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত, যিনি রাজস্ব প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
সেই বক্তব্যের মূল যুক্তি ছিল সহজ: যিনি যে কাজে পারদর্শী, তাকেই সে কাজের নেতৃত্বে আনা স্বাভাবিক। আইনজীবীকে যেমন চিকিৎসকের দায়িত্ব দেয়া যায় না, তেমনি চিকিৎসককে বিচারকের দায়িত্ব দিলে ন্যায়বিচারের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। একইভাবে এনবিআরের মতো বিশেষায়িত রাজস্ব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বেও রাজস্ব প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। আজ কর ক্যাডার থেকে এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘদিনের যুক্তিসংগত দাবিরই বাস্তব প্রতিফলন।
গত ৫৪ বছরে এনবিআরের শীর্ষ পদে মূলত সাধারণ প্রশাসনিক ধারার কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ কেউ কর্মজীবনের শুরুতে কর ক্যাডারে থাকলেও চেয়ারম্যান পদে আসার সময় তারা সাধারণত সচিব পর্যায়ের প্রশাসনিক অবস্থান থেকে এনবিআরে এসেছেন। ফলে এনবিআরের নিজস্ব কর প্রশাসনের ভেতর থেকে, বোর্ডের সদস্য পর্যায় থেকে সরাসরি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়া ছিল দীর্ঘদিনের একটি অপূর্ণতা। বর্তমান সরকার সেই অপূর্ণতা দূর করে সঠিক কাজটি করেছে।
এ সিদ্ধান্ত কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। এতদিন যারা মাঠে কর নির্ধারণ করেছেন, রাজস্ব আহরণ করেছেন, করদাতার সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করেছেন, তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল, তারা কি কখনো নিজেদের প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যাওয়ার সুযোগ পাবেন? আহসান হাবিবের নিয়োগ সেই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর। এতে কর প্রশাসনের ভেতরে পেশাগত মর্যাদা, কর্মোদ্দীপনা ও দায়িত্ববোধ বাড়বে।
তবে এ নিয়োগকে শুধু প্রশংসার জায়গায় আটকে রাখলে চলবে না। এটি একটি সুযোগ; এখন প্রয়োজন এ সুযোগকে বাস্তব সংস্কারে রূপ দেয়া। করদাতার হয়রানি কমানো, রিফান্ড ব্যবস্থা কার্যকর করা, অডিট নির্বাচনকে ঝুঁকিভিত্তিক করা, উৎসে কর ও অগ্রিম কর ব্যবস্থাকে বাস্তব মুনাফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, আপিল নিষ্পত্তি দ্রুত করা এবং কর প্রশাসনকে তথ্যভিত্তিক ও করদাতাবান্ধব করা—এসব কাজ এখন আরো গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি, কিন্তু সেই রাজস্ব আহরণ হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক। সৎ করদাতাকে হয়রানি করে রাজস্ব ব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না, আবার কর ফাঁকিবাজকে প্রশ্রয় দিয়েও রাষ্ট্রের অর্থনীতি সুরক্ষিত হয় না। একজন অভিজ্ঞ আয়কর প্রশাসক এ দুই দিকের ভারসাম্য ভালো বুঝতে পারেন। তাই এনবিআরের নেতৃত্বে আয়কর ক্যাডারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তার উপস্থিতি রাজস্ব প্রশাসনকে আরো বাস্তবভিত্তিক ও দায়িত্বশীল করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, কর ক্যাডার থেকে এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগ বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা সম্ভব এবং করা উচিত। এনবিআর যেহেতু রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান, তাই ভবিষ্যতেও এর চেয়ারম্যান পদে আয়কর তথা কর ক্যাডারের সৎ, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নীতিমান কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এতে রাজস্ব আহরণ যেমন বাস্তবভিত্তিক হবে, তেমনি করদাতার আস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে। নতুন এনবিআর চেয়ারম্যান কতটুকু সফল তার গৃহীত পদক্ষেপ ও প্রভাবই ভবিষ্যতে বলে দেবে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী: আয়কর আইনজীবী ও কোম্পানি আইন উপদেষ্টা