দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের সরকার,
অর্থনীতি বিশ্লেষক,
সুশীল সমাজ,
থিংকট্যাংক থেকে
শুরু করে
সচেতন জনগণের
মধ্যে বেশ
উদ্বেগ ও শঙ্কা লক্ষ
করা যাচ্ছে।
২০২০ সালের
প্রথম দিক
থেকে প্রায়
দুই বছর
করোনা মহামারীর
কারণে বিশ্ব
অর্থনীতি স্থবিরতা
কাটিয়ে ওঠার
আগেই ২০২২
সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
বাধার কারণে
বিশ্বের অর্থনীতিতেই অশনিসংকেত পরিলক্ষিত হয়।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত প্রায়
সব দেশেই
মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ
ব্যবস্থায় বিপত্তি,
উৎপাদন ও আমদানি-রফতানি
হ্রাস, কর্মসংস্থান হারানোসহ নানা বিপর্যয়
দেখা দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের প্রায় অধিকাংশ
দেশ, আফ্রিকা
ও এশিয়ার
দেশগুলোয় ৯-১০ শতাংশ
মূল্যস্ফীতি
ঘটে। বিশেষ
করে জ্বালানি
তেল, গ্যাস,
খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যস্ফীতি জনগণের
জীবন মানে
সরাসরি আঘাত
করে। দেশে
দেশে অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস লক্ষ
করা যাচ্ছে।
উন্নত বিশ্বের
অর্থনীতির সংকোচন,
মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ
ব্যবস্থায় বিপত্তির
ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও
বিপর্যয়ের মধ্যে
পড়েছে। এশিয়া,
ইউরোপ ও আফ্রিকার কোনো
কোনো দেশে
মূল্যস্ফীতি ৪০-৫০ শতাংশে
উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সামাজিক
ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠিন সময়
পার করলেও
মন্দাসহ নানা
সংকটে অর্থনীতি
ভেঙে পড়ার
আশঙ্কা নেই।
কারণ বিগত
দুই দশকেরও
অধিক সময়ব্যাপী অর্থনীতির ক্রমবর্ধিত অগ্রগতি
দেশকে একটি
মৌল ভিত্তির
ওপর দাঁড়
করেছে। বিশেষ
করে কৃষি
ও শিল্পোৎপাদন, সার্ভিস সেক্টরের বিস্তৃতি
এবং জনগণের
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির
ফলে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষাবস্থার সম্ভাবনা কম।
অবশ্য অসৎ
ব্যবসায়ীদের মজুদদারি,
কালোবাজারি ও মুনাফাখোরি আচরণ,
আমদানি-রফতানির
আড়ালে মুদ্রা
পাচার, ব্যাংকের
ঋণখেলাপি, দুর্নীতি
ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে অবস্থা
অন্য রকম
হতে পারে।
এ মুহূর্তে আমাদের
বড় সমস্যা
বা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক
মুদ্রার অস্থিতিশীলতাসহ টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি
বৃদ্ধি ও রফতানি হ্রাসের
কারণে বাণিজ্য
ঘাটতি, বৈদেশিক
মুদ্রা রিজার্ভের ক্রমহ্রাস এবং জ্বালানি
সংকটের কারণে
বিদ্যুৎ উৎপাদন
হ্রাস।
বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরোর
তথ্যমতে, গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ
অতিক্রম করেছে।
কতিপয় থিংকট্যাংকের জরিপ মতে, প্রকৃত
মূল্যস্ফীতি ১০-১২ শতাংশ
বা তদূর্ধ্ব
হতে পারে।
বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ছাড়াও অসৎ ব্যবসায়ীদের কারসাজিও দেশের মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির
কারণে একদিকে
যেমন অধিক
পরিমাণে বৈদেশিক
মুদ্রা খরচ
করে খাদ্যদ্রব্যসহ উৎপাদনের উপকরণ আমদানি
করতে হচ্ছে,
অন্যদিকে সংঘবদ্ধ
ব্যবসায়ীদের বাজার
নিয়ন্ত্রণের ফলে
দ্রব্যমূল্য বেড়েই
চলেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তরল গ্যাস
ও জ্বালানি
তেলের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
বয়ে এনেছে।
জ্বালানিস্বল্পতার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে
না পারায়
কল-কারখানার
উৎপাদন অব্যাহত
রাখার জন্য
প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ
সরবরাহ সম্ভব
হচ্ছে না।
অধিকাংশ ক্ষুদ্র,
মাঝারি ও বড় বড় শিল্প-কারখানা
৪০-৬০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে চালু রাখা হয়েছে।
ফলে উদ্যোক্তারা লোকসান গুনছেন, শ্রমিক
কাজ হারাচ্ছেন।
বৈদেশিক
মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা, ডলারের বিপরীতে টাকার
অবমূল্যায়ন বাংলাদেশ
ব্যাংকের ফরেন
কারেন্সি রিজার্ভের ওপর প্রবল চাপ
সৃষ্টি করেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড
পরিমাণ প্রায়
৮৩ বিলিয়ন
ডলার মূল্যের
আমদানির বিপরীতে
রফতানি আয় হয়েছে ৫২ বিলিয়ন ডলার।
ফলে প্রায়
৩১ বিলিয়ন
ডলার বাণিজ্য
ঘাটতি হয়েছে।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে
১ হাজার
৯৩৫ কোটি
ডলারের পণ্য
আমদানি হয়েছে।
তার বিপরীতে
রফতানি হয়েছে
১ হাজার
১৮০ কোটি
ডলারের পণ্য।
ফলে তিন
মাসেই বাণিজ্য
ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলার।
বাজারে বৈদেশিক
মুদ্রার ঘাটতির
কারণে বিগত
এক বছরে
বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার
বাজারে ছেড়েছে।
এতে ৪৮ বিলিয়ন ডলার
রিজার্ভ নভেম্বর-’২২-এ কমে হয়েছে
৩৪ বিলিয়ন
ডলার। অবশ্য
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
কর্তৃক প্রায়
৮ বিলিয়ন
ডলার রফতানি
উন্নয়ন তহবিল
(ইডিএফ) অন্যত্র
সরিয়ে নেয়ায়
বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৬ বিলিয়ন ডলার।
বৈদেশিক মুদ্রার
বিনিময় হার
খানিকটা বাজারের
ওপর ছেড়ে
দেয়ায় ডলারের
দর এখন
১০৮-১১০
টাকা অর্থাৎ
এক বছরে
টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বিগত
কয়েক মাস
ধরে বৈদেশিক
মুদ্রা নিয়ে
একটি মহল
রীতিমতো ব্যবসা
করছে। কতিপয়
ব্যাংক কর্মকর্তা, পরিচালক, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী এমনকি সাধারণ
মানুষও ডলার
ক্রয়-পূর্বক
ধরে রেখে
উচ্চমূল্যে বিক্রি
করছে। দেশের
একশ্রেণীর মানুষ
সর্বদাই দেশ
ও জনগণের
স্বার্থের বিপক্ষে
গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে। আবার
অনেকে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে ওভার ইনভয়েসিং
ও আন্ডার
ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে
বিদেশে অর্থ
পাচার করছে।
এ বিষয়টি
এখন আর প্রমাণের অপেক্ষা
রাখে না।
বর্তমান অর্থবছরে
আমেরিকা ও ইউরোপে আমাদের
রফতানি দ্রব্যের
চাহিদা কমে
যাওয়ায় রফতানি
আয়ের প্রবৃদ্ধিও গত বছরের তুলনায়
কম হচ্ছে।
অর্থবছরের বিগত
চার মাসের
রফতানি আয়ের
প্রবৃদ্ধি মাত্র
৭ শতাংশ,
যা গত অর্থবছরের একই
সময় ছিল
২২ দশমিক
৬২ শতাংশ।
বিদেশে
কর্মরত বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের
প্রবৃদ্ধি গত চার মাসে
মাত্র ২ শতাংশ। রেমিট্যান্সের জন্য বর্তমানে বাংলাদেশ
ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক
মালিকদের যৌথভাবে
নির্ধারিত বিনিময়
হার প্রতি
মার্কিন ডলারে
১০৭ টাকা
অথচ ডলারের
বাজারদর এর চেয়ে বেশি।
ফলে ব্যাংকের
পরিবর্তে হুন্ডির
মাধ্যমে প্রবাসী
আয় পাঠানোর
পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়ানোর
লক্ষ্যে প্রবাসী
আয়ের বিনিময়
হার বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে
বাড়ানোর প্রয়োজন
বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বৈদেশিক
মুদ্রার ওপর
চাপ কমানোর
জন্য সরকারের
আমদানি নিয়ন্ত্রণ কৌশল গ্রহণের ফলে
বিলাস দ্রব্য
ও অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় দ্রব্য
আমদানিতে ব্যাংক
কর্তৃক এলসি
খোলায় বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে আমদানি
কিছুটা কমেছে,
কিন্তু ব্যাংকগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির
এলসি খুলতেও
অনীহা প্রকাশ
করছে।
চিনিসহ
কতিপয় খাদ্যসামগ্রী এবং জ্বালানি তেলের
এলসি খোলায়
গড়িমসি করায়
সংকট দেখা
দিয়েছে। রফতানি
পণ্যের কাঁচামাল
আমদানিতে ঋণপত্র
খুলতে না পারলে উৎপাদন
ও রফতানি
বাধাগ্রস্ত হতে
বাধ্য।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ক্রমান্বয়ে খেলাপি
ঋণের পরিমাণ
দিন দিনই
বাড়ছে। ব্যবসায়
মন্দা বা লোকসানের কারণেই
যে খেলাপি
ঋণ বাড়ছে
তা নয়, অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী
দীর্ঘ সময়
ধরে ঋণ খেলাপির তালিকায়
রয়েছে। এদের
অনেকেই ইচ্ছাকৃত
ঋণখেলাপি। অর্থ
মন্ত্রণালয়ের একটি
প্রভাবশালী মহলের
উদ্যোগে কয়েক
বছর আগে
২ শতাংশ
অর্থ জমা
দিয়ে খেলাপি
ঋণ নিয়মিত
করার সুবিধা
দেয়া হয়েছিল।
গত জুলাই
মাসে বাংলাদেশ
ব্যাংক আড়াই
থেকে সাড়ে
৪ শতাংশ
অর্থ জমা
দিয়ে খেলাপি
ঋণ নিয়মিত
করার আরো
একটি সুযোগ
দেয়। ঋণ পরিশোধের সময়ও
দুই বছরের
স্থলে সর্বোচ্চ
আট বছর
বৃদ্ধি করা
হয়েছে। অনেক
ঋণগ্রহীতা এসব
সুবিধা গ্রহণ
করে খেলাপি
ঋণ নিয়মিত
করে ব্যাংক
থেকে আরো
ঋণ গ্রহণপূর্বক পুনরায় ঋণখেলাপি হয়।
কোনো কোনো
প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার টাকা আদায়ে ব্যাংক
কর্মকর্তারা আগ্রহও
দেখান না।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের
কোনো কোনো
পরিচালকও নামে-বেনামে ঋণ গ্রহণপূর্বক ঋণ ফেরত দিচ্ছেন
না। ফলে
কতিপয় ব্যাংক
বিপর্যয়ের ঝুঁকিও
তৈরি হচ্ছে।
অভিজ্ঞ মহলের
মতে, এসব
ইচ্ছাকৃত খেলাপি
ঋণ বা নামে-বেনামে
গৃহীত ঋণের
টাকা আত্মসাত্পূর্বক বিদেশে পাচার করা
হয়েছে। পাচারকৃত
অর্থ দেশে
ফিরিয়ে আনার
জন্য প্রণোদনা
ও বিশেষ
সুবিধা দেয়া
সত্ত্বেও এ পর্যন্ত কোনো
অর্থ ফেরত
আসেনি।
বৈদেশিক
মুদ্রার স্বল্পতা
দূরীকরণ, ঋণাত্মক
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনের ভারসাম্যে সহায়তা,
বাজেট ঘাটতি মেটানো
ও কতিপয়
গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প
ব্যয় অব্যাহত
রাখার প্রয়োজনে
বাংলাদেশ সরকার
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে
ঋণসহায়তা চেয়ে
আবেদন করেছে।
যদিও আইএমএফ
থেকে প্রাপ্ত
ঋণের পরিমাণ
খুব বেশি
নয় (৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার) তথাপি
আশু ঘাটতি
মেটানোর প্রয়োজনে
এ ঋণ কাজে দেবে।
তবে আইএমএফের
শর্তাদির বিষয়ে
সরকার দরকষাকষি
করছে। ব্যাংক
ও আর্থিক
সংস্কার, রাজস্ব
আয় বাড়ানোর
জন্য আধুনিকায়ন, দুর্নীতি রোধ, খেলাপি
ঋণ আদায়ে
পদক্ষেপ গ্রহণ
প্রভৃতি শর্ত
মানতে কোনো
আপত্তি নেই
বরং এগুলো
যৌক্তিক ও সময়ের দাবি।
তবে সার
ও গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকিসহ সামাজিক সুরক্ষা খাতে
খরচ অব্যাহত
রাখতে হবে।
এরই মধ্যে
আইএমএফের ঋণপ্রাপ্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।
আগামী বছরের
ফেব্রুয়ারিতে প্রথম
কিস্তির ঋণ পাওয়া যাবে।
আইএমএফের ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রতি তাদের
আস্থারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা
হয়।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক সংকট আরো প্রকট হওয়ার আগেই আমাদের কতিপয় বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রতি নজর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্পোৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মজুদদারি, কালোবাজারি, অতিমুনাফালোভীদের অপতত্পরতা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। ব্যাংকের আমানতের সুদের হার অনেক আগেই মূল্যস্ফীতির নিচে চলে গেছে। তাছাড়া ঋণের সুদ কমিয়ে রাখার সুবিধা গ্রহণ করে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার জন্য সুদের হার বৃদ্ধি করা আশু প্রয়োজন।
ঋণখেলাপিদের প্রদত্ত সুবিধা প্রত্যাহারপূর্বক খেলাপি ঋণ আদায়ে
আরো কঠোর
ও তত্পর
হতে হবে।
দেখা যায়
ব্যাংকগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ঋণ আদায়ে বেশ
তত্পর, অথচ
চিহ্নিত খেলাপিদের ঋণ আদায়ে তেমন
উদ্যোগ নেই।
এক্ষেত্রে আইনের
কঠোর প্রয়োগ
প্রয়োজন। খেলাপিদের স্বার্থের চেয়ে আমানতকারীসহ অন্যান্য গ্রাহকের স্বার্থের দিকে নজর দিতে
হবে।
বৈদেশিক
