সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব নেয়ার আগে একসময় সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার একদমই ভিন্ন দায়িত্বে। কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?
আমার রাজনৈতিক জীবনে এটা নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিলে কাজের পরিধি অনেক বড় থাকে। সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে তা এত বড় নয়। তার পরও দায়িত্ব পেলে তা সঠিকভাবে পালনের সদিচ্ছা রাখাটাই জরুরি। সিটি করপোরেশন মানুষকে সরাসরি নানা নাগরিক সেবা দেয়। এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ নানা প্রয়োজনে আসে। আগের সরকারের আমলে নাগরিক সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব ছিল। এজন্য দীর্ঘদিন সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভ আর হতাশা ছিল। তবে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর আবার নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছি। দায়িত্ব নেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন খুলনাকে বর্জ্যমুক্ত গ্রিন সিটিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিতে। সে অনুযায়ীই কাজ করছি।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসন হিসেবে আমার দায়িত্ব নেয়ার তিন মাস হয়েছে। এ তিন মাসে নাগরিকদের সমস্যা, প্রত্যাশা জানার চেষ্টা করেছি এবং সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছি। গ্রিন সিটিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক এ নিয়ে কাজ হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা নর্দমাগুলোকে বর্জ্যমুক্ত করা। খুলনা শহরে বড়-ছোট মিলিয়ে ২২টি খাল ছিল একসময়। এসব খাল দিয়েই শহরের পানি নিষ্কাশন হতো। সেসব জায়গা দীর্ঘদিনে আটকে গেছে। গত তিন মাস এসব খাল পরিষ্কারের কাজ করেছি। এভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আরো উন্নত হচ্ছে।
সামনে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি রয়েছে। এটি প্রতিরোধে প্রস্তুতি কেমন?
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, উন্মুক্ত পরিবেশে যেন বর্জ্য না রাখা হয়। এজন্য আমরা কাজ করে চলেছি। ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে। এর আগে যে ২২টি খালের কথা বলেছি, ওগুলোর বেহাল দশার কারণে অনেক মশা জন্ম নিত। মশা নিধনের জন্য আমাদের কাজ করতে হয়েছে। আবর্জনামুক্ত হওয়ায় মশা নিধনের কাজটিও সহজ হয়েছে। এবার আমরা টেন্ডারের মাধ্যমে ভেজালমুক্ত ওষুধ কিনেছি। অতীতে এটি নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ওই অনিয়ম যাতে না হয় সেটা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এজন্য জনসচেতনতাও জরুরি। সবার ঘরে ঘরে যেন ডেঙ্গু জন্ম নেয়ার সুযোগ না পায়, সেজন্য জনসচেতনতামূলক নানা উদ্যোগ নেয়ার কথা ভেবেছি। এছাড়া এলাকাবাসী, ধর্মীয় ও সামাজিক নানা প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে এ সমস্যা মোকাবেলায় কী কী কর্মপদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, তা নির্ধারণে আমরা কাজ করে যাব। তবে আবর্জনা নির্মূল করার মাধ্যমে অনেকটাই মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও আমাদের একই সতর্কতা থাকবে।
খুলনা নগরীর জন্য নিরাপত্তা সবসময়ই জনমনে বড় প্রশ্ন। এক্ষেত্রে মাদক বিস্তারের কারণেও অপরাধ বাড়ছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে অবশ্যই কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে?
জনগণের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে। নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী গড়া অবশ্যই আমাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা অনেকাংশে কমে। ওই সময়েই খুলনা নগর ও আশপাশের এলাকায় মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। গত দেড়-দুই বছরে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে শতাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এখনো অনেক অপরাধ ঘটছে। এগুলো উদ্বেগজনক। বিশেষত কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বড় সমস্যা। এখন পর্যন্ত যত খুন হয়েছে তার সিংহভাগই মাদকের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। এদিকে চাঁদাবাজিও বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর আছে। সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে তারা নতুন তালিকা করছে এবং এজন্য অভিযান অব্যাহত রাখবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের পরিকল্পনা আছে। আবার আমরাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। তবে সিটি করপোরেশনের জন্য এটাই প্রাইম টাইম। এজন্য নাগরিক সভার আয়োজনের পাশাপাশি পুলিশিং কমিটি করা দরকার। প্রত্যেক এলাকায় পাহারার ব্যবস্থাও করতে হবে। এমনকি মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নেই। ফলে সিটি করপোরেশনের কাজ করার ক্ষেত্রে কি অসুবিধা হচ্ছে না?
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকলে যে ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায় সেটি এখন নেই। তার পরও এখন সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দুটো দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের দাপ্তরিক কাজ বাদেও কাউন্সিলরের কাজ কর্মকর্তাদের করতে হচ্ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দিয়ে তা করতে হচ্ছে। তবে নির্বাচিত কাউন্সিলর থাকলে সেবা দেয়া সহজ হয়। বর্তমান অবস্থাটা একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। আমি প্রশাসকের দায়িত্ব নেয়ার পর এসব বিষয় চিহ্নিত করে কাজ করেছি। মানুষ যাতে অল্প সময়ের মধ্যে সেবা পায় সেটা নিশ্চিত করতে চেয়েছি। শিগগিরই সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় এ নির্বাচন হওয়া জরুরি। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকলে জনগণকে সেবা দেয়ার পরিধি আরো বাড়ানো যাবে। কারণ সরকার এরই মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছে।
দায়িত্ব নেয়ার সময় আপনার সামনে একটা অস্বস্তিকর সমস্যা ছিল সিটি করপোরেশনের অনিয়ম-দুর্নীতি। এ নিয়ে জনমনেও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল। এক্ষেত্রে আপনি কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন কি?
দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম কর্মদিবসেই আমি সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করি। ওইদিন সবাইকেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, এখন থেকে আর কোনো অনিয়ম করা চলবে না। যাদের বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাদের সংশোধনের কথা বলেছি। এখানে প্রকৌশল বিভাগে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হতো। এছাড়া কর বিভাগ, পরিচ্ছন্ন শাখা, লাইসেন্স শাখাগুলোয় প্রতিনিয়ত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আসত। চারটি শাখাকে আমরা কঠোর নজরদারির আওতায় এনেছি। এ তিন মাসে এগুলোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে লাইসেন্স শাখায় দালালের দৌরাত্ম্য ছিল। এখন অনলাইনে ফরম পূরণ করেই মানুষ সরাসরি আবেদন করছে।
কর বিভাগেও বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রত্যেক অ্যাসেসমেন্ট হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে পুনর্নিরীক্ষণ করা হয়েছে। অতীতে অনেকে কর ফাঁকি দিয়ে গেছেন বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কর এড়িয়ে গেছেন। আবার সাধারণ মানুষের ওপর বেশি কর ধার্য করা হয়। আমরা ওই বৈষম্য দূর করেছি। প্রকৌশল বিভাগে টেন্ডারবাজি আর কাজে গাফিলতির অভিযোগ ছিল। এখন আমরা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। মানসম্মত কাজ করতে না পারলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকায় ফেলা হবে। এমনকি তাদের পাওনাও পরিশোধ করা হবে না। কাজের গুণগত মান দেখার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এগুলো গত তিন মাসে করতে হয়েছে। মানুষ এখন তার সুফল পাচ্ছে।
সিটি করপোরেশনগুলোয় প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এসব প্রকল্প আলোর মুখ দেখে না, এ অভিযোগ বহুদিনের। এক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা খুলনার জন্য একটি বড় সমস্যা। জলাবদ্ধতা নিরসনে নেয়া প্রকল্পগুলোর কী অবস্থা? আপনারা আর কী নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন?
হ্যাঁ, সিটি করপোরেশনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে উদাসীনতা সবসময় ছিল। জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গেই বলি। অতীতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ওই অর্থের সদ্বব্যবহার হয়নি। নামমাত্র খাল খনন হয়েছে, অপরিকল্পিতভাবে নর্দমা করা হয়েছে। এজন্য সামান্য বৃষ্টিতেও খুলনা শহর ডুবে যেত। তবে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর যে ২২ খালের কথা বললাম, সেগুলোর ওপর গড়া অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করেছি। অনেকে প্রভাব খাটিয়ে খালের জায়গা দখল করে বহুতল ভবন বানিয়েছিল। সেগুলো ভেঙে দেয়া হচ্ছে। ড্রেনের ভেতর পলি জমে ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। আশা করছি, এবারের বর্ষায় নগরবাসী এর সুফল পাবেন। আগের চেয়ে জলাবদ্ধতা অনেক কমবে। আমরা একটি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে এটির দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি। ওয়াসার সঙ্গেও একটি সমঝোতা হয়েছে। তারা যদি নগরের কোনো সড়ক বা নর্দমায় সংস্কার করে, তাহলে সেগুলো মেরামতও করে দেবে। জলাশয়ের বিষয়ে সরকারের নীতিমালা রয়েছে। নগরীর ৫০টি পুকুর সংরক্ষণের উদ্দেশে এগুলোকে জলাশয় আইনের আওতায় এনে সরকার নোটিস দিয়েছে। উন্মুক্ত জলাশয়, পুকুর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। নতুন করে কোনো পুকুর কেউ যেন ভরাট করতে না পারে, আমরা সেটা বাধা দিই এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছি।
খুলনা শহরের আরেকটা বড় সমস্যা রাস্তাগুলো উঁচু হয়ে যাচ্ছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে ওয়াসার প্রকল্পটি নেয়া হলে পরামর্শকরা জানিয়েছিলেন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য ড্রেন উঁচু করতে হবে। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন, সামনের নদীর বেড উঁচু হয়ে গেছে। তাই শহরের ড্রেনটা উঁচু করতে হবে। তবে আমাদের মনে হয়েছে এটা একটা ভুল ধারণা। শহরের পানি বের করার জন্য বেসিন তৈরি করা দরকার ছিল। বেসিনে পাম্পের মাধ্যমে বাইরে পানি নিষ্কাশন করা যেত। তা না করে রাস্তা এবং ড্রেন উঁচু করায় প্রত্যেকটা বাড়ির নিচতলা এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। তবে ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমরা আরো যত্নবান হব, যাতে শহরবাসী ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গটি নিয়ে আরেকটু আলোচনা করা দরকার। অতীতে এটি পুরনো নীতিমালায় হতো। এখন কি এটিকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন?
এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় চমক। দেশে এবারই প্রথম খুলনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি রিসাইক্লিং প্রজেক্ট চালু হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সিটি করপোরেশন ও এডিবি যৌথভাবে এটি বাস্তবায়নের কাজ করছে। এ প্রকল্পের জন্য মূল বরাদ্দ ৭৫ কোটি। আগামী ১ জুলাই প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। এরপর ডিসেম্বরে এটি পুরোপুরি চালু করার ভাবনা রয়েছে। যদি এটি চালু হয় তাহলে এটিই দেশের প্রথম বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রকল্প হবে। এখান বর্জ্য শোধন করে জ্বালানি সংগ্রহ করা যাবে, সার তৈরি হবে এমনকি পলিথিনও তৈরি করা যাবে। খুলনা শহরের সব বর্জ্য শুরুতে পৃথক্করণের মাধ্যমে ঘরবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হবে। সেগুলো এসটিএসে নিয়ে যাওয়ার পর সলুয়ার বর্জ্য পরিশোধন প্লান্টটিতে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রকল্পটি সফল হলে দেশের অন্য জায়গায়ও চালু করা যাবে। তবে বর্জ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্লান্টে নিয়ে যাওয়ার কাজটি চ্যালেঞ্জিং। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত তিনটি কাজ নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।
খুলনায় সড়কে শৃঙ্খলা, যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ও নিরাপদ সড়কের বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা আছে কি?
অবশ্যই আছে। সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য পরিবহন মালিকদের নিয়ে একটি বৈঠক করা হয়েছে। এছাড়া ইজিবাইক, ট্রাক, ইঞ্জিন রিকশা, রিকশাচালকদের সঙ্গেও মতবিনিময় হয়েছে। আমরা কয়েক ধাপে কাজ করতে চাই। যেহেতু পরিবহনের সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা জড়িত, আমরা চাই না কেউ উপার্জন হারাক। তাই প্রথমে ইজিবাইককে শৃঙ্খলায় আনা হবে। সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স দেয়া ইজিবাইকগুলোকে রঙিন করা হবে। শহরের বাইরে থেকে আসা যানগুলোর প্রবেশাধিকার শহরের আটটি প্রবেশমুখে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এভাবে শহরে ইজিবাইকের সংখ্যা কমিয়ে আনা যাবে। এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের মতো ইজিবাইককে আমরা লাইসেন্স দিয়েছি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত এসব ইজিবাইক শনাক্ত করতে লাল বা সবুজ রঙ করে দেয়া হবে।
ফুটপাত হকারমুক্ত করার উদ্যোগ আছে। আবার হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিচ্ছি। এগুলো পরিকল্পনায় আছে। তবে যানজট নিরসনটা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের প্রকল্পগুলোও যানজট নিরসনের বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফুটপাত ও সড়ক—এ দুইটা মিলিয়েই নগরকে সুন্দর করতে হবে। নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তবে আগের মতো বড় বাস না, আমরা মিনিবাস দিয়ে কাজ করতে চাই। এসবই এমনভাবে করতে হবে যেন সবাই স্বস্তি পায়। নির্বিঘ্নে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারেন। এমনকি এ শহরকেও বড় করার পরিকল্পনা আমাদের আছে। একেক ওয়ার্ডে ৩০-৪০ হাজার ভোটার আছেন। সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডের পক্ষে এত মানুষের সেবা দেয়া কঠিন। তাই এ কাঠামোকে আমরা ঢেলে সাজাতে চাই।
বেকারত্ব গোটা দেশের জন্যই বড় সমস্যা। সরকার অবশ্য কর্মসংস্থান গড়ার আশ্বাস দিয়েছে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের তরুণদের কর্মসংস্থানের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
হ্যাঁ, আছে। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে সরকারকে জানানো হয়েছে। আমরা একটা ভাষা ইনস্টিটিউট করতে চাই। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কর্মশালার আয়োজন করব। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুয়েটের উপাচার্যদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈশ ডিপ্লোমা কোর্স চালুর বিষয়ে আলাপ হয়েছে। এগুলো এখন তাদের পরিকল্পনায় আছে। খুলনা স্বল্প পরিসরের নগর। তার পরও এখানে ইনস্টিটিউশন গড়ার বিষয়ে আমাদের জোর চেষ্টা আছে। যেমন আমরা নার্সিং ইনস্টিটিউশন গড়তে পারি। এখানে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ নার্স তৈরি করে বিদেশে পাঠানো যেতে পারে। এসব পরিকল্পনা বাজেট ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে।
খুলনার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা কি আছে?
এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। মাঝে স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুলনা এসেছিলেন। তখন আমরা সব হাসপাতাল ভিজিট করি। শিক্ষামন্ত্রীও এসেছিলেন। তাকে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছি। খুলনা মেডিকেল কলেজ ও খুলনা সদর হাসপাতালের যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম দরকার, তার একটা তালিকা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। উনি জানিয়েছেন এসব রসদ সরবরাহে কাজ করবেন। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেগুলো ভাঙাচোরা, পানি পড়ে কিংবা যে শ্রেণীকক্ষগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা, সেগুলো আমরা মেরামতের কাজ শুরু করেছি। এজন্য তালিকা করা হচ্ছে।
যেকোনো নগরের বাসযোগ্যতার জন্য খোলা স্থান ও সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে পার্ক, খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা দরকার। তবে খুলনায় এসবের সংকট রয়েছে। এ বিষয়ে কি আপনাদের ভাবনা আছে?
বিগত সরকারের আমলে খেলাধুলায় যথেষ্ট মনোযোগ আসেনি। স্টেডিয়াম আছে, তবে খেলা আয়োজন হয় না। শুধু ক্রীড়া সংস্থায় দলীয়করণ হয়েছে। আমরা এ সংস্কৃতি থেকে বেরোতে চাই। ক্রীড়াঙ্গনকে নতুনভাবে সাজাতে চাই। এরই মধ্যে সরকারের নির্দেশনা এসেছে, শহরে সিটি করপোরেশন, কেডিএ, অন্যান্য বিভাগে শহরের যত খালি জায়গা আছে, সেসব পরিদর্শনে খুলনায় ক্রীড়ামন্ত্রী আসবেন। খেলার পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি আমরা শিশুদের খেলার মাঠ ও পার্কমুখী করতে চাই। আমরা কয়েকটা পার্ককে আবার সুসজ্জিত করেছি। কিছু মাঠে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদিকে খুলনা টেক্সটাইল মিলের পেছনে অনেক বড় জায়গা আছে। ওই জায়গাটা আমরা চেয়েছি। ওখানে পার্ক ও বাগান করে একটা সায়েন্স সিটির মতো কিছু গড়তে চাই, যাতে শিশু-কিশোররা সেখানে গিয়ে শিখতে পারে। এসব পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত জানানো হবে। এছাড়া নদীতীর ও তীরবর্তী অনেক দখল হয়ে যাওয়া জায়গায় আমরা গাছ লাগাতে চাই। মানুষ যেন এখানে ঘুরতে আসে, সেজন্য বেঞ্চ ও সড়ক বানাতে চাই। শহর আর নদীতীর দুটোই সুন্দর করে সাজাতে চাই আমরা।
শরীরচর্চা ও সুস্থ বিনোদনের পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চারও বিকল্প নেই। একসময় খুলনায় অনেক সিনেমা হল ছিল। থিয়েটারেরও অনেক অভাব। সংস্কৃতি অঙ্গন নিয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা আছে?
নিশ্চয়ই আছে। শিববাড়ী মোড়ে জিয়া হল। জিয়া হলটা নষ্ট হয়ে গেছে। বিগত সরকারের আমলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে ওটা পুনরুদ্ধারের একটা প্রকল্প আমরা সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছি। এজন্য সরকার ৪১১ কোটি টাকার বরাদ্দের অনুমোদন দিয়েছে। এবার বাস্তবায়ন পদক্ষেপ। জিয়া হলের ভবনেই একটা ফ্লোরে পাঠাগার করা হবে। খুলনার শিক্ষার্থীদের এটা অনেক দিনের দাবি। ওখানেই সিনেপ্লেক্স গড়ার দাবি এসেছে। আমরা পুরনো ধাঁচের সিনেমা হল বানাতে চাই না। এগুলোর বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে।
এমনিতে অনেক দিন খুলনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন অনেক দুর্বল ছিল। দলীয়করণের দিকে এত মনোযোগ দেয়ায় এমন হয়েছে। সিটি করপোরেশন সাংস্কৃতিক অঙ্গন তো বটেই, সব পক্ষকেই সহযোগিতা করবে। জাতীয় দিবস, রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীসহ সব ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন শহীদ হাদীস পার্কে করা হবে। আমরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নতুনভাবে সাজাতে চাই। জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সবসময় অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখতে চাই। যাতে সবাই সেখানে যেতে ও উপভোগ করতে পারেন। খুলনার ঐতিহ্য বহু পুরনো। আমাদের জন্য গর্বের বিষয়, শহরের পাশ দিয়েই আছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বাড়ি। ফুলতলায় তার শ্বশুরবাড়ি। সংস্কৃতির মাধ্যমে চিত্তবিনোদন নিশ্চিত করা জরুরি। একটি নিরাপদ ও সুন্দর শহরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক নগরী গড়ার পরিকল্পনা আছে আমাদের। আমরা জাদুঘরও বানাতে চাই। শিগগিরই ‘কেমন খুলনা শহর চাই’ শিরোনামে একটি নাগরিক সভা ডাকতে চাই। নাগরিকদের প্রত্যাশাকে জেনেই আমাদের যাত্রা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করেছি।