আলোকপাত

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যোগ্য কর্মশক্তি তৈরি হচ্ছে?

পাঁচই আগস্টের বিপ্লবের পর বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এটাই সেই আশা যা আমরা ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর লালন করেছিলাম, যখন

পাঁচই আগস্টের বিপ্লবের পর বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এটাই সেই আশা যা আমরা ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর লালন করেছিলাম, যখন আমরা, ছাত্ররা, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু অতীত আমাদের একটি বেদনাদায়ক গল্প বলে: রাজনৈতিক দলগুলো বারবার সেই প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। গত ৫৩ বছরে বাংলাদেশের অনেক সিদ্ধান্ত লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে, যা চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতায় অবদান রেখেছে। এসব ভুল পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে দেশ আরো অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের অনুধাবন করতে হবে, বর্তমান বিশ্ব আগের বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন টেকনোলজি শুধু শিল্প, বাণিজ্য আর সেবাক্ষেত্রে নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে পুরনো পদ্ধতি, জ্ঞান এবং অনমনীয় মানসিকতার ওপর নির্ভর করলে আজকের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে না। পুরনো প্রজন্মের নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রকৃত পরীক্ষা হলো, তাদের এ জটিল প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা যা ব্যবসা ও সেবার গতি-প্রকৃতিকে রূপান্তরিত করছে। আমাদের উভয় দিকেই—অতীত ও ভবিষ্যতের দিকে—সৃজনশীল মানসিকতা নিয়ে তাকাতে হবে।

এ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আসলে কী, যা শিল্প, ব্যবসা, সেবা এবং এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এক ভিন্ন ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে? এ বিপ্লব উন্নত প্রযুক্তির সংযুক্তির মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রকে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করেছে এবং প্রচলিত প্রথাগুলোকেও পুনর্গঠন করেছে। এটি একটি নতুন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগের প্রতীক, যেখানে ডিজিটাল, ফিজিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল ব্যবস্থা একত্রিত হচ্ছে। আগের শিল্প বিপ্লবগুলোয় যেমন বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল কম্পিউটিংয়ের মতো বিশেষ কিছু উদ্ভাবন প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বিভিন্ন উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোর সমন্বয়ে ফিজিক্যাল, বায়োলজিক্যাল ও ডিজিটাল জগতের মধ্যে সীমানা মুছে দিয়েছে। যদিও এটি ডিজিটাল বিপ্লবের (বা তৃতীয় শিল্প বিপ্লব) ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, এটি আন্তঃসংযুক্ততা এবং স্বয়ংক্রিয়তার নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে, যা আমাদের জীবনযাত্রা, কাজ ও পারস্পরিক সম্পর্ককে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংকস (আইওটি), উন্নত রোবোটিকস, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং জীবপ্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার অসাধারণ অগ্রগতি ঘটাচ্ছে। এ প্রযুক্তিগুলো বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অধিক সাড়া প্রদানকারী ব্যবস্থা এবং আগে যা মানুষের বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, এমন কাজগুলোর স্বয়ংক্রিয়তার মাধ্যমে উৎপাদন ও লজিস্টিকসকে রূপান্তর করছে।

যোগাযোগ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রে এ উদ্ভাবনগুলো কার্যক্রমকে পুনর্গঠন করছে। উদাহরণস্বরূপ, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিশ্লেষণ যা নিরাপত্তা, গ্রাহকসেবা এবং পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে উন্নতি আনছে। জীবপ্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, যেমন CRISPR-এর মতো সরঞ্জামগুলোর সাহায্যে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জেনেটিক রোগের চিকিৎসা, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।

বাংলাদেশে অনেক খাত এখনো ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক ধারা অনুসরণ করে, যা মূলত স্বল্প দক্ষ, শ্রমনির্ভর ও কম প্রযুক্তিনির্ভর। এ পুরনো পদ্ধতি ও মডেলের ওপর নির্ভরতা কৃষি, গার্মেন্টস উৎপাদন, ওষুধ শিল্প, চামড়া ও জুতা, জাহাজ নির্মাণ এবং ক্ষুদ্র উৎপাদনশীল শিল্পের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, যা সম্মিলিতভাবে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়েছে, যা প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মশক্তিকে কর্মসংস্থান দেয়। তবে এ খাতের বেশির ভাগই এখনো প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সঠিক চাষাবাদ, স্বয়ংক্রিয় সেচ এবং জীবপ্রযুক্তির মতো আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। উদাহরণস্বরূপ উন্নত বীজের জাত, সার ও কীটনাশক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে ফসলের উৎপাদনশীলতা প্রায়ই তার সম্ভাব্য সীমার চেয়ে কম থাকে। বিপরীতে যেসব দেশ কৃষিপ্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, তারা অনেক বেশি উৎপাদনশীলতা অর্জন করেছে। ফলে তারা কম জমি ও পানি দিয়ে আরো বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানিকারকদের মধ্যে অন্যতম, তবে এ শিল্প মূলত শ্রমনির্ভর, যেখানে স্বয়ংক্রিয়তার ব্যবহার সীমিত। যদিও কারখানাগুলো কিছু স্বয়ংক্রিয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোগ করতে শুরু করেছে, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের মতো কাজগুলো এখনো প্রধানত ম্যানুয়ালি সম্পাদিত হয়। ফলে এ শিল্পের উৎপাদন দক্ষতার সঙ্গে বড় আকারে বৃদ্ধি বা দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারের চাহিদার প্রতি সাড়া দেয়ার ক্ষমতা সীমিত থেকে যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো, যেমন ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন, ক্রমবর্ধমান তাদের উৎপাদন লাইনগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করেছে, যা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং খরচ কমাতে সহায়ক হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে পারছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়, যেখানে ক্ষুদ্র উৎপাদনশীলতা এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। এ ব্যবসাগুলো সাধারণত স্বয়ংক্রিয়তার পরিবর্তে ম্যানুয়াল শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, যা উৎপাদনশীলতা এবং বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। যেখানে অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো আইওটি এবং রোবোটিকসের মাধ্যমে শিল্প 4.0 গ্রহণ করছে, বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণে অনেক পিছিয়ে আছে।

বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত এখনো ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এখনো ডিজিটাল সমাধানগুলো অন্তর্ভুক্ত করেনি, যা তাদের সম্প্রসারণ এবং বৃদ্ধি সীমিত করছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, লজিস্টিকস ও গ্রাহক বিশ্লেষণের সঠিক ব্যবহার না থাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বাজারে প্রবেশের গতি ধীরই রয়েছে। এ খাতকে উন্নত করতে সরকারের আগ্রহের অভাবও দ্রুত প্রসারণে বাধা হয়ে আছে।

বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে হলে প্রচলিত প্যাটার্ন থেকে সরে এসে উদ্ভাবনকে সমর্থন করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষতা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। এটা করার জন্য একটি ডিজিটালি দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করা, গবেষণা ও উন্নয়নকে উচ্চ মানে নিয়ে যাওয়া এবং উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে উৎসাহিত করার জন্য নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ পরিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের গ্র্যাজুয়েটদের শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং মানসিক বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, অ্যাম্পেথি এবং রেজিলিয়েন্সের মতো অভিযোজিত দক্ষতার জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। এ দক্ষতাগুলো বর্তমান বক্তৃতাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী ‘চক ও টক’ শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর সমাধানে শিক্ষকদের বিকল্প শিক্ষণ পদ্ধতি যেমন ফ্লিপড ক্লাসরুম লার্নিং, সমস্যাভিত্তিক শিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষণ জেনে ব্যবহার করতে হবে। এ পদ্ধতিগুলো ছাত্রদের অভিযোজিত দক্ষতাগুলো বিকাশে সহায়তা করে, যা তাদের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে সিস্টেমগুলোকে খণ্ডিতভাবে না বুঝে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হয়। কাজেই গ্র্যাজুয়েটদের একটি T-শেপড কর্মশক্তি হতে হবে যাদের একটি ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা রয়েছে, তবে তারা অন্যান্য ডিসিপ্লিনে সহযোগিতা করতে সক্ষম। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমগুলো একটি কার্টেসিয়ান পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে জটিল সিস্টেমগুলোকে বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন অংশে ভাগ করা হয়। তবে এই রিডাকশনিস্ট আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, যা একটি আরো সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন।

প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত, আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বাঁচতে হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবচালিত অর্থনীতিকে গ্রহণ করা এবং উচ্চ শিক্ষার রূপান্তর অবিলম্বে করতে হবে। একই সময় সরকার প্রায় ৬৬ মিলিয়ন স্বল্প দক্ষ শ্রমিককে উপেক্ষা করতে পারে না। এ জরুরি সমস্যার সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত, উদ্ভাবনী সমাধান অত্যন্ত জরুরি—এবং জাতি এর উদ্ভবের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।

এমএম শহিদুল হাসান: সাবেক উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং অধ্যাপক (অব), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

আরও