ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের কাছে বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে পূর্ব এশিয়ায় প্রাচীন যে শ্যামদেশ, তাকে এখনকার মানুষ চেনে থাইল্যান্ড হিসেবে। আর এ দেশেই পিং ও নান নদীর সঙ্গম থেকে উৎপত্তি হওয়া চাউ ফ্রায়া নদীর কোলঘেঁষে জল-পলি নিয়ে গড়ে ওঠা মোহময়ী শহর ব্যাংকক। নদীতীরবর্তী শহর হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই শহরটি জুড়ে ছড়িয়ে আছে জালের মতো খালের নেটওয়ার্ক। তাই তো একসময় ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল সমৃদ্ধ এ নগর। জনসংখ্যার চাপ ও নাগরিকদের অসচেতনতায় এক সময় আশীর্বাদের মতো এ খালের নেটওয়ার্কও আমাদের ঢাকা শহরের খালগুলোর মতো পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছিল। দূষণ-দখলের কবলে পড়ে ষাটের দশকে ব্যাংককের খালগুলো ধুঁকছিল। তবে দেশটির সরকার দ্রুত খালগুলোকে আধুনিক শহর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসে এবং খালগুলোকে পুরনো রূপে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। পরিকল্পনার মাধ্যমে থামানো গেছে দখল এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হচ্ছে দূষণ। ফলে ব্যাংকক শহরজুড়ে খালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন এক অর্থনীতি। বর্তমানে ব্যাংককের খালের নেটওয়ার্ক কেবল কংক্রিটের অরণ্য নয়, বরং জলের আল্পনায় আঁকা এক সজীব মহাকাব্য।
থাইল্যান্ডের মানুষ খালকে তাদের ভাষায় বলে ‘খলং’। এ খলংয়ের ইতিহাস ব্যাংকক শহরের চেয়েও পুরনো। ১৫৪০-এর দশকে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফের্নাও মেন্দেস পিন্টো শ্যামদেশ বা স্থানীয় ভাষায় সাইয়ামের তৎকালীন রাজধানী আয়ুথ্যার খালের নেটওয়ার্ক দেখে এ শহরের নাম দিয়েছিলেন প্রাচ্যের ভেনিস। বর্তমানে ব্যাংককজুড়ে অন্তত ১ হাজার ৬০০ খাল আছে। আশ্চর্য বিষয় হলো, এসব খালের বেশির ভাগ কৃত্রিমভাবে তৈরি। ব্যাংককের খাল বা ‘খলং’ ব্যবস্থার শুরু ষোড়শ শতাব্দীতে নদীর সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এটি এক বিশাল পরিবহন ব্যবস্থায় রূপ নেয়। ১৫৫২ সালের দিকে চাও ফ্রায়া নদীর আঁকাবাঁকা পথ সোজা করতে ‘খলং ব্যাংকক নোই’ এবং ‘খলং ব্যাংকক ইয়াই’-এর মতো প্রধান খালগুলো প্রথমে খনন করা হয়। এটি ১৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথকে কমিয়ে মাত্র দুই কিলোমিটারে নামিয়ে আনে, যা তৎকালীন রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করে দেয়। একইভাবে ১৭৮২ সালে নতুন রাজধানী স্থাপনের সময় থাই রাজা প্রথম রামা প্রতিরক্ষা পরিখা এবং ‘খলং রোপ ক্রুং’ অর্থাৎ খালের একটি নেটওয়ার্ক তৈরির নির্দেশ দেন। এসব খাল খননের ফলে গড়ে ওঠে ‘রাত্তানাকোসিন’ বা ‘রত্নকোসিন দ্বীপ’। এ দ্বীপকে কেন্দ্র করেই সে সময় গড়ে ওঠে মূল সুরক্ষিত শহর ব্যাংকক।
বর্তমানে সেই পুরনো রত্নকোসিন দ্বীপ ব্যাংককের খলং ওং আং এবং খলং ব্যাং লাম্পুর পশ্চিম ও দক্ষিণের এলাকায় অবস্থিত। ঐতিহাসিক এ এলাকায় গ্র্যান্ড প্যালেস, ওয়াট ফো এবং এমেরাল্ড বুদ্ধের মন্দিরসহ থাইল্যান্ডের প্রধান সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্থানগুলো অবস্থিত। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশকের ধান উৎপাদন, নিষ্কাশন এবং পরিবহনের সুবিধার্থে ‘খলং রোপ ক্রুং’-কে কেন্দ্র করে শত শত মাইল খাল খনন করা হয়, যা শহরের বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রেলপথের বিস্তার এবং পশ্চিমা ধাঁচের সড়ক পরিবহনের উত্থানের ফলে অনেক খাল ভরাট করে ফেলা হয়। এতে শহরের মনোযোগ পানিপথ থেকে স্থলপথের দিকে সরে যায়। কিন্তু তার পরও যেসব খাল টিকে থাকে, তা এ সময় ব্যাংককের জলপথ বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
থাইল্যান্ড সরকারের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংককে বর্তমানে ১ হাজার ৬৮২টি খাল রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এগুলো নিষ্কাশন ও পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে। শহরের সড়কে যানজট এড়াতে ‘খলং সায়েন সায়েপ’ বোট সিস্টেমের মতো প্রধান খালগুলো এখনো যাতায়াতের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া থনবুরির খলংগুলোর মতো শহরের পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী অংশগুলো দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে বোট ট্যুর অত্যন্ত জনপ্রিয়। শহরের ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে এ জলপথগুলো হয়ে ওঠে প্রশান্তির সোপান, তাই ব্যাংককে খালগুলো এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার আশা।