মুদ্রাবাজারের অসাধু
খেলোয়াড়দের চিহ্নিত
করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে বৈদেশিক
মুদ্রা ধরে
রেখে কতিপয়
লোকের ব্যবসা
করা মোটেই
কাম্য নয়।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বৈধ পথে আনার
ব্যাপারে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে
হবে। কার্ব
মার্কেটের দরের
সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসী আয়ের
বিনিময় হার
নির্ধারণ হওয়া
প্রয়োজন, যাতে
বৈধ পথে
রেমিট্যান্স পাঠানো
হয়। তাছাড়া
রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাময় যেসব দেশে বাংলাদেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ নেই, সেসব
দেশে ব্যাংকের
এক্সচেঞ্জ হাউজ
খোলার পদক্ষেপ
নেয়া যেতে
পারে। হুন্ডি
ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত
করার জন্য
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরো তত্পর
ও সচেতন
হতে হবে।
নানা
পন্থায় বিদেশে
অর্থ পাচার
হচ্ছে। ওভার
ইনভয়েসিং এবং
আন্ডার ইনভয়েসিং
রোধে এনবিআর
ও বাংলাদেশ
ব্যাংক যৌথভাবে
ব্যবস্থা নিতে
পারে। বর্তমানে
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ পাচারের
কথা শোনা
যাচ্ছে। এ বিষয়ে নজরদারি
বাড়াতে হবে।
অপরাধ প্রমাণিত
হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ব্যাংক
ব্যবস্থায় বৈদেশিক
মুদ্রার সংকট
থাকায় অনেক
ব্যাংক এলসি
খোলায় অনীহা
প্রকাশ করছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সরকারি ও বেসরকারি
উদ্যোগে খাদ্যপণ্য, সার ও জ্বালানি
আমদানির এলসি
খোলা নিশ্চিত
করতে নির্দেশ
দিয়েছেন। খাদ্যসহ
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের
মজুদ ও সরবরাহ যাতে
বিঘ্নিত না হয় প্রধানমন্ত্রী সেদিকে লক্ষ রাখার
কথা বলেছেন।
উপসংহারে
বলা যায়,
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভীত হওয়ার
মতো সংকটজনক
নয়। আমাদের
মৌলভিত্তি মোটেও
দুর্বল হয়নি।
উপযুক্ত ব্যবস্থা
নিলে রিজার্ভের পরিমাণও বাড়বে। তাছাড়া
গত এক বছরে প্রায়
আট-নয় লাখ কর্মী
বিদেশে গিয়েছেন।
তাদের প্রবাসী
আয়ও ক্রমান্বয়ে রিজার্ভে যুক্ত হবে।
আমাদের সরকারি ঋণ সব মিলিয়ে জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। কোনো কোনো দেশে (যেমন আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন) এ ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশেরও ওপর। ভারতের ঋণ ৫০ শতাংশের বেশি। আমাদের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ কখনো বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হয়নি। তবে আগামী ২০২৪ সাল থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরিমাণ বাড়বে। ঋণ গ্রহণের ও খরচের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হতে হবে।
সামাজিক
সুরক্ষা কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়ে সংকটাপন্ন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ রাজস্ব
সংগ্রহ বৃদ্ধির
জন্য কর ব্যবস্থা সংস্কার
ও আধুনিকায়ন করা জরুরি। প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে
কীভাবে সংকট
মোকাবেলা করা
যায় সেদিকে
দৃষ্টি দিতে
হবে। সর্বোপরি
সরকারের গৃহীত
ব্যবস্থা সম্পর্কে
সময় সময়
জনগণকে অবহিত
রাখতে হবে।
সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরেও
শৃঙ্খলা বজায়
রাখার জন্য
ট্রেড বডিগুলোকে সক্রিয় রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক সংকট
মোকাবেলায় অর্থ
মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ
ব্যাংকসহ সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে একযোগে
কাজ করতে
হবে।
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব
ও এনবিআরের
সাবেক চেয়ারম্যান, বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত