ভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের জনজীবন বিপর্যস্ত। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম শহরসহ পাহাড়ি ঢলে কয়েকটি নিচু এলাকায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। অধিকাংশ শহরেই সামান্য বৃষ্টিপাতেই জলাবদ্ধতা নিরসনে এত প্রকল্প ও উদ্যোগ নেয়ার পরও কেন এ ভোগান্তির নিরসন হচ্ছে না?
চট্টগ্রাম দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। সমতল ও পাহাড়ি দুই ধরনের ভূমি মিলিয়েই চট্টগ্রাম শহর। শহরের চারদিকে পাহাড়। কর্ণফুলী নদীর পাড় দিয়ে কিছু সমতল ভূমি পাওয়া যাবে। এদিকে ঢাকা, খুলনা ও বরিশালের মতো শহরগুলো সমতল ভূমিতে। সমতল হওয়ায় এসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হলে পানি প্রাকৃতিক নালা দিয়ে যায়, তাই ভূমিক্ষয় হয় কম। আর চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানই এমন যে আশপাশের নদী এ শহরের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়। এজন্য ভারি বৃষ্টিপাত হলে অল্প সময়ে প্রচুর পলি পানির সঙ্গে মিশে আসে। এগুলো চট্টগ্রাম শহর দিয়েই প্রবাহিত হয় বলে নালা-নর্দমা প্রতি বছর ভরাট হয়ে যায়। ভূমিক্ষয়টা এখানে বেশি হয় নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে। অপরিকল্পিত ও আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেকেই পাহাড় কাটেন। এগুলোর তদারকি কেউ করে না। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনায় এসব সমস্যা বিবেচনা করা হয় না।
জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেক বড় বড় প্রকল্প নেয়া হয়। এসব প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ কাউকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রাখা হয় না। ভৌগোলিক চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প না নিলে বাস্তবায়নের সুফলও মেলে না। শুধু পানি নিষ্কাশন কাঠামো করে রাখলেই তো হবে না। ব্যবস্থাপনায়ও মনোযোগ থাকতে হবে। নালাগুলো পলিতে ভরাট হয়ে যায়। সেগুলো প্রতি বছরই পরিষ্কার করা দরকার। বর্ষা মৌসুমের আগে একবার হলেও এগুলোকে পানি নিষ্কাশনের উপযোগী করার ব্যবস্থাপনা ও মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয়ই ঘটবে। পলি, মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্য, পলিথিন সরাতে হবে। কারণ নগরীর বর্জ্যের একটি বড় অংশই ফেলা হয় সড়কে। এগুলো নদী-নালায় জমে জলাবদ্ধতার বড় কারণ হয়ে ওঠে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে পানি নিষ্কাশনের জন্য চট্টগ্রাম তো বটেই, সারা দেশেই আলাদা প্রোগ্রাম রাখা জরুরি। না হলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। আবার পাহাড়ে ভূমিক্ষয় কমাতে নরম মাটির ক্ষয় কমাতে হবে। এজন্য বেআইনিভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে গাছ লাগাতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যাবে। অর্থাৎ প্রথমে পাহাড়কে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ছোট ছোট পাহাড়ের ক্ষয় এড়ানো জরুরি।
চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশনের জন্যই ওয়াসা স্থাপন করা হয়। তবে প্রায় ছয় দশকেও একটি সুসংহত পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। মাস্টারপ্ল্যান করেও সুফল মেলেনি। সমস্যাটি কোথায়?
সমস্যাটি ভূপ্রাকৃতিক। বক্স ড্রেন বানাতে হবে। পানিপ্রবাহ ও সরবরাহের পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে। শুধু প্রকল্প নিলে বা মাস্টারপ্ল্যান করলেই হবে না। ঢাকার কথাই ধরা যাক। মিরপুর ও উত্তরা এলাকায় উঁচু-নিচু কিছু টিলা মিলবে। এখানে পানি ড্রেনেজ ব্যবস্থাই আলাদাভাবে করতে হবে। চট্টগ্রামেরটা হবে আলাদা। বন্দর নগরে বাড়তি মনোযোগ দরকার। ওখানে প্রচুর পলি প্রবাহিত হয়। সেগুলো নিয়মিত সরাতে হবে। আবার যে উৎস থেকে পলি আসে সেগুলো রক্ষা করতে হবে। ঢালু কিংবা উঁচু-নিচু এলাকাগুলোকে স্বাভাবিক করতে হবে। নগরীর সড়ক বিভাজনগুলো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ দেশই বিভাজকের মাঝে নুড়ি কিংবা গাছের গুঁড়ি রেখে দেয়। এভাবে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এসব করলে পলিগুলো নালা-নর্দমায় চলে যেত না।
চট্টগ্রামে যে বৃষ্টি হয় তাতে অল্প সময়ে ভারি বৃষ্টি হয়। তখন পানির সঙ্গে প্রচুর পলি মিশে আসে। এগুলোর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বা কমে গেলে নানা জায়গায় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থেকে যায়। কিছু থেকে যায় নদীতে আর কিছু আটকে পড়ে ড্রেনেজ সিস্টেমে। ড্রেনেজ যতই আধুনিক করা হোক, এক-দুই বছর পর ভরাট হয়ে যেতে পারে। এজন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ অনেক জরুরি। শুরুতে যে অবকাঠামো আছে তার ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণটা তৈরি করতে হবে। তারপর অন্য উদ্যোগের সুফলগুলো মিলতে শুরু করবে।
সরকার খাল খনন কর্মসূচিকে তাদের অগ্রাধিকারভিত্তিক লক্ষ্যে রেখেছে। দুর্যোগ প্রতিরোধমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নেও সরকার কিছু পরিকল্পনার কথা বলছে। পরিবেশ সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করতে এগুলো আমাদের কতটা সহযোগিতা করতে পারে?
দেশে বিগত সময়ে যা উন্নয়ন হয়েছে সবই অপরিকল্পিত। ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশ উত্তর থেকে দক্ষিণে ঢালু। ফলে বন্যা মৌসুমে পানি দ্রুত প্রবাহিত হতো ও নেমে যেত। তবে বিগত সময়ে আমরা অনেক রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছি। শহর-গ্রাম সবখানেই সড়ক হয়েছে। এ সড়কগুলোয় পর্যাপ্ত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। নদীমাতৃক দেশের চাহিদা বিবেচনায় না নিয়ে যেকোনো ভালো পরিকল্পনাও ব্যর্থ হবে। এজন্যই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতা বা অসময়ের বন্যা বড় সমস্যা হয়ে গেছে।
সরকারের খাল খনন কর্মসূচি ইতিবাচক উদ্যোগ। এজন্য পরিকল্পিতভাবে খাল খননের পর পর্যাপ্ত কালভার্ট, ব্রিজ তৈরি করতে হবে। ছোট ব্রিজগুলোকে বড় করতে হবে। কালভার্ট না থাকলে বানাতে হবে। সমস্যা হলো আমরা এ ভাবনা থেকে অনেক দূরে। অবকাঠামো তৈরি করলে যে পরিমাণ পানি আটকাবে তার বিপরীতে নিষ্কাশনেরও উপযুক্ত ব্যবস্থাটা রাখতে হবে। এখানে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের সমন্বয় জরুরি। দেখা যায়, যেখানে ব্রিজ করা দরকার সেখানে করা হচ্ছে কালভার্ট। যেখানে বড় ব্রিজ জরুরি সেখানে করা হচ্ছে ছোট ব্রিজ। অনেক জায়গায় নদী ভরাট করে সড়ক ও সেতু অবকাঠামো গড়া হয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়নি। খাল খননের পাশাপাশি নদী খননেও মনোযোগ দিতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত পানি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকেই যাবে।
জলাবদ্ধতা শহরের জন্য ভোগান্তি। এদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে অসময়ের বন্যা বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে আমরা আসলে কোনদিকে মনোযোগ দিতে পারিনি?
জলাবদ্ধতা শুধু শহরের সমস্যা তো নয়। গ্রামেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখন অধিকাংশ অঞ্চলই জলাভূমিতে পরিণত হচ্ছে। গ্রামীণ অঞ্চলে পুকুর কিংবা জলাশয় বরাবরই পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষত পয়োনিষ্কাশনের সবচেয়ে বড় জায়গা পুকুর বা জলাশয়। আগে পুকুরের নানা ব্যবহার ছিল। অন্তত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু এখন গ্রামেও শহরের মতো উন্নয়ন শুরু হয়েছে। সেখানে সবাই পাকা ভবন তৈরি করতে শুরু করেছেন। আর এসব ভবনের পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ পুকুর বা জলাশয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে। আগে পুকুরে স্বচ্ছ ও ব্যবহারযোগ্য পানি থাকত। এখন সেগুলো ময়লায় ভরাট হয়ে থাকে। গ্রামেও মশার বিস্তার বেড়েছে। ডেঙ্গু এরই মধ্যে সারা দেশে স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করছে। গ্রামীণ এলাকায় ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের পরিকল্পিত ও সচেতন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। শহরাঞ্চলে নানা জায়গায় ওষুধ ছিটানো হয়। এদিকে গ্রামাঞ্চলে সে উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত হলেও চালু করা যায়নি। এদিকে অধিকাংশ গ্রামই বিশাল এক নর্দমায় অবস্থিত। পুকুরটা হয়ে গেছে নর্দমা। পরিবেশ সংবেদনশীল উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু নগরকে কেন্দ্র করে ভাবলে চলে না। সারা দেশের ভৌগোলিক চরিত্র বিবেচনা করেই কার্যক্রম এগোতে হয়।
চলতি বছর হাওরাঞ্চলে বন্যায় প্রচুর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত সড়ক আর বাঁধ নিয়ে ভোগান্তি আগামী বছরের জন্যও দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। আগামী বছর সংকটাবস্থার প্রস্তুতিটা কেমন হওয়া দরকার?
আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিচ্ছি। সবখানেই পাকা সড়ক করা হচ্ছে। অতীতে হাওরাঞ্চলে সাবমারসিবল সড়ক ছিল। অধিকাংশই ছিল কাঁচা রাস্তা। শুষ্ক মৌসুমে এসব সড়ক দিয়েই মানুষ চলাচল করত। আর বর্ষা মৌসুমে সেগুলো পানির নিচে তলিয়ে যেত। এভাবে বাড়তি পানি প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ পেত। হাওরাঞ্চলের কথা চিন্তা করে এ ধরনের আধুনিক সড়ক এখন বানাতে হবে। এমনভাবে সড়ক বানাতে হবে যাতে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পরও নষ্ট না হয়। বর্ষাকালে প্রথাগত নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার সুযোগটাও রাখতে হবে। হাওরের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার স্বার্থেই এমনটা জরুরি। আর যদি এটি আমাদের জন্য টেকসই মনে না হয় তাহলে ভায়াডাক্ট অর্থাৎ পিলারের ওপর নির্মিত সড়ক বানানো যেতে পারে। এ ধরনের সড়কের নিচ দিয়ে পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা থাকে। নিচু ভূমির দেশ যেমন নেদারল্যান্ডসে এ ধরনের সড়ক দেখা যায়। হাওরাঞ্চলে বড় সড়ক বানানো হলে এ মডেল অনুসরণ করাই শ্রেয়।
চলতি বছর হাওর এলাকায় আগাম বন্যা হয়েছে। এ ধরনের বন্যা ক্ষতিকর। ধান পাকার ১৫-২০ দিন আগে আগাম বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি হয়। তাই দুর্যোগ সহনশীল উদ্ভাবনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। ধানের জাত নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে, যাতে ধান কাটার সময়টা আরেকটু এগিয়ে আনা যায়। এপ্রিলের আগেই ধান তুলে ফেলা গেলে ভালো হয়। হাওরের উন্নয়ন ওই অঞ্চলের মতো করেই করতে হবে। একই পদ্ধতি সব অঞ্চলে উন্নয়নের জন্য প্রয়োগ করা যাবে না। একই নকশা, একই পরিকল্পনা কপি-পেস্ট করলে সুফল মিলবে না। প্রকৃতি, তার স্বাভাবিক গতি ও মৌসুমের চরিত্রের সমন্বয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ডেল্টা প্ল্যানে এমন ছয়টি হটস্পট করা হয়েছে। পাহাড়, হাওর, বরেন্দ্র অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, মধ্যাঞ্চল ও সমতল এলাকাকে এভাবে আলাদা করা হয়েছে। প্রতিটা অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে আমাদের উন্নয়ন করতে হবে।
সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে। সামনের দিকে পানি সরবরাহ সংকট মেটাতে আমাদের করণীয় কী?
বড় শহরগুলোর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। আগে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে আমরা শতভাগ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতাম। বর্ষা মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানি রিফিল হতো। কিন্তু বর্তমানে এ স্তর নিচেই নামছে। আমরা পানি ওঠাই আর তা নিচে নেমে যায়। শুকনো মৌসুমে সমস্যা আরো গাঢ় হয়। ঢাকা বা বড় নগরে তো পানি রিফিলেরও সুযোগ নেই। কারণ এখানে খোলা স্থান কিংবা কংক্রিট নেই এমন জায়গার অভাব আছে। ফলে যে পরিমাণ পানি উত্তোলন হচ্ছে একই পরিমাণ পানি কিন্তু রিফিল হচ্ছে না। গ্রামীণ এলাকায় তা সম্ভব। এখন অনেক গ্রামেও এটি হচ্ছে না। রাজশাহী ও বরেন্দ্র এলাকায় সমস্যাটি দীর্ঘদিনের।
ঢাকার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। তবে ঢাকা বা অন্য বড় শহরগুলোতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ফাঁকা জায়গা বাড়াতে হবে। তবে পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পানি কোনোভাবে সংক্রমিত থাকলে আর তা ভূগর্ভে গেলে বিশুদ্ধ পানির সংকট আরো তীব্র হবে। কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণের এ প্রক্রিয়াকে ম্যানেজড অ্যাকুইফার রিচার্জ (এমএআর) বলা হয়। এ ব্যবস্থার জন্য পানির গুণগত মান রক্ষায় জোর দিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে যদি ধীরে ধীরে ভূগর্ভে তা দেয়া যায় তাহলে পানির স্তর উপরে উঠতে শুরু করবে।
আরেকটি হলো ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার। ২০৩০ সাল নাগাদ ভূপৃষ্ঠের ৫০-৭০ শতাংশ পানি ব্যবহার হবে। এখন পদ্মা ও শীতলক্ষ্যার পানি শোধনের মাধ্যমে ব্যবহার হচ্ছে। এগুলোর ক্ষেত্রেও পানির গুণগত মান রক্ষা করতে হয়। তার পরও এ পানি নিয়ে অভিযোগ আছে। এগুলোর শোধনপ্রক্রিয়া ঠিক নয়। শোনা যাচ্ছে মেঘনা থেকেও এভাবে পানি আনার কথা ভাবা হচ্ছে। এগুলোর ক্ষেত্রে গুণগত মান রক্ষা অনেক জরুরি। ফলে যা করা হবে তা যেন টেকসই হয়। এমএআর পদ্ধতির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণের সুযোগ আছে। এ নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এটি দেশে চালু হয়নি। কিছু জায়গায় পাইলটিং হলেও কার্যকর ফল আসছে বলে মনে হয় না। তবে আরো গবেষণা সুযোগ বাড়িয়ে পরিকল্পনামাফিক এটি চালু করা গেলে সুফল মিলবে।
সরকার পানি বণ্টনের জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে ডেল্টায়িক দেশ হিসেবে এমন বাঁধ টেকসই সমাধান নয় বলেই অভিমত অনেকের। আপনি এ প্রকল্পটিকে কীভাবে দেখছেন?
এ প্রকল্পের ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই দিকই আছে। বাঁধের একটি সুবিধা হলো আমরা সেচের জন্য পানি পাব। শুকনো মৌসুমে পানি থাকবে। ব্যারাজ তো সুবিধার জন্যই করা হয়। তাৎক্ষণিক কিছু সুবিধা আছে। ডেল্টায়িক লোল্যান্ড হিসেবে এখানে কতটুকু পানি সংরক্ষণ করা যাবে তা বোঝা যাবে। আবার দুইদিকে বাঁধ দিয়ে পানির সংরক্ষণ বাড়ানো যাবে। ব্যারাজ তৈরি করলেই সুফল মিলবে এমন নয়। ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ স্বাভাবিক রাখতে হবে। পদ্মা ব্রিজের ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে। এর অনেক সুফল মিললেও নদীটা বিপর্যস্ত হয়েছে। যমুনা ব্রিজ হয়েছে কিন্তু নদীটা শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ আমাদের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রচুর পলি। ব্রিজটা হওয়ার পর পলি খনন করে আশপাশে শহরাঞ্চল বাড়ানো যেত। অনেক জায়গার ভূমি উঁচু করা যেত। এখন সেখানে চর পড়ে পুরো নদীই বন্ধ হয়ে গেছে। চৈত্র মাস হলেই এখন আর নদী দেখা যায় না। পদ্মা ব্যারাজ শেষ পর্যন্ত এক ধরনের ব্রিজ। ব্রিজ দিয়ে প্রচুর পলি প্রবাহিত হবে। নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে কিছু পানি ছাড়া হবে। শুকনো মৌসুমে পানি যাবেই না। এর সঙ্গেও তো পলি আসবে। বিপুল পরিমাণ পলি যদি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা না যায় তাহলে সেখানে পলির আলাদা বাঁধ তৈরি হবে। এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। বিস্তারিত জানা নেই। যদি পলি ব্যবস্থাপনা ঠিক না হয় তাহলে দুই বছরেই ব্যারাজটা বন্ধ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে ফারাক্কা কাজ করছে না। এটির কোনো দরকার নেই।
নদী ব্যবস্থাপনার অভাবেও অনেক জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। এখানে সমস্যাগুলো কী এবং সমাধানের পথ কী?
ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে এমনটি হচ্ছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে অনেক বালু উত্তোলন করা হয়। আমাদের এখানে যেখানে যা দরকার নেই তা করা হচ্ছে। রেললাইনের নিচ থেকেও অনেক সময় তাৎক্ষণিক সুবিধার জন্য মাটি তোলা হচ্ছে। অনেক নদীতে অপ্রয়োজনীয় বালি জমে নদীপথ বন্ধ হচ্ছে। অথচ এখান থেকে সরকার বড় রাজস্ব আয় করতে পারে। বালি আমাদের সম্পদ। এখন শহরে নির্মাণকাজে যে বালি আসে তার বড় অংশই অবৈধভাবে আসে। যদি নির্দিষ্ট এলাকায় পরিকল্পিত উপায়ে উত্তোলন করা হতো তাহলে নদী খননের কাজও হতো আবার বালি উত্তোলন করে উন্নয়নকাজও শেষ হতো। একদিকে শহর হবে আর অন্যদিকে নদী খননের কাজ। এটি অবশ্যই বড় আর্থিক সুযোগ। আমরা করছি উল্টোটা। যে নদীর বালি উত্তোলনের দরকার নেই সেখানের বালি উত্তোলন করছি। যেখানে দরকার সেখানে মনোযোগ নেই। এজন্য নদীভাঙন বাড়ছে, গতিপথ পাল্টে যাচ্ছে। ফলে নদীশাসন ও পলি ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে সামনে দুর্গতি আছে।
বালি নিয়ে এখন অনেক আলোচনা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে তা উত্তোলন করলে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় হতো। অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ড তো এজন্য অনেক সরকারি অর্থ খরচ করে। একদিকে ব্যয় করছি আর সে বালি বিক্রি করতে পারছি না। রাজস্বের অর্থ খরচ করে ফিরতি কিছু না পাওয়া টেকসই হতে পারে না। অথচ পরিকল্পিতভাবে হলে আমাদের এমন দ্বিগুণ খরচ হতো না।