এবার বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক। বুড়িগঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও একসময় ছিল খালের নগরী। খালকে বলা হতো ঢাকার ‘ফুসফুস’ এবং প্রধান জলনিষ্কাশন পথ। মোঘল আমলে ঢাকাকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যেন খালের মাধ্যমেই শহরের প্রতিরক্ষা, ব্যবসা এবং পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত হয়। তবে বর্তমানে সেই সমৃদ্ধ জলপথের সিংহভাগই দখল আর দূষণের করুণ ইতিহাসের সাক্ষী। নথি অনুযায়ী, একসময় ঢাকায় ৫২টি খালের অস্তিত্ব ছিল। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বর্তমানে ওই ৫২ খালের মধ্যে টিকে আছে প্রায় ৪৩টি খাল। তবে বাস্তবে ২৬-৩০টি খাল কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেছে। অধিকাংশ খালই পরিণত হয়েছে সরু নালায় অথবা বক্স কালভার্টের নিচে হারিয়ে গেছে। তেমনই একটি স্মৃতির জলপথ পরীবাগ খাল। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকেও একসময় মগবাজার থেকে বাংলা মোটর-শাহবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পরীবাগ খাল মিশত বুড়িগঙ্গায়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, গুলিস্তান, মতিঝিল ও পুরান ঢাকার আরো অন্তত ৫০টি ছোটবড় খাল। কিন্তু গত কয়েক দশকে দৃশ্যপট বদলে গেছে। আজ যা ঝকঝকে কংক্রিটের রাস্তার মাঝে পরীবাগ খালের কোনো চিহ্নই নেই। ঠিক যেমন নগরায়ণের চাপে একইভাবে হারিয়ে গেছে পান্থপথ খাল। ব্যাংকক শহর কর্তৃপক্ষ যখন খালের নেটওয়ার্ককে আরো বিস্তৃত করেছে, সেখানে অবহেলা ও উদ্ধার কার্যক্রমের অভাবে দেশের খালগুলো নর্দমায় পরিণত হয়েছে। অনেক স্থানে খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন।
বর্তমানে ঢাকার খালগুলোকে মূলত কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে হাতিরঝিলসংলগ্ন বেগুনবাড়ি খাল, খিলগাঁও-বাসাবো খাল এবং জিরানী খাল বালু নদের সঙ্গে যুক্ত। আবার পশ্চিমাঞ্চলে ধানমন্ডি খাল, রায়েরবাজার খাল ও কাটাসুর খাল যুক্ত বুড়িগঙ্গা বা তুরাগ নদের সঙ্গে। উত্তরা ও মিরপুর এলাকার রূপনগর খাল, বাউনিয়া খাল এবং দিয়াবাড়ি খালেরও গন্তব্য তুরাগ নদ। লক্ষণীয় হলো, এসব খাল যেহেতু শহরের একেবারের প্রাণ কেন্দ্রগুলোয় অবস্থিত, তাই সেগুলো হয়ে দূষণ ছড়িয়ে যাচ্ছে নদীতেও। তাই বিশেষজ্ঞরা বারবার ঢাকার খালগুলো সংস্কারের তাগিদ দিয়ে আসছেন। তবে অবস্থার যে একেবারেই উন্নতি হয়নি তা নয়। সম্প্রতি ঢাকার খালগুলোর দায়িত্ব ওয়াসা থেকে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর ফলে খালের দখল হওয়া জায়গা উদ্ধার, খাল খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, রক্ষণাবেক্ষণ চেষ্টার মতো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। হাতিরঝিলের সফলতার পর এখন জিরানি, মান্ডা, শ্যামপুর ও কালুনগর খালকে কেন্দ্র করে ৮৯৮ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যেখানে খালের পাড়ে সাইকেল লেন, ওয়াকওয়ে ও বসার জায়গা নির্মাণের কথা।
তার পরও আমাদের খাল রক্ষায় আরো অনেক প্রচেষ্টা বাকি। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্যসহ ঢাকার প্রতিটি খাল পুনরুদ্ধারে এক-দেড় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এ অর্থের সংস্থান করাও সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর বাইরে শুধু জনসচেতনতা এবং সরকারের সদিচ্ছা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে খালগুলোকে আবার সজীব করা সম্ভব। ঢাকার ভূপ্রকৃতি ব্যাংককের মতোই জলবেষ্টিত এবং বদ্বীপীয় হওয়ায় ব্যাংককের খালের মডেল আমাদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হতে পারে। ব্যাংকক প্রমাণ করেছে, আধুনিক মেগাসিটিতেও সদিচ্ছা থাকলে জলপথও টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আশার কথা হলো, ঢাকা বর্তমানে ‘ঢাকা ডেল্টা প্ল্যান’ এবং খাল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে ব্যাংককের পথেই হাঁটার চেষ্টা করছে। আদি বুড়িগঙ্গা বা কালুনগর খালের মতো জায়গাগুলো যদি ব্যাংককের ‘শ্যান শ্যাপ’ খালের মতো সংস্কার করা যায়, তবে ঢাকাও তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে।
মুহাম্মদ মনির হোসেন: নদী গবেষক ও পরিব্রাজক এবং চেয়ারম্যান-বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন