হাওর অঞ্চলের কৃষি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিসংখান বলছে, দেশের চাহিদার প্রায় ১৮-২০ শতাংশ ধান এ অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতি বছরই এ অঞ্চলের চাষীরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কম-বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিলে ধান সংগ্রহের সময় আকস্মিক বন্যা বা প্রবল বৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়, ফলে চাষীরা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটায়।
বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও আকস্মিক বন্যায় চাষীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য সরকার প্রণোদনা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে কৃষকবান্ধব অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পরিকল্পনা না নিলে সব আয়োজনই ব্যর্থ হবে। চাষীদের দুর্যোগ মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিকল্প কৃষির ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু এ অঞ্চলে ধান বেশি উৎপন্ন হয়, তাই খড় সহজলভ্য ও সস্তা। এ খড়কে বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে চাষীরা অর্থনৈতিক লাভবান হবেন।
ধানের খড় মাশরুম চাষের উৎকৃষ্ট সাবস্ট্রেট এবং এর চাষ পদ্ধতিও সহজ। তাই ধানের খড়ে মাশরুম চাষ প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া সময়ের দাবি। এক কেজি ধানের খড় থেকে খুব সহজেই এক কেজি মাশরুম উৎপাদন করা যায়। আর এক কেজি মাশরুমের বাজারদর অন্তত ২৫০ টাকা, যা চাষীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
মাশরুম চাষের পর যে পরিত্যক্ত বর্জ্য থাকে তা জৈব সার হিসেবে মাটিতে ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এটি গবাদিপশুর উত্তম খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এক কথায়, মাশরুম চাষের মাধ্যমে খড়কে আরো উন্নত ও চক্রাকার অর্থনীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
মাশরুম চাষের মাধ্যমে কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করা গেলে তাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়বে। ফলে কমে আসবে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর সংখ্যা, সমাধান হবে গ্রামে মৌসুমি কৃষি শ্রমিকের অভাব। একই সঙ্গে কমে আসবে ঢাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যাও।
এখন প্রশ্ন হলো কৃষক তার উৎপাদিত মাশরুম কোথায় বিক্রি করবে? সরকারের গৃহীত ছোট ছোট কিছু পদক্ষেপ খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে। আমরা সবাই জানি যে মাশরুম পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসমৃদ্ধ একটি স্বাস্থ্যকর খাবার। নিয়মিত মাশরুম খেলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি কমে, যা দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। তাই সর্বজনীন খাদ্য তালিকায় মাশরুমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে সরকার দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও সর্বসাধারণের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে।
মাশরুম বাজারজাতের বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি খুবই পচনশীল একটি সবজি। তাই মাশরুম প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন খাবার তৈরি শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি, যেমন স্কুল ফিডিং, হাসপাতালে সরবরাহকৃত খাবারে, জেলখানায় আসামিদের খাবারে মাশরুম সংযোজন করতে পারলে চাষীদের মাশরুম বাজারজাতে সহজ হবে। একই সঙ্গে খাদ্য হিসেবে দেশব্যাপী মাশরুম গ্রহণের প্রবণতা বাড়বে। আমরা পাব আত্মনির্ভর কৃষি ও সুস্থ জাতি।
ড. জীবুন্নাহার খন্দকার: মাশরুম গবেষক এবং সহযোগী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব লাইফ সায়েন্সেস, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)