অর্থনৈতিক সংস্কার ও কমিউনে আঘাত

পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইরান, ভারত, ইনকা, মায়ার মতো প্রাচীন চীনের সভ্যতা। ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর এক নতুন চীনের যাত্রা হয়। নানা রকম সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে চীন অন্যতম এক পরাশক্তি। জিডিপির হিসাবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির শক্তি ও

পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইরান, ভারত, ইনকা, মায়ার মতো প্রাচীন চীনের সভ্যতা। ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর এক নতুন চীনের যাত্রা হয়। নানা রকম সংস্কার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে চীন অন্যতম এক পরাশক্তি। জিডিপির হিসাবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির শক্তি দুর্বলতা, সাফল্য ব্যর্থতা এবং ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে লিখেছেন আনু মুহাম্মদ

১৯৮০ থেকে দেংয়ের নেতৃত্বে বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বাড়ে। দেশের ভেতরে সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরকষাকষির তত্পরতাও বাড়ে। ব্রিটেনের সঙ্গে অনেক দেনদরবারের পর হংকং পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা হয়। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৪তে চীন যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘোষণায় ১৯৯৭ সালের মধ্যে হংকংকে ফেরত দেয়ার ঘোষণা আসে। এক দেশ দুই ব্যবস্থা নীতি তখনই ঘোষিত হয়। একই নিয়মে পর্তুগালের কাছ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ম্যাকাও দ্বীপপুঞ্জ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা হয়। এক দেশ দুই ব্যবস্থা একটি নতুন উদ্ভাবন, যার ভিত্তিতে হংকং এখনো পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি হংকংয়ে দীর্ঘ প্রতিবাদ চলছে অধিকতর স্বাধীনতা গণতন্ত্রের জন্য। তাত্পর্যপূর্ণ যে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ হংকংয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মধ্যে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছে!

১৯৭০ দশকের শেষ থেকেই দেশের ভেতর অর্থনৈতিক সংস্কারের যুক্তি যেভাবে বিন্যাস করা হয় তা থেকে দুটি নতুন ধারণা-শব্দমালার ব্যবহার শুরু হয়। এগুলো হলো চীনের বৈশিষ্ট্যে সমাজতন্ত্র (socialism with Chinese characteristics) এবং সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি (socialist market economy) যুক্তি ছিল চীন সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক স্তরে আছে, এখন প্রয়োজন দ্রুত শিল্পায়ন, আধুনিকীকরণ, সমৃদ্ধি। এর জন্য বাজার, প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিমালিকানা, বিদেশী বিনিয়োগ, রফতানিমুখী বিকাশ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সবই ব্যবহার করতে হবে। বলা হলো কেউ ধনী হলে কোনো ক্ষতি নেই বরং সবারই লাভ। পূর্ব এশিয়ার দ্রুত শিল্পায়িত দেশগুলো একভাবে মডেল হিসেবে চীন কর্তৃপক্ষের সামনে ছিল বলে অনেকের ধারণা।

