বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে পরিবেশগত সংকট এখন আর কেবল প্রকৃতির সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত । কোথাও নদীভাঙনে বসতভিটা হারাচ্ছে মানুষ, কোথাও বন্যা ও জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে ফসল, উপকূলে লবণাক্ততা সংকুচিত করছে কৃষির সুযোগ, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস নিয়মিত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এসব ঝুঁকিকে আরো তীব্র করে তুলছে।
জাতীয় পর্যায়ে এসব সংকট মোকাবেলায় নীতি, পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু উদ্যোগগুলোর বাস্তব সাফল্য নির্ভর করে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। গ্রামীণ বাংলাদেশের সেই বাস্তবায়ন কাঠামোর অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ। পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা তৈরিতে স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ভিত্তির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু তাদের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা কতটা আছে—এ প্রশ্নই সামনে এনেছে এক গবেষণা।
গবেষক মুনিরা জাহান ও মো. জাকি ফয়সালের ‘দ্য ডায়নামিক্স অব ডিসএমপাওয়ারমেন্ট: আ কোয়ালিটেটিভ স্টাডি অব লোকাল এনভায়রনমেন্টাল গভর্ন্যান্স ইন রুরাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় গ্রামীণ বাংলাদেশের পরিবেশ শাসনের বাস্তব চিত্র অনুসন্ধান করা হয়েছে। গবেষণার মূল বক্তব্য—জাতীয় নীতি ও স্থানীয় বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। স্থানীয় মানুষ পরিবেশগত সংকট নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হলেও ইউনিয়ন পরিষদের পরিবেশ-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে তাদের আস্থা ও অংশগ্রহণ কম। আর এর পেছনে তিনটি বড় কারণ সামনে এসেছে—তীব্র অর্থসংকট, দুর্নীতির কারণে জনআস্থার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
গবেষণার জন্য পরিবেশগতভাবে ভিন্ন এমন পাঁচটি এলাকা বেছে নেয়া হয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি নদীবাহিত বন্যার ঝুঁকিতে, জামালপুরের ইসলামপুরে রয়েছে বন্যা ও নদীভাঙনের সম্মিলিত প্রভাব। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরভিত্তিক পরিবেশ ও আকস্মিক বন্যার সঙ্গে লড়ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সদরে রয়েছে দ্রুত নগরায়ণের পরিবেশগত চাপ। পরিবেশগত ঝুঁকির ধরন আলাদা হলেও গবেষণায় এসব এলাকার স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় কিছু অভিন্ন সমস্যা পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু কোনো একটি এলাকার ভৌগোলিক দুর্বলতা বা স্থানীয় কোনো নির্দিষ্ট সংকটের ফল নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও জড়িত।
গবেষণায় স্থানীয় বাসিন্দা, নারী, যুবক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও কমিউনিটি নেতাদের নিয়ে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী এবং শিক্ষাবিদদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা শুধু ইউনিয়ন পরিষদ কী করছে তা দেখেননি; বরং কেন তারা প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না, সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজেছেন।
জনগণকে যদি কেবল কোনো প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কখনোই টিকসই হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি, কারণ কোনো এলাকায় কোথায় জলাবদ্ধতা বেশি, কোন বাঁধটি দুর্বল, কোথায় নদীভাঙনের ঝুঁকি বেশি কিংবা কোন পরিবারের ওপর পরিবেশগত সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি—এসব তথ্য তাদের কাছেই সবচেয়ে ভালোভাবে থাকে
দেশে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু এসব নীতির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে স্থানীয় পর্যায়ে সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে তার ওপর।
এখানেই ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্ব। গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে গাছ লাগানো ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা পৌঁছে দেয়া এবং কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবেলার মতো নানা কাজের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ যুক্ত। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদেরকেই সামনের সারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
কিন্তু গবেষণার ফল বলছে, দায়িত্বের এ দীর্ঘ তালিকার বিপরীতে ইউনিয়ন পরিষদের বাস্তব সক্ষমতা সীমিত। অর্থের অভাব, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ইউনিয়ন পরিষদের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে একটি নীতি বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি হলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়নের সময় আটকে যাচ্ছে মূলত অর্থ, জনবল, ক্ষমতা ও সমন্বয় সংকটের কারণে। গবেষণার ভাষায়, এটি জাতীয় নীতি ও স্থানীয় পদক্ষেপের মধ্যে একটি ‘ক্রিটিক্যাল গ্যাপ’ বা গুরুত্বপূর্ণ বিচ্ছিন্নতা।
স্থানীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি অর্থের সংকট। গবেষণায় স্থানীয় জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে এ বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বরাদ্দ অর্থ পর্যাপ্ত নয়; আবার অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অনুদান ছাড়েও বিলম্ব হয়। ফলে প্রয়োজনের সময় স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অর্থ হাতে পায় না।
পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে অর্থ খরচ করলেই হয় না। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, স্থানীয় বাঁধ বা অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা দুর্যোগ প্রস্তুতির জন্য আগেভাগে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু অর্থের জোগান যদি অনিয়মিত হয়, তাহলে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া কঠিন। ফলে স্থানীয় সরকার অনেকটা সংকট দেখা দেয়ার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। গবেষণায় অর্থের ঘাটতি ও অর্থ ছাড়ে বিলম্বকে ইউনিয়ন পরিষদের পরিবেশগত ভূমিকা দুর্বল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থ সংকটের পাশাপাশি আরো গভীর সমস্যা হলো জনগণের আস্থার সংকট। গবেষণার ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম নিয়ে নানা দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয়দের ধারণা, অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পায়।
গবেষণায় অংশ নেয়া একজন স্থানীয় বাসিন্দা পরিবেশগত প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ তুলেন। আরেকজন ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মত দেন। অর্থাৎ স্থানীয় মানুষের একটি অংশ ইউনিয়ন পরিষদকে নিজেদের সমস্যা সমাধানের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।
এ আস্থার সংকট পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কারণ পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ যদি মনে করে তাদের মতামত গুরুত্ব পাবে না, কিংবা প্রকল্পের অর্থ ও সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ নয়, তাহলে তারা স্থানীয় উদ্যোগ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। আর এভাবে দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি করে না; এটি স্থানীয় সরকার ও জনগণের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ককেও দুর্বল করে দেয়। গবেষণায় এ অবস্থাকে স্থানীয় সরকারের বৈধতা ও কার্যকারিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেখা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের দুর্বলতার আরেকটি বড় কারণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। গবেষণায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ বা পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর সম্পর্ককে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কোন প্রকল্প আগে হবে, কোথায় অর্থ বরাদ্দ হবে, কারা সুবিধা পাবে—এসব সিদ্ধান্ত যদি পরিবেশগত প্রয়োজনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রভাবিত হয়, তাহলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীও প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এর ফলে স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি ইউনিয়ন পরিষদের কাছে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকলেও যদি প্রকল্প ও সম্পদ ব্যবহারে তার স্বাধীনতা সীমিত থাকে, তাহলে কেবল দায়িত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর করা সম্ভব নয়।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ‘স্থানীয় মানুষ পরিবেশ রক্ষায় আগ্রহী নয়’—এমন ধারণা সত্য নয়। বরং দেখা গেছে, মানুষ এতে অংশ নিতে আগ্রহী। কিন্তু সমস্যা হলো তারা কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া পায় না। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে কমিটি গঠন করলে তা দূর করা সম্ভব।
পরিবেশ শাসনের কার্যকারিতা বোঝার জন্য গবেষণাটি চারটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সামনে এনেছে—অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমেয়তা। অংশগ্রহণের অর্থ হলো স্থানীয় মানুষ, নাগরিক সংগঠন ও অন্যান্য অংশীজনকে পরিবেশগত প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও নজরদারিতে যুক্ত করা। জনগণকে যদি কেবল কোনো প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কখনোই টিকসই হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি, কারণ কোনো এলাকায় কোথায় জলাবদ্ধতা বেশি, কোন বাঁধটি দুর্বল, কোথায় নদীভাঙনের ঝুঁকি বেশি কিংবা কোন পরিবারের ওপর পরিবেশগত সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি—এসব তথ্য তাদের কাছেই সবচেয়ে ভালোভাবে থাকে।
এছাড়া জবাবদিহি নিশ্চিত করে যে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে জবাব দিতে হবে। স্বচ্ছতার অর্থ হলো সিদ্ধান্ত, প্রকল্প ও বাজেটের তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত রাখা। আর পূর্বানুমেয়তা হলো আইন ও নীতি সবার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ও সমানভাবে প্রয়োগ।
এ চারটি ভিত্তিই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। স্বচ্ছতা না থাকলে জবাবদিহি দুর্বল হয়। জবাবদিহি না থাকলে জনগণের আস্থা কমে। আস্থা না থাকলে অংশগ্রহণ কমে যায়। আর অংশগ্রহণ কমে গেলে স্থানীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বাস্তবত মানুষের প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর ক্ষেত্রে ঠিক এ ধরনের একটি চক্রের ইঙ্গিত-ই পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষার লড়াই তাই শুধু নদী, বন, জলাভূমি কিংবা উপকূল রক্ষার লড়াই নয়। এটি একই সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার লড়াই। কারণ পরিবেশের সংকট যখন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তখন সমাধানও সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান থেকেই আসতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের হাতে যদি দায়িত্ব থাকে কিন্তু তা পালনের মতো অর্থ, ক্ষমতা ও স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে তাকে কার্যকর পরিবেশ রক্ষক বানানো সম্ভব নয়। আর জনগণ যদি সে প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা না রাখে, তাহলে পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগও কখনো টেকসই হবে না। সুতরাং দেশের গ্রামীণ পরিবেশ রক্ষার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে একটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর—‘আমরা কি ইউনিয়ন পরিষদকে শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখব, নাকি সত্যিকার অর্থে ক্ষমতাবান স্থানীয় পরিবেশ শাসনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলব?’
নির্বাচন কমিশন আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার নিয়ে ভাবার সময় এখনই। এটি শুধু জনপ্রতিনিধি পরিবর্তনের সুযোগ নয়; স্থানীয় সরকার কাঠামো পুনর্বিন্যাসেরও সুযোগ। নতুন পরিষদগুলো দায়িত্ব নেয়ার আগেই যদি আর্থিক ক্ষমতায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনঅংশগ্রহণ ও প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলও অর্থবহ হবে। অন্যথায় নতুন চেয়ারম্যান-মেম্বার আসবেন, কিন্তু পুরোনো সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।
ওবায়দুল্লাহ সনি: প্রধান সহসম্পাদক, বণিক বার্তা