দিবস

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে হিসাব পেশার গুরুত্ব

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (আইফ্যাক) প্রতি বছর ১০ নভেম্বর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং ডে পালন করে। তবে সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সাফা) দিনটি ‘অ্যাকাউন্ট্যান্সি এডুকেশন ডে’ হিসেবে পালন করে। বাংলাদেশে আইসিএবি, আইসিএমএবি, এসিসিএ বাংলাদেশ, সিজিএ, চার্টার্ড অফিসার লিমিটেড পৃথক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (আইফ্যাক) প্রতি বছর ১০ নভেম্বর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং ডে পালন করে। তবে সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সাফা) দিনটি ‘অ্যাকাউন্ট্যান্সি এডুকেশন ডে’ হিসেবে পালন করে। বাংলাদেশে আইসিএবি, আইসিএমএবি, এসিসিএ বাংলাদেশ, সিজিএ, চার্টার্ড অফিসার লিমিটেড পৃথক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালন করে। আইসিএবি ও আইসিএমএবি সংস্থা দুটি এ দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ অন্যান্য কর্মসূচি পালন করে। আজ আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান দিবসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং অলিম্পিয়াড-২০২১’। সারা দেশের পাশাপাশি করপোরেট সেক্টরে উচ্চমানের পেশাদার পরিষেবা প্রদানের জন্য নিবেদিত এবং দেশের পেশাদার হিসাবরক্ষকদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বিবেচিত ‘সিএফও ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ’ (সিএফও বিডি) আলোচিত অনুষ্ঠানটির আয়োজন করতে চলেছে।

আজকের এই নির্দিষ্ট তারিখটি বেছে নেয়ার পেছনের কারণ হলো, ১৪৯৪ সালের ১০ নভেম্বর লুকা বার্টোলোমিওডি প্যাসিওলি ভেনিসে ‘সুম্মা ডি এরিতমেটিকা, জিওমেট্রিয়া প্রপোরসনি এট প্রপ্রোরশনালিটা’ নামের বইটি প্রকাশ করে। সেই সময়ে এটিই ছিল প্রথম বই, যেখানে গাণিতিক জ্ঞানকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা হয়। তিনি এ বইয়ে ডাবল এন্ট্রি বুককিপিং বা হিসাবরক্ষণ ও বাণিজ্যিক হিসাববিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি তখন যেসব পদ্ধতি প্রকাশ করেন, তার বেশির ভাগই আজ হিসাবচক্রে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া তিনি আয় বিবরণী প্রস্তুত করার জন্য আয় ও ব্যয়গুলো এবং উদ্বৃত্তপত্র বা ব্যালান্স শিট প্রস্তুত করার জন্য সম্পত্তি, দায় ও মূলধনের বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বছর শেষের সমাপ্তি এন্ট্রিসহ ট্রায়াল ব্যালান্স ও ব্যাখ্যা বা প্রমাণের সুষম ব্যবহার দেখিয়েছেন। এছাড়া তার সমীক্ষা অ্যাকাউন্টিং নীতিমালা থেকে কস্ট অ্যাকাউন্টিং পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এসব কারণেই লুকা প্যাসিওলিকে ‘ফাদার অব অ্যাকাউন্টিং’ বলা হয়। এই দিনে তাই আমরা সবসময় লুকা প্যাসিওলির সেই বিখ্যাত মন্তব্য—‘যতক্ষণ না ডেবিট সমান ক্রেডিট হয়, ততক্ষণ একজন ব্যক্তির রাতে ঘুমাতে যাওয়া উচিত নয়’—মনে রাখার মাধ্যমে তাকে বিশেষভাবে স্মরণ করতে পারি।

১৯৭২ সালে এ দিবসটি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে মানুষ এই দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে হিসাবরক্ষকদের সম্মান জানায়। তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে পাবলিক ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট্যান্ট উভয়কেই প্রশংসাসূচক চিঠি এবং উপহার দেয়া হয়। অ্যাকাউন্টিং ফার্মের কর্মচারীরাও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে উপহার পান এবং যারা শীর্ষ পারফরমার তারা বিশেষ স্বীকৃতি পান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রধান নির্বাহীরা (সিইও) তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে এমন উচ্চকর্মসম্পাদনকারী হিসাবরক্ষকদের তাত্ক্ষণিক পুরস্কার এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপনপত্র দিতে পারেন। বাংলাদেশেও একই অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে, কারণ এই দিনটি আমাদের জন্য সেই কঠোর পরিশ্রমী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়।

আমাদের বাংলাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই অ্যাকাউন্ট্যান্সিকে পেশা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর প্রয়োজনীয় আর্থিক রিপোর্টের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের দ্বারা সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে দুটি পেশাগত সংস্থা হিসাববিদদের প্রতিনিধিত্ব করে, যার একটি হচ্ছে দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। আর অন্যটি হচ্ছে দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসরা অ্যাকাউন্টিং ফার্মের মাধ্যমে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন ও প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন এবং আর্থিক হিসাববিজ্ঞান, আর্থিক নিরীক্ষা ও আয়কর বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসরা খরচ নিরীক্ষা, ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান এবং সেই সঙ্গে সাধারণ হিসাববিজ্ঞান ও আয়কর বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। আইসিএবি ও আইসিএমএবি উভয়ই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং বাংলাদেশ সরকার উভয়কেই পেশাগত অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে সমানভাবে মূল্যায়ন করে। সম্প্রতি হিসাববিজ্ঞান পেশাকে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য এবং ত্রুটিমুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) পাস করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গঠন করা হয়েছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে হিসাববিজ্ঞান পেশায় স্বচ্ছতা ও সর্বজনগ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে ।

পেশাগতভাবে ও সঠিকভাবে হিসাব প্রস্তুত করার গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিকভাবে লেনদেন লিপিবদ্ধ করা ও বজায় রাখার সঙ্গে ব্যবসায়ের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে। সঠিকভাবে হিসাব না রাখার কারণে বিশ্বের অনেক বড় বড় কোম্পানি দেউলিয়া হওয়াসহ আইনি জটিলতায় পড়েছে। আমাদের দেশের অনেক কোম্পানিও অনেক সমস্যায় পড়েছে। পেশাগতভাবে ও সঠিকভাবে হিসাব রাখার অন্যতম গুরুত্বগুলো হলো: ১. দ্রুত ও সঠিকভাবে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা, ২. নগদ অর্থের নিয়ন্ত্রণের তথ্য সরবরাহ করা, ৩. কোম্পানির পরিচালকদের নির্ভুল তথ্য প্রদান করা, ৪. আর্থিক অবস্থা মূল্যায়নপূর্বক রিপোর্ট প্রস্তুত করা, ৫. রাজস্ব ও খরচের মধ্যে সামঞ্জস্য নিরূপণ করা, ৬. ব্যবসায়ের পরিকল্পনার সঙ্গে কর্মদক্ষতা পরিমাপ করা, ৭. আয়কর ও মূল্যসংযোজন করের বাধ্যবাধকতা পালন করে জরিমানা এড়ানো, ৮. শেয়ারহোল্ডারদের যথাযথ তথ্য ও স্বার্থ সংরক্ষণ করা, ৯. ব্যাংকারদের সঠিকভাবে ও নির্ভুল তথ্য প্রদান ও ঋণ পেতে সাহায্য করা, ১০. অতীত বিশ্লেষণ তুলনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করা, ১১. ভালোভাবে ব্যবসা অপারেশন করা, ১২. দেশের কোম্পানি আইন পালন করা, ১৩. বাইরের নিরীক্ষকদের যথাযথ তথ্য প্রদান, ১৪. ব্যবসা পরিচালনা সহজ ও ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা এবং ১৫. পরিবর্তনগুলো পরিচালনা পর্ষদের কাছে তুলে ধরা। সুতরাং বলা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য হিসাববিজ্ঞান ও হিসাব পেশার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ উন্নয়ন তখনই নিশ্চিত হবে, যখন দক্ষতার সঙ্গে নির্ভুলভাবে হিসাব প্রণয়ন করা হবে। এ দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য আমাদের পেশাগত হিসাব শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং ডে বা অ্যাকাউনট্যান্সি এডুকেশন ডে-তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্ভুলভাবে সঠিক সময়ে হিসাব প্রণয়ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা এবং সবার স্বার্থ সংরক্ষণ করে নিজের ও ব্যবসার তথা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা পালন করা।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান দিবস-২০২১ আমরা আগের মতোই বিভিন্ন উপায়ে উদযাপন করতে পারি। যেমনভাবে আইসিএমএবি ও আইসিএবির সম্মানিত সদস্যদের দ্বারা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পেশাজীবী খাতের লোকেরাও এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি পালনের জন্য শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সাফা) এরই মধ্যে পেশা হিসেবে অ্যাকাউন্টিং এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবদানের তাত্পর্য ও মূল্যকে সমুন্নত রাখতে বাকি বিশ্বের সঙ্গে যোগদানের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করতে এগিয়ে এসেছে।

দিনটিকে আরো ব্যাপকভাবে উদযাপন এবং গুরুত্বারোপের অংশ হিসেবে দিনটিকে হিসাবরক্ষকদের জন্য ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে এবং কিছু স্বনামধন্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান সেমিনারের আয়োজন করতে পারে, যেখানে বিশিষ্ট হিসাবরক্ষকদের অভিজ্ঞতা, অন্তর্দৃষ্টি এবং মতামত বিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। যদিও আইসিএবি ও আইসিএমএবি সভা-সেমিনারের আয়োজন করলেও আরো ব্যাপকভাবে নানা ধরনের অ্যাকাউন্টিং বিষয়ক কর্মশালা বা শেখার সেশনেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যাতে কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার ও সচেতনতা অর্জনের সময় তাদের দক্ষতা পরিমার্জন করার সুযোগ পেতে পারেন। একটি প্রতিষ্ঠানের কম অভিজ্ঞ কর্মচারীরাও তাদের সিনিয়রদের এবং আরো অভিজ্ঞ পেশাদারদের শ্রেষ্ঠত্বের স্তরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। স্কুল ও কলেজগুলো বিতর্ক, সেমিনার ও অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা করতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা সমস্যা সমাধানের অনুষ্ঠানগুলোয় অংশ নিতে এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখতে পারে।

আজকাল শিক্ষার্থীরা অধ্যয়নের ক্ষেত্র হিসেবে অ্যাকাউন্টিং সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। অ্যাকাউন্টিং অনুশীলনের ওপর আরো বেশি সভা-সেমিনার শিক্ষার্থীদের নতুন প্রজন্মকে বিষয়টির ব্যবহার এবং ক্রমবর্ধমান তাত্পর্য সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করবে; যা একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পেশাদার হিসাবরক্ষককে অন্যান্য কর্মচারীর উদ্ভাবন ও উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। এতে তারা সমাজে আরো বেশি অবদান রাখতে পারবেন বলে বিশ্বাস করি।

 

মো. শফিকুল আলম: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস

আরও