সংস্কারের প্রথম পর্যায়েই আক্রমণ বা দ্রুত প্রবৃদ্ধি আধুনিকীকরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার শিকার হয় চীন বিপ্লবের অন্যতম প্রধান স্মারক কমিউন। কারণ চীনের বিপুল জনসংখ্যা, কৃষি ভিত্তি, দুর্বল অবকাঠামোর মধ্যে দ্রুত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সবার শিক্ষা চিকিৎসা নিশ্চিত করায় প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ, শিল্প কৃষির সম্মিলনের মধ্য দিয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন, সর্বোপরি জনগণের সামষ্টিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে বিপ্লবের বিকাশ সবকিছুর জন্য কমিউন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৮৪ সালে চীনের সংস্কার কর্মসূচির প্রথমদিকে চীনে বিপ্লবী রূপান্তরের শক্তি সমস্যা সম্পর্কে আমি চীনে সমাজতন্ত্র শ্রেণী সংগ্রাম শীর্ষক লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। তাতে কমিউন ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ এবং উৎপাদন সম্পর্ককে বিপ্লবীকরণের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নির্দিষ্ট করেছিলাম। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ থেকে তাতে দেখিয়েছিলাম, কমিউন ব্যবস্থায়, () ক্ষুদে উৎপাদনের শর্তাবলি উত্খাত করে বৃহদায়তন উৎপাদন প্রবর্তিত হয়েছিল। যার ফলে উন্নতমানের চাষাবাদ পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় এবং উৎপাদন উৎপাদনশীলতা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। () ব্যক্তিগতভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে সমষ্টিগত অংশগ্রহণে উন্নীত করা হয়েছিল। () ব্যক্তিগত মালিকানাকে সামাজিক মালিকানায় উন্নীত করা হয়েছিল। () সমষ্টিগত বৃহদায়তন উৎপাদনের পদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে এর মালিকানাধীনে প্রচুর গ্রামীণ হালকা শিল্প স্থাপন সম্ভব হয়েছিল। () কৃষি কৃষকের আয়সীমা বৃদ্ধি পেয়েছিল অনেকগুণ। এর ফলে একদিকে কৃষি উদ্বৃত্ত সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ভারী শিল্পের ব্যয়ভার বহন এবং অন্যদিকে শিল্পপণ্যের বাজার বিস্তার সম্ভব হয়েছিল। () গ্রামাঞ্চলে ধনী কৃষক, প্রাক্তন জমিদার, জোতদার এবং কৃষকদের মধ্যে থেকে যারা সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরবিরোধী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠছিল, তাদের ক্ষমতা খর্ব হয়েছিল। () সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অবকাঠামোর বিপুল উন্নতি হয়। বন্যা, খরা, পোকা ইত্যাদির অভিশাপও কমিউন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রধানত জনশক্তির ব্যবহার করেই দূর করা সম্ভব হয়। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পানি সংরক্ষণ, জীবন উন্নয়ন, পশুপালনসহ কৃষিতে কারণেই বাড়তি প্রায় ১০ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। () ব্যাপক কৃষক জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে তাদের জীবনের মান উন্নত করা সম্ভব হয়েছিল। () সামাজিক মালিকানা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং তাদের মতাদর্শগত সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চালনা করার ফলে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার বিস্তার ঘটে, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশেও যা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। (১০) কৃষি শিল্পের সংযুক্তি বাড়ে। নতুন রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ সংযুক্তি নিয়ন্ত্রণও বাড়তে থাকে।

অর্থনৈতিক সংস্কারে কমিউন ব্যবস্থাই আঘাতপ্রাপ্ত হয় প্রথম।

কমিউন থেকে পারিবারিক দায়িত্ব প্রথা

দেং জিয়াও পিংয়ের নেতৃত্বাধীন সংস্কার কর্মসূচির শুরুর দিকেই চীন বিশেষজ্ঞ চার্লস বেটেলহেইম লিখেছিলেন,

কৃষি এবং শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালনা পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যে তাতে কৃষক-শ্রমিক ক্রমাগতভাবে উঁচুমাত্রায় কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের ক্রীড়নক হয়ে পড়ছে এবং কর্তৃত্বের ওপর আগের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।... কৃষিকে এখন শুধু পুঁজির পুঞ্জীভবনের বৃহত্তম ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে কমিউন ভেঙে ফেলা একেবারেই সম্ভব ছিল না, সংস্কারও খুব সহজ ছিল না। কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক প্রশ্ন প্রতিরোধ মোকাবেলা করতে হয়েছে। সমাজতন্ত্র, মাওয়ের চিন্তাধারা নাম দিয়েই সংস্কার শুরু হয় এবং এসব শব্দাবলি বা দাবি থেকে চীনের পার্টি পরেও কখনো সরে আসেনি। যৌথ কৃষি ব্যবস্থাকে -যৌথকরণের পথে নাম দেয়া হয় পারিবারিক দায়িত্ব প্রথা household responsibility system এটি হলো একধরনের চুক্তিভিত্তিক বা ইজারা ব্যবস্থা। এর অধীনে ক্রমান্বয়ে প্রতি কৃষক পরিবারকে চুক্তি ভিত্তিতে বিভিন্ন প্লট দেয়া হয়। বলা হয়, ব্যবস্থায় উৎপাদিত শস্যের নির্দিষ্ট অংশ কর্তৃপক্ষকে দেয়ার পর বাকিটা কৃষকরা নিজেরা রাখতে পারবে। এর ফলে ক্ষুদ্রায়তন একক কৃষি আবার শুরু হয়, যৌথ ব্যবস্থা ভেঙে পারিবারিক ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থার সূচনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ কেউ দাবি করেন, কোথাও কোথাও উৎপাদন টিমগুলোকে ভেঙে তিন থেকে পাঁচ পরিবার নিয়ে এক একটি ইন্টিগ্রেটেড উৎপাদন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এগুলোর চরিত্র ছিল মোটামুটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির অনুরূপ।

তবে হয়তো প্রতিরোধ পরিণতি বিবেচনাতেই সংস্কারে নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে শক্তভাবেই, জমির ওপর ব্যক্তিমালিকানার পুনঃপ্রতিষ্ঠার চাপ তৈরি হলেও তার আইনি কর্তৃত্ব অনুমোদন করা হয়নি। ব্যক্তি বা পরিবারকে জমি চাষের অধিকার দেয়া হলেও কখনই সেই জমির ওপর তার আইনি মালিকানা অনুমোদন করা হয়নি। বিপ্লব-পূর্ব পরিস্থিতি ফেরত এসেছে রকম তাই বলা চলে না। চীনের সংস্কার প্রক্রিয়ার ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক রতন খাসনবিশ লিখেছেন,

১৯৪৯ সালে চিন দেশে যখন রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে তখন এশিয়ার যে কোনো পশ্চাদপদ দেশের মতোই সে দেশে সম্পত্তির মূল উৎস ছিল কৃষিজমি। ভূমিসংস্কার, সমবায় আন্দোলন এবং কমিউন ব্যবস্থা গড়ে তোলাএই তিনটি ধাপের মধ্য দিয়ে চিনে কৃষিজমিতে ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটে। কৃষিজমির কেনাবেচার অধিকার সেখানে লুপ্ত হয় এবং কৃষক তার প্রাপ্য পেতে থাকে তার ওয়ার্কপয়েন্ট অর্থাৎ কাজের মাত্রা অনুসারে।... ১৯৭৯ সালে সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে চিনে কমিউন ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। জমিতে চাষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয় কৃষক পরিবারের হাতে। কৃষিজমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা কিন্তু ফিরিয়ে আনা হয়নি। অর্থাৎ জমি যিনি চাষ করছেন, ইচ্ছে করলে সে জমি তিনি বিক্রি করে দিতে পারেন না। কৃষক ইচ্ছে করলে চাষ বন্ধ করে অন্য কোথাও অন্য জীবিকার সন্ধানে চলে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে তার জমি ফেরত যাবে গ্রাম পঞ্চায়েতেসে জমি আবার পুনর্বণ্টন হবে। এক্ষেত্রে অকশন বা বাজার থেকে জমি কেনা-বেচার ব্যবস্থা নেই। গ্রাম কমিটি তা বিলি করবে সভা ডেকে।... সংস্কার যেটা ঘটিয়েছে তা হল কৃষিপণ্যকে খোলা বাজারে নিয়ে আসা (চিনে ৯৫ শতাংশ পণ্যশিল্প, কৃষি, সেবাপণ্যএখন কেনাবেচা হয় খোলা বাজারে)

একই বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ চন্দ্রশেখর জয়তী ঘোষ লিখেছেন,

সংস্কারের প্রথম পঞ্চবৎসরে (১৯৭৯-১৯৮৪) গ্রামীণ জনগণের কমিউন ভেঙে ফেলা হয়েছিল, সমতার ভিত্তিতে পরিবারপিছু জমি ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, শস্য প্রথম এই নীতি বর্জন করার জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়েছিল, উৎসাহ দেয়া হয়েছিল উৎপাদনের বৈচিত্র্যকরণে এবং কৃষিজাত উৎপাদনের মূল্য ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। রাসায়নিক সারের সরবরাহও দ্রুত করা হয়েছিল।

চীনের কৃষি উৎপাদনে সার, কীটনাশক, জিএম প্রযুক্তির ব্যবহারও এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে এসবের ভূমিকা কম নয়। সংস্কারে বাজারমুখিতার বিস্তার, বাজারকেন্দ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

সংস্কার প্রক্রিয়ার আরেকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্কারের প্রথম দিকেই, ৭০ দশকের শেষে, পুরনো ভূমি মালিক, সামন্তপ্রভু, বুর্জোয়া ধনপতিদের কাছ থেকে বিপ্লবকালে যেসব জমি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং তার দ্রুত বাস্তবায়ন ঘটে। যার ফলে জনসংখ্যার খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশের হাতে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ জমা হয়।

 

আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও