এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের শ্রমবাজারে বর্তমানে শ্রম ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে শ্রমশক্তি ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে ও শিশু জন্মহার কমছে। ফলে বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। কমসংখ্যক শিশু জন্ম নেয়ায় ভবিষ্যতে তরুণ কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জাপান উন্নত শিল্পপ্রধান দেশ হওয়ায় উৎপাদন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ইত্যাদি খাত বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় উৎপাদন ও সেবা খাতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় শ্রমশক্তি ঘাটতি মেটাতে জাপান সরকার বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের জন্য ভিসানীতি শিথিল করেছে। ফলে জাপানে নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ ও জাপানি ভাষায় অভিজ্ঞ বিদেশী শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কৃষিকাজ, নির্মাণ খাত, কেয়ার গিভার, অটোমোবাইল, শিপিংসহ মোট ১৬টি ক্যাটাগরিতে দেশটিতে শ্রম রফতানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অবারিত এ সুযোগ বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারছে না। তবে বাংলাদেশ পর্যাপ্তসংখ্যক শ্রমিক পাঠাতে ব্যর্থ হলেও প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশটিতে যাচ্ছেন এবং তাদের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ জাপানে শ্রমশক্তি পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ভাষাজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকা। এছাড়া দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতার অভাব এবং বিগত সরকারগুলোর যথাযথ উদ্যোগেও ঘাটতি ছিল। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নিতে হবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উদ্যোগ।
২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (আইএম) জাপানের সঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় সরকারিভাবে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে দেশটিতে। দেশের বিভিন্ন জেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জাপানি ভাষার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। তবে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল নতুন করে বিনা খরচে আরো কর্মী পাঠাতে জাপানের বেসরকারি একটি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে সরকার। এতে বলা হয়, বাংলাদেশী কর্মীরা বিনামূল্যে জাপানি ভাষা ও কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। প্রশিক্ষিত কর্মীরা বিনা অভিবাসন ব্যয়ে জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। এদিকে গত ২৯ মে ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় জাপান সরকারের কাছ থেকে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ শ্রমিক পাঠানোর প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ।
যদিও জাপান সরকার এক লাখ শ্রমিক নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তব ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে পাঠানো যাবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জাপানে কাজ করতে হলে জাপানি ভাষায় দক্ষতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের এ ভাষা দক্ষতা অর্জনে এখনো বড়সড় প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। জাপান মূলত চায় দক্ষ ও জাপানি ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শ্রমিক। বাংলাদেশে অনেক শ্রমিক থাকলেও সবাই সেই মান অনুযায়ী প্রশিক্ষিত নন। বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য প্রয়োজন ভিসা প্রসেসিংসহ প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদন। কিন্তু এ প্রক্রিয়াগুলো সময়সাপেক্ষ, জটিল ও ধীর। এছাড়া ভাষা শেখার জন্য প্রশিক্ষণার্থীর ছয় মাসের সময়ের প্রয়োজন। এ দীর্ঘ সময় নিজেদের ব্যয় বহন করতে না পেরে মাঝপথে ঝরে পড়ে অনেকেই। এক্ষেত্রে সরকারে উচিত আর্থিক সহায়তা দিয়ে কর্মীকে দক্ষ করে তোলা। বাংলাদেশের বিদেশী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল) চক্রের সক্রিয়তা লক্ষ করা যায়। এতে সঠিকভাবে শ্রমিক পাঠানো বিঘ্নিত হয়।
কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অন্তত ১০ লাখ মানুষ বৈদেশিক শ্রমবাজারে পাড়ি জমাচ্ছেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বিদেশে জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনাময় খাতটি দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ এনে প্রায়ই বাংলাদেশ থেকে শ্রমশক্তি নেয়া বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে প্রায় এক বছর।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানব পাচারের মতো অপরাধের মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বিদেশে উন্নততর জীবনযাপনের প্রত্যাশায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা দালালের খপ্পরে পড়ছেন নিয়মিত। চলতি বছরের শুরুর দিকে গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে মানব পাচারই সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করে মোটা অংকের টাকা। এ অর্থ দিতে না পারলে তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। এমনকি কাউকে কাউকে মেরেও ফেলা হয়। আবার বাংলাদেশ থেকে নৌপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় পাচার হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশকে এখন বিভিন্ন শিল্পে শ্রমদাস হিসেবে বা রেড লাইট এরিয়ায় বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা ঘটছে অনেক। আবার মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসনের প্রভাব পড়েছে বৈধ অভিবাসীদের ওপরও। তাদের অনেকেও দালালদের প্রতারণার কারণে গন্তব্যে পৌঁছে কাজ পাননি।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত ‘জাপানের শ্রমবাজার: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণের মান অপর্যাপ্ত। বেশির ভাগ প্রশিক্ষক জাপানি ভাষা ভালো জানেন না। প্রশিক্ষকরা সাধারণত জাপানফেরত এবং আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভাষা শিখেছিলেন। উচ্চ বেতনের কারণে প্রশিক্ষক আনতে বেসরকারি অপারেটরদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত এন-ফোর কোর্স নেই এবং এ স্তরের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকও নেই। এসব কারণে বাংলাদেশ থেকে আশানুরূপ কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একজন কর্মীর কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ভাষার দক্ষতাও প্রয়োজন। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং ইউরোপের স্কুলে শিশুদের অন্তত দুটি বিদেশী ভাষা শেখানো হয়, সেখানে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে আমাদের তেমন উদ্যোগ দৃশ্যমান নেই। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, জাপান অনুমোদিত ৯৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাত্র ৩০টি প্রতি বছর কর্মী পাঠাচ্ছে। ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ বছরে এসব এজেন্সির মাধ্যমে মাত্র ৫ হাজার ১৪ জন কর্মী জাপান যেতে পেরেছেন। এছাড়া আইএম জাপান নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সময়কালে ৭০২ কর্মী জাপানে গেছেন। যদিও বাংলাদেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে নেপাল। নেপালের বেশিসংখ্যক কর্মী পাঠানোর কারণ হচ্ছে তাদের আমলাতন্ত্র অনেক শক্তিশালী। তাছাড়া অভিবাসন খাতকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। ফলে তাদের এ খাত অনেক শক্তিশালী।
যদিও জাপান সেল গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছে সরকার। এসব উদ্যোগ কথায় সীমিত না থেকে বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি। জাপানে শ্রমশক্তি রফতানির সুযোগ তৈরি হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। এ সুযোগ যদি পরিকল্পিত ও দক্ষভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশে প্রচুর শিক্ষিত তরুণ বেকার রয়েছে কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র। জাপানের চাহিদা অনুপাতে দক্ষ ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শ্রমিক পাঠাতে পারলে দেশের বেকারত্ব অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এজন্য জাপানি ভাষা শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।