প্রয়াণ

অধ্যাপক আবুল কাসেমের মৃত্যুতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার শূন্যতা আরো গাঢ় হলো

বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই।

বেলা আড়াইটা-তিনটার দিকে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সংবাদটি পেয়ে ব্যথিত হয়েছি। আমার এটিই মনে হয়েছে যে তার আকস্মিক প্রয়াণে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে শূন্যতা আরেকটু বাড়ল।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দীর্ঘদিন বাংলা বিভাগে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় তারও আগে। উনি বয়সে আমার ছোট ছিলেন। ফলে তিনি শিক্ষার্থী থাকা অবস্থা থেকেই আমাদের পরিচয় হয়েছিল। অধ্যাপক আবুল কাসেমের সঙ্গে আমার বহু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বহুবার দেখাও হয়েছে। এজন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি মননশীল লেখালেখির চর্চা করেন এমন অল্প কজনকেই সামনে থেকে দেখেছি। অধ্যাপক আবুল কাসেম ছিলেন তাদের একজন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে সবসময়ই সাক্ষাৎ হতো। তবে উল্লেখ করার মতো স্মৃতি তো কিছু থাকে। এর মধ্যে তার ছেলের মৃত্যুর সময়ের কথাটি আমার মনে পড়ে। অকালে ছেলে সন্তানকে হারানোর পর তিনি শোকটাকে সামলে নিয়েছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং গোটা পরিস্থিতি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন। তাকে খুবই সাহসী দেখিয়েছিল। ওই সময় তার মনের জোর আমাকে ভীষণ স্পর্শ করেছিল। আমি বারবার ভেবেছি, এত বড় শোক তিনি কীভাবে বহন করলেন? আর কীভাবেই বা তা সামলে নিলেন?

তিনি লেখালেখির পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গেও। দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন। মৌলিক পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে তিনি নিয়মিত ভাবতেন। তার চিন্তাধারায় এক ধরনের মৌলিকত্ব ছিল। রাজনীতি প্রসঙ্গে তার ভাবনা ছিল স্পষ্ট। সেটিকে বিশ্লেষণ করে তিনি নিয়মিত লিখেছেন, মন্তব্য দিয়েছেন। বাংলা সংবাদপত্রে তার সমৃদ্ধ বিশ্লেষণ বহু পাওয়া যাবে। অধ্যাপনা জীবনেও তিনি অনেক শিক্ষার্থীকে পথ দেখিয়েছেন। তাদের অনেকে এখন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত। অনেকে সাহিত্যচর্চার সঙ্গে। তাদের অনেকেই প্রিয় শিক্ষকের আকস্মিক প্রয়াণে স্তব্ধ হওয়ারই কথা।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (সেপ্টেম্বর ৩০, ১৯৪০-জুলাই ৫, ২০২৬)

আরেকটা বিষয় তাকে আলাদা করবে। তিনি অনেক লিখতেন। লেখালেখির চর্চা থেকে নিজেকে কোনোদিন বিরত রাখেননি। শ্রম ও যত্ন দিয়ে লিখে গেছেন। অনেকটা একক প্রচেষ্টায় তিনি ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটো সাময়িক পত্র সম্পাদনা করতেন। নিজেই তার সম্পাদনা করতেন। সেটা ছাপানোর ক্ষেত্রেও তিনি যত্নশীল ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। এছাড়া তিনি অনেকগুলো মননশীল বইয়ের লেখকও ছিলেন। সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতিকে অবলম্বন করেই তিনি অধিকাংশ লেখা লিখেছেন। তার বইগুলোতে সেই মননশীলতার ছাপ পাওয়া যাবে।

সব মিলিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক একজন মননশীল ও সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী ব্যক্তি ছিলেন। এ মননশীলতা তিনি গড়েছিলেন গবেষণামনস্ক মানসিকতার মাধ্যমে। এজন্য তার মৃত্যুসংবাদ আমাকে মর্মাহত করেছে। কারণ তার এ মৃত্যুর ফলে আমাদের আশপাশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে শূন্যতা আরেকটু গাঢ় হলো। তার প্রস্থানে শূন্যতাটা বাড়লই। সেটি সামনে পূরণ হবে কিনা বলা কঠিন। তবে আবুল কাসেম ফজলুল হক আমাদের কিছুটা পথ দেখিয়ে গেছেন। সে পথ ধরে এগিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে তার চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওই চর্চাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টাও করতে হবে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও