শ্রদ্ধাঞ্জলি

আলোচনাকে কখনো একতরফা শিক্ষাদানে পরিণত করতেন না আবুল কাসেম ফজলুল হক

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য পাওয়া যাবে তার প্রত্যক্ষ শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে। আর ব্যক্তি আবুল কাসেম ফজলুল হককে উপলব্ধি করা সম্ভব তার সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত কারণে তার সংস্পর্শে আসা মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কারণ তার বিশেষত্ব শুধু তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তার বড় পরিচয় ছিল মানুষকে আপন করে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন শিক্ষক খুব বেশি নেই, যাদের নাম উচ্চারণ করলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (১৯৪৪-২০২৬) সেই বিরল শিক্ষকদের অন্যতম। তিনি ছিলেন এমন এক মনীষী, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তিনিষ্ঠ অবস্থান, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং আজীবন জ্ঞানচর্চার প্রতি অঙ্গীকার তাকে সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য পাওয়া যাবে তার প্রত্যক্ষ শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে। আর ব্যক্তি আবুল কাসেম ফজলুল হককে উপলব্ধি করা সম্ভব তার সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত কারণে তার সংস্পর্শে আসা মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কারণ তার বিশেষত্ব শুধু তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তার বড় পরিচয় ছিল মানুষকে আপন করে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আমার নিজেরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে কয়েকবার তার কক্ষে একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সময়ের বিচারে সেই আলাপচারিতা দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু একজন মানুষকে অনুভব করার জন্য কখনো কখনো অল্প সময়ই যথেষ্ট হয়ে ওঠে। সেই অল্প কয়েকটি আলাপেই তার ব্যক্তিত্বের যে দিকগুলো আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল তা হলো তার বিনয়, নিরহংকার মনোভাব এবং শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিকতা। তার মধ্যে কখনো এমন কোনো দূরত্ব তৈরি করা শিক্ষকসুলভ অহংকার দেখিনি, যা অনেক সময় জ্ঞানচর্চার মানুষকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তার কক্ষে প্রবেশ করতে শিক্ষার্থীদের সংকোচ বোধ হতো না, নিজের কথা বলতে ভয় লাগত না; বরং তাদের কাছে মনে হতো, তারা একজন গভীর জ্ঞানী অথচ অত্যন্ত আপন মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতেন, সহজ ভাষায় উত্তর দিতেন এবং আলোচনাকে কখনো একতরফা শিক্ষাদানে পরিণত করতেন না।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট অতিক্রম করছে। দলীয় প্রভাব, গোষ্ঠীগত আনুগত্য, পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা, প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং সংকীর্ণ স্বার্থের রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ঐতিহাসিক শ্রদ্ধা ও আস্থা ছিল, তাতেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে এ প্রতিকূল সময়েও কিছু শিক্ষক তাদের ব্যক্তিত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা এবং বৌদ্ধিক সততার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাদেরই একজন। তিনি কোনো প্রশাসনিক পদ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কিংবা সুবিধাভোগী অবস্থানের কারণে সম্মানিত হননি; বরং তিনি সম্মান অর্জন করেছিলেন স্বাধীন চিন্তা, আত্মমর্যাদাবোধ, নির্লোভ জীবনযাপন এবং সত্য উচ্চারণের সাহসের মাধ্যমে। বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বদ্ধতা তাকে কেবল একটি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। শ্রেণীকক্ষের বাইরে লেখালেখি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও চিন্তার চর্চা তাকে বৃহত্তর সমাজের শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি মানুষকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ গ্রহণ করতে শেখাননি; বরং শিখিয়েছেন কীভাবে যুক্তির আলোকে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে হয় এবং কীভাবে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে হয়। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এটাই যে তিনি কতজনকে শুধু তথ্য দিয়েছেন তা নয়, বরং কতজনের চিন্তার জগৎকে জাগ্রত করতে পেরেছেন। এ অর্থে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক ব্যতিক্রমী শিক্ষক। তিনি শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করেননি; তিনি চিন্তাশীল মানুষ তৈরির চেষ্টা করেছেন।

তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি আসে ২০১৫ সালে। তার সন্তান জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপন সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। একজন পিতার জীবনে সন্তানের অকালমৃত্যু যে কত গভীর ও অসহনীয় বেদনার, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতায় এমন শোক মানুষকে ক্রোধ, প্রতিশোধ কিংবা ঘৃণার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তার দীর্ঘদিনের লালিত মানবিক দর্শন, যুক্তিবোধ ও নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। তার প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করেছিল, তার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা কেবল বইয়ের পৃষ্ঠা বা বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নিজ জীবনদর্শনের গভীরে প্রোথিত ছিল। আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই অসহনীয় ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তেও প্রতিশোধের আবেগে নিজেকে সমর্পণ করেননি। তিনি কেবল হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং চিন্তার গভীরতা তাকে নিয়ে গিয়েছিল আরো বৃহত্তর এক মানবিক উপলব্ধির দিকে। তিনি চেয়েছিলেন তার সন্তানের মৃত্যু যেন সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়; মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটায়; ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসার প্রেরণা দেয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল কয়েকজন অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনলেই সমাজের গভীরে প্রোথিত অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা, ঘৃণা ও নৈতিক অবক্ষয়ের অবসান হবে না। একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, নৈতিক শিক্ষার বিকাশ এবং এমন এক সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না।

ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কেও তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও মানবকল্যাণ। তিনি মনে করতেন, কোনো বিশ্বাস, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রধর্ম কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক-সাংবিধানিক প্রশ্ন যদি মানুষের মধ্যে বিভাজন, বিদ্বেষ ও সংঘাত বাড়িয়ে তোলে, তবে সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। তার চিন্তায় মতাদর্শ ছিল মানুষের জন্য; মানুষ কখনো মতাদর্শের জন্য নয়। সমাজবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচয় থাকলেও তিনি কোনো মতবাদের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। তার কাছে একটি কল্যাণমুখী সমাজের ভিত্তি ছিল সহমত, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানুষের মধ্যে বিবেচনাশক্তির বিকাশ। মতের পার্থক্যকে তিনি সংঘাতের কারণ হিসেবে দেখেননি; বরং যুক্তিনির্ভর সংলাপের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আজকের বাংলাদেশে, যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ভিন্নমতকে প্রায়ই শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জনপরিসরের ভাষা ক্রমেই আক্রমণাত্মক, অসহিষ্ণু ও বিভাজনমুখী হয়ে উঠছে, তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা ও জীবন আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

কোনো শ্রেষ্ঠ মানুষের প্রকৃত পরিচয় বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুহূর্ত সম্ভবত তার সাফল্যের সময় নয়; বরং তার জীবনের গভীরতম সংকট ও দুঃখের মুহূর্ত। কারণ সুখ-সাফল্যের সময়ে মানুষ অনেক সময় সামাজিক প্রত্যাশা, পরিচিতি কিংবা পরিস্থিতির দ্বারা পরিচালিত হন। কিন্তু ব্যক্তিগত বেদনার মুহূর্তে মানুষ তার অন্তর্গত বিশ্বাস, নৈতিক শক্তি ও মানবিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনজন হারানোর শোক মানুষকে এক গভীর আত্মপরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়। কেউ কেউ সেই বেদনা থেকে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার পথে অগ্রসর হন, কেউ ঘৃণার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতিকে বৃহত্তর মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত করেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই বিরল পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বা একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ নন; তিনি পরিণত হয়েছেন একটি নৈতিক উচ্চতার প্রতীকে।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে ব্যক্তিগত বেদনা মানুষকে সংকীর্ণ করতে বাধ্য নয়; বরং গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে সেই বেদনাই তাকে আরো উদার, আরো মানবিক এবং আরো দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি সমাজের নৈতিক নির্মাতা, চিন্তার পথপ্রদর্শক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক গঠনের অন্যতম কারিগর। এমন মানুষ একটি সমাজে খুব বেশি জন্ম নেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মতো উচ্চতার আরো বহু শিক্ষক তৈরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বিবেকবান সমাজ নির্মাণের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন ভূমিকা পালন করতে পারবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কারণ তিনি কেবল জ্ঞানচর্চার মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন একজন বিরল বুদ্ধিজীবী, যিনি চিন্তা, চরিত্র ও মানবিকতার মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধ রচনা করতে পেরেছিলেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের একজন, যাদের জীবন কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়; অনুসরণ করার বিষয়। মুক্তবুদ্ধির চর্চা, স্বাধীন চিন্তার সাহস এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য দীর্ঘদিন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সহিষ্ণু সমাজ নির্মাণের যে স্বপ্ন আমরা লালন করি, আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবন সেই স্বপ্নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে কেবল তাকে স্মরণ করে নয়, বরং মূল্যবোধ, চিন্তার স্বাধীনতা, বৌদ্ধিক সততা এবং মানবিকতার চর্চাকে আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে ধারণ করার মধ্য দিয়ে।

ড. মাহরুফ চৌধুরী: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

আরও