একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হয়। এর জন্য সব বাহ্যিক প্রভাব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুক্ত থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককে সব কার্যকলাপ এবং সিদ্ধান্তমূলক কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি নিজস্ব বিবেচনার অধীনে থাকা শ্রেয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সরকারের একক বা বিশেষ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা বোর্ড অব ডিরেক্টররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। যখন গভর্নর আর্থিক নীতি অনুসরণে স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করেন, তখন আর্থিক অনুষঙ্গ পছন্দ করার স্বাধীনতাও তিনি পাবেন। ব্যাংক এবং ব্যাংক পরিচালনা নীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্বাধীন থাকতে পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা পাবে।
স্বাধীন ও কার্যকর বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। ক. ব্যাংকিংয়ের মূল ইস্যুতে অধিক মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারা একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় বৈশিষ্ট্য। খ. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দূরদর্শী এবং সুচিন্তিত বিধিমালা যা বাহ্যিক রাজনৈতিক অথবা প্রশাসনিক চাপে ঘন ঘন পরিবর্তন হবে না। গ. কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক অথবা সামগ্রিক ব্যাংক ব্যবস্থায় সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য ত্বরিত সংশোধনমূলক এবং আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ব্যবস্থা থাকা।
এটি অবশ্যই উল্লেখ্য যে ব্যাংকের বিধিমালা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায় ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালিত হবে না, ঠিক তেমনি এককভাবে পূর্ণ স্বাধীনতাও উপভোগ করবে না, যা প্রায়ই ব্যাংক খাতে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে। বিষয়টি ২০১৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জ্যাঁ তিহল ২০১০ সালে যৌথভাবে তার সহকর্মীদের সঙ্গে লেখা ‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস: গ্লোবাল লেসনস ফ্রম দ্য ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস’ বইয়ে যথাযথভাবে বর্ণনা করেছেন। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে কোন অর্থনৈতিক বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। অধিক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী, সাধারণ জনগণ এবং প্রকৃত অর্থনীতিকে (প্রকৃত পণ্য ও সেবা) সামগ্রিকভাবে দেখা। বিধিমালার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পদ্ধতিগত ঝুঁকির প্রভাব কমানো, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলাফল হিসেবে প্রকৃত উৎপাদন হ্রাস, নিম্নতর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব এবং মানবকল্যাণ হ্রাস পায়। আমাদের দেশে ব্যাংক খাতে বিশেষ করে বর্তমান সংকটের প্রসঙ্গ অনুযায়ী সুশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সরকারি ও ব্যক্তিগত দায়িত্বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করার প্রসঙ্গটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবের ক্ষেত্রে উপযুক্ত উদাহরণ হচ্ছে দেশের কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারি, যেখানে ঋণগ্রহীতা এবং কিছু কর্মকর্তা গোপনে আঁতাতের মাধ্যমে জনগণের অর্থ আত্মসাতে জড়িত ছিল। এসব প্রতারণামূলক কাজে দায়ীরা এখন পর্যন্ত শক্ত প্রশাসনিক এবং আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হননি। এমনকি তারা ‘অন্যায্য প্রণোদনা’ পেয়েছেন, যার ফলে বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরত সৎ এবং ত্যাগী কর্মকর্তারা নিরুৎসাহী হচ্ছেন। এতে পুরো ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে আর্থিক খাত পরিচালনায় সফল হওয়ার জন্য সাহসী, দূরদর্শী এবং ব্যবস্থাপনা নীতির ক্ষেত্রে খুব প্রাসঙ্গিক এবং প্রায়োগিক হতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সব নীতি পুরোপুরি অনুসরণ হচ্ছে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা অথবা অ্যাডহক পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা উচিত। ‘নীতি’ বনাম ‘বিশেষ ক্ষমতা’ ইস্যুটির সমাধান বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্ত অবস্থানের ভিত্তিতে হতে হবে, যেখানে নীতি ও নিয়ম সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এক্ষেত্রে কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তি এবং সংস্থার ইচ্ছাধীন শক্তি প্রাধান্য পাবে না। সময় এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকাণ্ডে ভারসাম্য নিয়ে আসার ও পুরোপুরি পেশাদার অবস্থান প্রদর্শন করার, যেখানে বড় প্রায়োগিক কাজের ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত কার্যকলাপ বাদ দিতে হবে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নীতিগত অবস্থান দুটো ক্ষেত্রের কার্যকলাপের ফলাফল থেকে আসে। একদিকে স্টেকহোল্ডারদের ক্ষেত্রে প্রধানত ব্যবসায়ী সমাজ, ব্যাংকের গ্রাহক এবং অন্যান্য ব্যবহারকারী (অন্তর্গত ও বহিরাগত) এ খাতে বিভিন্ন প্রকার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্যদিকে নীতিনির্ধারক (রাজনীতিবিদ ও সরকারের উপদেষ্টা) নিজেদের ক্ষেত্রে স্টেকহোল্ডারদের চাহিদার প্রতি সাড়া প্রদান হিসেবে সংস্কারের প্রক্রিয়া ও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন।
দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন বিভিন্ন ধাপে ভূমিকা রাখে। যা-ই হোক, রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং সেটাকে সমর্থন জোগানোর বিপরীতে ফ্যাক্ট অথবা উপাত্তের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে সত্য। তবে এ চ্যালেঞ্জ জয় করার মধ্য দিয়েই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।
উপার্জন ও কর্মসংস্থান এবং উপার্জন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সামাল দিতে হয়। অর্থনীতিতে রাজস্ব ও মুদ্রানীতি উভয়ের ভূমিকা রয়েছে। উভয় নীতি যদি সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে সুফল মিলবে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু বৈশিষ্ট্য মুদ্রানীতির সর্বোৎকৃষ্ট ফলাফল প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি করে। প্রথমত, মাত্র ৫৫ শতাংশ জনগণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এসেছে। উন্নত দেশে এটি ৯০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশে এ নিম্নহার মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা সীমিত করে দেয়। দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহারের ক্ষেত্রে বাজারের কম সংবেদনশীলতাও আর্থিক নীতিতে কম প্রভাব ফেলার কারণ। তৃতীয়ত, রেপো রেট, রিজার্ভ মানি অনুপাতের মতো নীতিহার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ২০২১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী খুব একটা কার্যকর হিসেবে গণ্য হয় না। এর কারণ জাতীয় সঞ্চয়পত্রের প্রাধান্য এবং ব্যাংক থেকে সরকারের গৃহীত বিপুল ঋণ। চতুর্থত, অন্যান্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগ উপকরণ যেমন জাতীয় সঞ্চয়পত্র, ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণ মুদ্রানীতির মাধ্যমে খুব বেশি প্রভাবিত হয় না। যদি না এসব আর্থিক সেবার অর্থ এবং সুদহার মুদ্রানীতি প্রণয়নে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা সীমাবদ্ধই থাকবে।
প্রকৃত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ স্বাধীনতা এবং পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন হয়তো সহজে অর্জন করা যাবে না। তার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক এবং অন্যান্য বাহ্যিক চাপ কমাতে ক্রমাগত রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে এবং আলোচনা করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের সমর্থন অর্জন করতে পারে, যা বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত এবং আর্থিক খাত স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালনে সহায়তা করবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, ভালো এবং খারাপ উভয় সময়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা লবিস্টদের চাপের সম্মুখীন হয়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দায়িত্বও তাদের। যে যত দক্ষতার সঙ্গে এসব সমস্যা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে পারবে সে তত সক্ষম হিসেবে প্রমাণিত হবে। আর্থিক খাতও টেকসই ভিত্তি পাবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক