জানা গেছে, উৎপাদনে থাকা ২০টি গ্যাস ক্ষেত্রে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মজুদ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩২১ বিলিয়ন কিউবিক ফুট বা ছয় টিসিএফের কিছু বেশি। জুন নাগাদ তা নেমে এসেছে ছয় টিসিএফে। বছরে গড়ে ৭০০ বিসিএফ স্থানীয় উৎপাদনের হিসাব ধরলে এ মজুদ দিয়ে দেশ চলবে বড়জোর আট বছর। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলনে ব্যর্থতার পেছনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি ও ভুল সিদ্ধান্তও দায়ী। এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার গুরুত্ব ও বাস্তবায়নযোগ্যতা খতিয়ে দেখা জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর থেকে আশির দশক পর্যন্ত জ্বালানি অনুসন্ধানে একটি জোরালো উদ্যোগ ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে শিল্পে গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার না থাকা ও মজুদ পর্যাপ্ত থাকার ভ্রান্ত ধারণার কারণে অনুসন্ধানের গতি হারিয়ে যায়। আবিষ্কৃত গ্যাস ক্ষেত্রগুলোকেও কাজে লাগানো যায়নি। ভোলা নর্থ, ভোলার ইলিশা ও সিলেটের জকিগঞ্জে আবিষ্কৃত গ্যাস ক্ষেত্রের মজুদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়নি। এছাড়া পাঁচটি পরিত্যক্ত গ্যাস ক্ষেত্রে অন্তত ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। উৎপাদন ও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় দেশের মোট ১০টি পরিত্যক্ত ক্ষেত্রের ১ হাজার ৩৩৪ বিসিএফ মজুদ এখনো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়নি।
প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে সম্প্রতি বাজেট দিয়েছে বিএনপি সরকার। বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর আওতায় আগামী তিন বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ বর্গকিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ কিলোমিটার টুডি এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি জরিপ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে নতুন ৬৯ কূপ খনন এবং পুরনো ৩১টির ওয়ার্কওভার। সমুদ্রে অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে পিএসসি কাঠামো সংশোধন করে নতুন করে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহারের প্রস্তাব রয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় সরকার অতীতের ক্যাপাসিটি চার্জনির্ভর নীতিকে বার্ষিক ৪০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির বোঝার জন্য দায়ী করে জানিয়েছে, অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ ও ক্রয়চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে এ খাতে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। প্রতিশ্রুতিগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও দিকনির্দেশনা হিসেবে সঠিক। সমস্যা হলো, স্থানীয় সম্ভাবনা অনুসন্ধানে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো উচ্চাভিলাষী ও দিকনির্দেশনা হিসেবে সঠিক। কিন্তু বাজেটের সংখ্যা বলছে ভিন্ন কথা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা, আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে হচ্ছে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৩৯৩ কোটি টাকা। যে খাতে গত ১৭ বছরে কার্যকর অনুসন্ধান না হওয়ার অভিযোগ সরকার নিজেই তুলছে, সেই খাতে এত সামান্য বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯টি নতুন কূপ খনন, ৩১ কূপের ওয়ার্কওভার এবং পাঁচটি নতুন রিগ সংগ্রহের মতো ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। গবেষণা সংস্থা সানেমও একই উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ বিভাগের মোট উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র আড়াই শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ঘোষিত জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যর্থতার প্রকৃত কাঠামোগত কারণগুলো মোকাবেলার সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট। দেশের সিসমিক জরিপ ১০-১৫ বছরের পুরনো হওয়ায় কূপ খনন করেও প্রত্যাশিত গ্যাস মিলছে না। থ্রিডি জরিপে রূপান্তরের কাজ এখনো কমিটি গঠনের পর্যায়ে। পরিত্যক্ত ক্ষেত্রগুলোর ১ হাজার ৩৩৪ বিসিএফ মজুদ আটকে থাকা মামলা ও উত্তোলন জটিলতা নিরসনে কোনো সময় নির্দিষ্ট পরিকল্পনার উল্লেখ বাজেটে নেই, যদিও কয়েকটি বিদেশী কোম্পানি পিএসসি মডেলে এসব ক্ষেত্রে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে। জকিগঞ্জ ও ভোলার আবিষ্কৃত ক্ষেত্র বছরের পর বছর গ্রিডের বাইরে থাকার পেছনে যে পাইপলাইন-অবকাঠামোর ঘাটতি দায়ী, তা দূর করার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও বাজেট বক্তৃতায় অনুপস্থিত। এ অবস্থায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এজন্য এ খাতে বরাদ্দ বাস্তবসম্মত পর্যায়ে আনা জরুরি। ১০টি পরিত্যক্ত গ্যাস ক্ষেত্রের মজুদ উদ্ধারে সময়সীমা বেঁধে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে মামলা জটিলতা ও উত্তোলন সংকট নিরসন করা প্রয়োজন। আবিষ্কৃত অথচ অব্যবহৃত গ্যাস ক্ষেত্রগুলোকে গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রাধিকারভিত্তিক বরাদ্দ ও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা উচিত। সংশোধিত পিএসসি কাঠামোয় ঘোষিত অফশোর বিডিং রাউন্ডের অগ্রগতি ধাপে ধাপে জনসম্মুখে প্রকাশ করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করতে হবে।
দশকের পর দশক ধরে নেয়া ভুল সিদ্ধান্তের সমষ্টিগত ফল হিসেবে গ্যাসের মজুদ কমেছে। তবে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নতুন সরকারের দিকনির্দেশনা সঠিক পথেই রয়েছে। বাপেক্সের পুনরুজ্জীবন, নতুন কূপ খনন, অফশোর বিডিং রাউন্ড ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনা—প্রতিটিই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশীয় উৎপাদনকে জোর দেয়ার বিকল্প নেই।