মানবসম্পদের সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন অপরিহার্য

বাংলাদেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু-কিশোর কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগলেও ৯২ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসা বা পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করেনি

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এগুলো দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, গবেষক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক তৈরির কেন্দ্র। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আজ নীরবে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও অনেক শিক্ষার্থী ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে ।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এমন একটি সময়, যখন একজন তরুণকে একই সঙ্গে শিক্ষাজীবনের চাপ, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, আর্থিক সংকট, সামাজিক সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয় গঠনের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। এসব চাপ অনেকের জন্য সাময়িক হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তা মানসিক রোগ বা সংকটে রূপ নেয়। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, আত্মবিশ্বাসের অভাব, পরীক্ষা ভীতি, সিদ্ধান্তহীনতা, সামাজিক উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক, ইন্টারনেট আসক্তি কিংবা মাদকাসক্তির মতো সমস্যা তাদের শিক্ষাজীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সময়মতো সহায়তা না পেলে কিছু ক্ষেত্রে সেল্ফ-হার্ম, আত্মহত্যার চিন্তা কিংবা আত্মহত্যার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায় আঁচল ফাউন্ডেশনের সংবাদভিত্তিক বিশ্লেষণে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৮৫৯ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১০১। পরের চার বছর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল যাথাক্রমে ২০২২ সালে ৫৩২ জন, ২০২৩ সালে ৫১৩, ২০২৪ সালে ৩১০ ও ২০২৫ সালে ৪০৩ জন। যদিও এসব সংখ্যা কেবল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে প্রস্তুত, তাই প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবু এ তথ্যগুলো শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে।

একই বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৭ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ছয়জন মেডিকেল কলেজ এবং ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৯ শতাংশই পুরুষ শিক্ষার্থীর। এসব সংখ্যা শুধু মৃত্যুর হিসাব নয়; বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্ট, অপূর্ণ সম্ভাবনা এবং একটি পরিবার ও সমাজের গভীর ক্ষতির গল্প।

আত্মহত্যা কখনই একটি মাত্র কারণের ফল নয়। গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা বলছে, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, সম্পর্কের টানাপড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার অভাব, এসব কারণ একসঙ্গে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদে এবং জরিপে উঠে আসে, কিন্তু তার বহু আগে শুরু হওয়া মানসিক যন্ত্রণা, উদ্বেগ কিংবা হতাশার খবর অধিকাংশ সময়ই অদৃশ্য থেকে যায়। তাই শুধু আত্মহত্যার সংখ্যা গণনা করাই যথেষ্ট নয়; আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু-কিশোর কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগলেও ৯২ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসা বা পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করেনি। আবার মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট অত্যন্ত সীমিত, প্রশিক্ষিত জনবলও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এর সঙ্গে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার, লজ্জাবোধ এবং মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখার প্রবণতা। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সময়মতো সাহায্য চান না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ। একজন শিক্ষার্থী মানসিকভাবে অসুস্থ হলে শুধু তার ব্যক্তিগত জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার শিক্ষা, গবেষণা, কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন। এর প্রভাব পড়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপরও। রাষ্ট্র একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলার কারণে সে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল অনেক ক্ষেত্রেই নষ্ট হয়ে যায়। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল স্বাস্থ্য খাতের বিষয় হিসেবে নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উদ্যোগ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সেখানে প্রশিক্ষিত সাইকোলজিস্ট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সহজলভ্য, গোপনীয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির ব্যবস্থা, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, সংকটাপন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেল ব্যবস্থা এবং শিক্ষক-প্রশাসনের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘‌পিয়ার কাউন্সিলর’ তৈরি করা, যেন তারা কোনো সহপাঠীর হতাশা বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে দ্রুত সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড দিতে পারে।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বয়সোপযোগী মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম, পত্রিকা এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য, সচেতনতামূলক প্রচার এবং সহায়তা পাওয়ার উপায় তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার কমবে, সাহায্য চাওয়ার প্রবণতা বাড়বে এবং প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং মানবিক বিকাশের মৌলিক ভিত্তি। আজকের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়বে। তাই তাদের মানসিক সুস্থতায় বিনিয়োগ মানে দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, গবেষণা, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ। শিক্ষার্থীদের নীরব আর্তনাদ উপেক্ষা করার সময় আর নেই। এখনই সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে আমরা একটি সুস্থ, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব।

মো. আবু তারেক: সাইকোলজিস্ট, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ড. মো. শিবলুর রাহমান: পরিচালক, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও